মাথাব্যথা সমস্যায় মাথাটাকে কাটিয়া ফেলিলে কি সমাধান হইবে? ইন্টারনেটের মাধ্যমে গুজব ছড়াইয়া পড়িতেছে, সেই জন্য বিশৃঙ্খলা থামাইতে মোবাইল ইন্টারনেটের থ্রিজি ফোরজি বন্ধ করিয়া দেওয়া হইল। ইহা কোনো সমাধান হইল? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন বলিয়াছেন—‘দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটাকে রুখি/ সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?’ তেমনিভাবে ইন্টারনেটের বিশ্বদুয়ার বন্ধ করিয়া কি আমরা কাকের মতো আচরণ করিতেছি না? সরকার নিশ্চিতভাবেই জানে, আধুনিক বিশ্বের সহিত দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যে প্রধান যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণই ইন্টারনেট-নির্ভর। তাহারা বলিতে পারে, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করা হয় নাই। মোবাইল ইন্টারনেটের থ্রিজি ও ফোরজি কেবল ১২ ঘণ্টার জন্য বন্ধ করা হইয়াছিল; কিন্তু ইহাতে কতখানি ক্ষতি হইতে পারে, তাহা কি ভাবিয়া দেখা হইয়াছে। কাক মনে করে চোখ বন্ধ করিয়া খাবার লুকাইলে পৃথিবীর কেহ আর তাহার খাবারের সন্ধান পাইবে না; কিন্তু বাস্তবে কাকই অন্ধকারে ডুবিয়া থাকে। গতকাল ঢাকার কাকরাইল ও কয়েকটি জায়গায় সংঘর্ষের ঘটনায় বলা যায়, মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা কাকের কাণ্ডের মতো হইয়াছে। সর্বশেষ খবর হইতে আমরা জানিয়াছি, গতকাল দুপুরে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদ, পল্টন ও কাকরাইল এলাকায় এবং নোয়াখালী জেলার চৌমুহনীতে পুলিশের সহিত লোকজনের ব্যাপক সংঘর্ষ হইয়াছে। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের চৌমুহনীতে সংঘর্ষের জের ধরিয়া সংখ্যালঘুদের দোকানপাট ও বাড়িঘরে হামলা চালাইবার খবর পাওয়া গিয়াছে। যতন কুমার সাহা নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবরও নিশ্চিত করিয়াছে পুলিশ। ঢাকায় কাকরাইলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করিতে পুলিশ লাঠিচার্জ করিয়াছে, টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও শটগান হইতে গুলি ছুড়িয়াছে। সম্পূর্ণ অপ্রীতিকর এই পরিস্থিতির জন্য আমরা উদ্বিগ্ন এবং ব্যথিত। আমরা আশা করিব, কেহ অন্যায় ও অন্যায্য কোনো কাজ করিবেন না এবং নিরপরাধ কেহ যেন কাহারো দ্বারা ক্ষতির শিকার না হন।
গতকাল যাহারা বিশৃঙ্খলা করিয়াছে, তাহাদের বিশৃঙ্খলা আটকাইতেই মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হইয়াছিল বটে; কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ করিয়া তাহা প্রতিহত করা সম্ভব হয় নাই। তাহারা ঠিকই নিজেদের সহিত ভিন্ন ভিন্ন পন্থায় যোগাযোগ রাখিয়া যতটুকু বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যায়, তাহা করিয়াছে। মাঝখান হইতে দেশের মোবাইল-নির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ১২ ঘণ্টার জন্য স্থবির হইয়া পড়িয়াছিল। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও বিপণনকারীরা ইন্টারনেট-নির্ভর ব্যবসায় পরিচালনা করিয়া থাকেন। অনেকে বিপণন করিয়া থাকে ফেসবুকের মাধ্যম। এই শ্রেণির হাজার হাজার নূতন উদ্যোক্তা মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকিবার ফলে বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছেন। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা সাড়ে ১২ কোটির বেশি। ইহার মধ্যে মাত্র ১ কোটি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। বাকি সাড়ে ১১ কোটির কাছাকাছি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মোবাইল নেটওয়ার্কে ইন্টারনেট ব্যবহার করিয়া থাকেন। অর্থাত্ মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৯৩ শতাংশ মানুষই মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করিয়া থাকেন। এই সিংহভাগ মানুষ গতকাল ১২ ঘণ্টা সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন। কেন?
প্রশ্ন জাগিতে পারে, মতলববাজ কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীরা কি রাষ্ট্রের চাইতেও প্রযুক্তিতে বেশি পারদর্শী? ইন্টারনেট যেইখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম, সেইখানে একটি আধুনিক রাষ্ট্র কি এইভাবে হুটহাট ইন্টারনেট বন্ধ করিয়া দিতে পারে? তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির এই হইল প্রবণতা—কোথাও সমস্যা হইলে সপাটে দরজা বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়। এমন মানসিকতা দেখা যাইত সামন্তবাদের সময়। দেখা যাইতেছে, তৃতীয় বিশ্বের কিছু দেশের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে এখনো আধাসামন্তবাদী মানসিকতা বহাল রহিয়াছে। এই মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। ইহার সহিত রাষ্ট্রকে প্রযুক্তিতে আরো আধুনিক ও চৌকশ হওয়া প্রয়োজন, যাহাতে ঈশানকোণে সিঁদুরে মেঘ দেখিলেই ইন্টারনেট বন্ধ করিয়া দিতে না হয়।