আমাদের দেশে বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাবার না পাওয়ার মূল কারণ হচ্ছে—ফসলে কীটনাশকের অপপ্রয়োগ এবং মাত্রাতিরিক্ত সার ব্যবহার। একইসঙ্গে মজুদদার, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা খাবারে বিভিন্ন রাসায়নিক মিশিয়ে থাকেন। প্রক্রিয়াজাত খাবারেও নানা ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে। আসলে আমাদের দেশে এমন কোনো খাদ্যপণ্য নেই যেখানে ভেজাল নেই। এ কারণেই মানুষের জটিল রোগ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। একে নিয়ন্ত্রণে আনতে খাদ্যকে নিরাপদ করতে হবে সর্বাগ্রে।
প্রকৃতি যে খাবার ও পানীয় দান করেছে তা নিঃসন্দেহে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত। এগুলো অনিরাপদ হয় রূপান্তরিত ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মধ্য দিয়ে। এই রূপান্তর ও প্রক্রিয়াজাতকরণে ইচ্ছাকৃত বা অসাবধানতা অথবা অজ্ঞতাকে দায়ী করা যায়। আসলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। খাদ্য উত্পাদন বাড়াতে সরকার অঢেল অর্থ খরচ করলেও নিরাপদ খাদ্যের বিষয়ে কতটুকু মনোযোগী তা সংশয়ের ঊর্ধ্বে নয়।
প্রণীত হয়েছে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’ এবং তা বাস্তবায়নের জন্য ২০১৫ সালে ২ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করেন ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’। ৬৪ জেলায় ও আটটি বিভাগীয় শহরে ৭৪টি নিরাপদ খাদ্য আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভেজালবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি তাঁরা কাজ করছেন নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে। ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো হলেও কমছে না ভেজালের ব্যাপকতা।
সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাবার। জীবন ও খাদ্য একে অপরের পরিপূরক। নিরাপদ খাবার খেলে ওষুধের প্রয়োজন হয় না। আবার খাদ্যের মান ও খাদ্যাভ্যাস না থাকলে ওষুধ কোনো কাজে আসে না।
বিশ্ব খাদ্য দিবস আমাদের খাদ্য সার্বভৌমত্ব, খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে অনেকগুলো প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তবে বলতে দ্বিধা নেই, গত কয়েক দশকে আমাদের খাদ্যশস্য উত্পাদন কয়েকগুণ বেড়েছে। চার দশকে আগের চেয়ে মানুষ প্রায় দ্বিগুণ খাদ্য গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। দুর্ভিক্ষ, মঙ্গা ছিল যে দেশের নিত্য সহচর, তা ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। এ সাফল্য সত্ত্বেও খাদ্যের মান নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। খাদ্য নিরাপত্তাকে পাশ কাটিয়ে এখন আলোচনার মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপদ খাদ্য।
দেশের সার্বিক পরিস্থিতি উন্নয়নের কারণে মানুষ এখন আর খাদ্য সংকটে নেই। দেশে প্রায় সব ধরনের খাদ্যই উত্পাদন হচ্ছে। তবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু উত্পাদন পর্যায়ে উত্তম চর্চার অনুসরণের মাধ্যমে তা সম্ভব নয়। কেননা বাজারজাত প্রক্রিয়া ও বিক্রির সময়ও পণ্য নানাভাবে দূষিত হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে উত্পাদনে সঠিক জ্ঞান, দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি যথাযথ কৃষি-উপকরণের জোগান বাড়াতে হবে। কাজ করতে হবে বাজারজাতকরণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নতিতে। কৃষকদের কাছে তথ্য নিয়ে যেতে হবে। সব মিলিয়ে কাজ করতে হবে নিরাপদ খাদ্য উত্পাদন, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিবান্ধব নীতি ও পরিকল্পনা নিয়ে।
এমন পরিস্থিতিতে অনিরাপদ খাদ্য উত্পাদন ও বাজারজাত নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্ত খাদ্য ও পানীয় নিয়মিত পরীক্ষা ও জনসম্মুখে তার ফল প্রকাশ করা জরুরি। খাদ্যের মানের ব্যাপকভিত্তিক পরীক্ষা না হলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা দুরূহ। এছাড়া নিরাপদ খাদ্য কার্যক্রম পরিচালনা ও নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন অধিক দক্ষ লোকবল, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, উন্নতমানের গবেষণাগার এবং অভিজ্ঞ প্রযুক্তিবিদ।
আসুন, সবাই মিলে নিরাপদ খাদ্য আন্দোলন জোরদার করি এবং নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উত্পাদন নিশ্চিত করার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের জন্য সুস্থ-সুন্দর ভবিষ্যত্ নিশ্চিত করি।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা