তথ্যের স্বচ্ছতায় ব্লকচেইন প্রযুক্তি

বিজ্ঞানের উত্কর্ষতায় প্রতিনিয়তই বদলে যাচ্ছে পৃথিবী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, বায়োমেট্রিক্স, মেশিন লার্নিং, আইওটি, বিগ ডেটা অ্যানালাইসিস ইত্যাদির পর এবার ব্লকচেইন নামক প্রযুক্তি তাক লাগিয়ে দিতে চলেছে পুরো বিশ্বকে। ব্লকচেইন বলতে লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণের সুরক্ষিত, উন্মুক্ত ও অত্যাধুনিক কৌশলকে বোঝায়।

২০০৯ সালে বিটকয়েন ক্রিপ্টোকারেন্সি আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় ব্লকচেইন প্রযুক্তির বিবর্তন ও অগ্রযাত্রা। ধারণা করা হয়, সাতোশি নাকামতো ছদ্মনামের এক বা একাধিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এই প্রযুক্তির উদ্ভাবক। সৃষ্টিলগ্ন থেকেই এটি একটি অপরিবর্তনযোগ্য অত্যাধুনিক লেনদেন প্রক্রিয়া। অভিনব এই প্রক্রিয়ায় লেনদেনের তথ্যসমূহকে বিভিন্ন ব্লকে ধারাবাহিকভাবে ব্লকচেইন লেজারে সংরক্ষণ করা হয়। সুরক্ষিত এসব ব্লকচেইন লেজারে একবার কোনো ট্রানজেকশন তথ্য প্রবেশ করলে তা স্থায়ীভাবে থেকে যায় এবং সেগুলো মুছে ফেলা পুরোপুরি অসম্ভব! অন্তর্নিহিত এই প্রযুক্তি এতটাই নির্ভুলভাবে কাজ করে যে, অদূর ভবিষ্যতে লেনদেন ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার রেকর্ড সংরক্ষণে এর ব্যবহার করা যেতে পারে।

বিটকয়েন ক্রিপ্টোকারেন্সির সুরক্ষায় ব্লকচেইন প্রযুক্তির যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে পৃথিবীর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্ষেত্রে চলছে এর সফল প্রয়োগের চেষ্টা। ব্যাংক-বিমা, শেয়ার মার্কেট, কপিরাইট, রাইড শেয়ারিং প্রভৃতি ক্ষেত্রে লক্ষ করা যাচ্ছে ব্লকচেইনের আনুষ্ঠানিক পরীক্ষণ। প্রতিবেশী দেশ ভারতের মহারাষ্ট্র প্রদেশ ইতিমধ্যে ই-গভর্ন্যান্স সেবায় ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছে। যদিও এই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন সুবিশাল ক্লাউড-কম্পিউটিং প্ল্যাটফরম। তাই মহারাষ্ট্র সরকার পাবলিক ক্লাউড ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর ফলে ২০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও অধিক সমমূল্যের বাজার সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। অধিকন্তু, সরকারের সমস্ত তথ্য ক্লাউডে স্থানান্তরিত হওয়ায় সাশ্রয় হবে প্রচুর পরিমাণ অর্থ! বিকল্প কোনো টেকনোলজি আবিষ্কৃত না হলে কিংবা ব্লকচেইনে কোনো দুর্বলতা পরিলক্ষিত না হলে আগামীর দিনগুলোতে পুরো পৃথিবী এই টেকনোলজির ওপর নির্দ্বিধায় আস্থা ও ভরসা করতে পারবে।

তথ্যের স্বচ্ছতা বিধানকারী সম্ভাবনাময় এই ব্লকচেইন প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ও প্রসারের লক্ষ্যে ‘অনুপ্রেরণামূলক ক্ষমতায়ন ও উদ্ভাবন’ প্রতিপাদ্যে মুখরিত হয়ে প্রতি বছর আন্তর্জাতিকভাবে আয়োজন করা হয় বিশ্ব ব্লকচেইন অলিম্পিয়াড। হংকংয়ে অনুষ্ঠিত এই অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করে থাকেন বিশ্বের বিভিন্ন বয়সি তুখোড় মেধাবী শিক্ষার্থীরা। মোট আটটি ক্যাটাগরি প্রাইজসহ থিমেটিক প্রাইজ হিসেবে গোল্ড মেডেল, সিলভার ও ব্রঞ্জ মেডেল প্রদান করা হয় এই আয়োজনে। সবগুলো ক্যাটাগরি মিলিয়ে বিজয়ীদের প্রদান করা হয় সর্বমোট ৪০ হাজার মার্কিন ডলার সমমূল্যের পুরস্কার! সম্প্রতি ৮ থেকে ১০ অক্টোবর ২০২১ সালে হংকংয়ের বাইরে প্রথমবারের মতো এই অলিম্পিয়াড আয়োজিত হয়েছে বাংলাদেশে। বহুল প্রতিক্ষিত এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দল। এবারের আয়োজনে একটি সিলভার, দুটি ক্যাটাগরিসহ একটি প্রোটোটাইপ ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশ সর্বমোট চারটি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে, যা দেশের জন্য গৌরবের!

বিশ্ব জুড়ে এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ব্লকচেইন প্রযুক্তি। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও এটি নিয়ে কাজ করার সময় এসে গেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের একটি প্রধান উদ্দেশ্য তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। তাই, ব্লকচেইনে সক্ষমতা অর্জনে সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। তৈরি করতে হবে সম্মিলিত গবেষণাক্ষেত্র। যুগোপযোগী চিন্তায় বিকশিত করতে হবে নতুন প্রজন্মের গবেষকদের। উদ্ভাবনী ক্ষমতায় দেখাতে হবে সফলতা। তবেই দেশ এগিয়ে যাবে প্রযুক্তিগত বিশ্বায়নের পথে। সুরক্ষিত ও নিরাপদ থাকবে দেশ ও জাতির মহামূল্যবান সব তথ্য—এটাই প্রত্যাশা।

n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।