ইয়ানবি সালামু আলাইকা

আজ পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবি (স.)। মানব জাতির মহত্তম পথপ্রদর্শক, সর্বশ্রেষ্ঠ নবি ও রসুল হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর জন্ম ও ওফাত দিবস। আজ হইতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ বত্সর পূর্বে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বের কেন্দ্রভূমি পবিত্র মক্কা নগরীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ৬৩ বত্সর বয়সে একই দিনে ইন্তেকাল করেন মদিনা মনোওয়ারায়। তিনি রাহমাতুল লিল আলামিন তথা সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ। তিনি সাইয়িদুল মুরসালিন ও খাতামুন্নাবিয়িন তথা নবিদের সর্দার ও সর্বশেষ নবি। তাহার উপর নাজিল হয় সর্বশেষ আসমানি কিতাব পবিত্র আল কোরআন। মানবেতিহাসের এক যুগসন্ধিকালে ও আইয়ামে জাহেলিয়াতের সময় মানবজাতির মুক্তির দিশারি, সতর্ককারী ও আল্লাহর বাণীবাহক হিসাবে পৃথিবীতে আগমন করেন তিনি। তাহার উদাত্ত আহ্বান, নিষ্ঠাপূর্ণ কর্মসাধনা, উচ্চতম নীতি আদর্শের মাধ্যমে তিনি অল্প দিনের মধ্যে এক আলোকোজ্জ্বল ও সর্বোন্নত জীবনব্যবস্থার বাস্তবায়ন করেন। মানবজীবনের এমন কোনো মৌলিক দিক বা বিভাগ নাই যাহা তাহার মাধ্যমে ইসলামে প্রতিফলিত হয় নাই। তাহার জীবনাদর্শ অনুসরণ করাই হউক মিলাদুন্নবি (স.) পালনের একমাত্র উদ্দেশ্য।

ঈদে মিলাদুন্নবি (স.) বলিতে বুঝায় নবি করিম (স.)-এর জন্মদিনের আনন্দ উত্সবকে। পশ্চিমবঙ্গে এই দিবসটি মুসলমানগণ ‘নবি দিবস’ হিসাবে পালন করেন। মহানবি (স.), সাহাবি বা তাবে-তাবেইনদের যুগে ইহার প্রচলন হয় নাই। হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি হইতে মিলাদুন্নবির (স.) প্রচলন হয়। রসুল (স.), হজরত আলী, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইনের (রা.) জন্মদিনের মূল প্রবর্তক খলিফা আল মুয়িজ্জু লি-দিনিল্লাহ বলিয়া জানা যায়। উল্লেখ্য, মিশরের এই সকল অনুষ্ঠানাদি তখনো মুসলিম বিশ্বের অন্যত্র ছড়াইয়া পড়ে নাই। পরবর্তীকালে যিনি ঈদে মিলাদুন্নবিকে (স.) মুসলিম বিশ্বের অন্যতম উত্সব হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন, তিনি হইলেন ইরাক অঞ্চলের ইরবিল প্রদেশের আবু সাঈদ কুকবুরি। সেই হিসাবে আরো পরে সপ্তম হিজরি হইতে আনুষ্ঠানিকভাবে মিলাদুন্নবি (স.) উদ্যাপন শুরু হয়। মিলাদের উপর সর্বপ্রথম গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন আবুল খাত্তাব ওমর ইবনে হাসান ইবনে দেহিয়া আল কলবি। যেভাবেই এই দিবসটি পালনের প্রচলন শুরু হউক না কেন, আমরা এই দিনে বিশ্বনবির (স.) উপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করিব। মার্কিন ইতিহাসবিদ মাইকেল এইচ হার্ট তাহার ‘দ্য হান্ড্রেড’ গ্রন্থে বিশ্ব ইতিহাসের সর্বাধিক প্রভাববিস্তারকারী নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির যেই শত জীবনবৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করিয়াছেন, সেই মনীষীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হইলেন আমাদের প্রিয় নবি (স.); কিন্তু পরিতাপের বিষয় হইল, আমরা আজ তাহার আদর্শ হইতে বিচ্যুত হইয়া পড়িতেছি। কোরআন-হাদিসের শিক্ষা ভুলিয়া গিয়া বিভিন্ন দেশে মুসলমানগণ পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ, অনৈক্য ও হানাহানিতে লিপ্ত হইয়া পড়িয়াছে।

মহানবি (স.) ছিলেন ন্যায়নিষ্ঠ, সত্যবাদী এক মহান পুরুষ। নবুয়ত লাভের পূর্বেই তিনি ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত উপাধিতে ভূষিত হন। দয়ায়, ক্ষমায়, দানে-কর্মে, উদারতায়, মহত্ত্বে ও জ্ঞান-গরিমায় তিনি ছিলেন সর্বকালের মানুষের এক সুমহান আদর্শ। তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী। তিনি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সর্বদা সদ্ব্যবহারের তাগিদ দিয়াছেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে বলিয়াছেন যে, কোনো মুসলিম যদি অমুসলিমের প্রতি অবিচার করে, তাহা হইলে শেষ বিচারের দিন তিনি অমুসলিমের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করিবেন (আবু দাউদ)। কোনো ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোনো অমুসলিমকে হত্যা করিলে তাহার জন্য জান্নাত হারাম বলিয়া তিনি ঘোষণা করিয়াছেন। অমুসলিম মজলুম হইলে তাহার বদদোয়া দ্রুত কবুল হইয়া যায়। (মুসনাদে আহমদ)। অসুস্থ অমুসলিমের সেবা-যত্ন করিবারও তিনি নির্দেশ দিয়াছেন।

অতএব সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় তাহার আদর্শ অনুসরণের বিকল্প নাই। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবিতে (স.) ইহাই হউক আমাদের অঙ্গীকার। আমরা বাংলাদেশের সবুজ-শ্যামল মাটি হইতে তাহার প্রতি জানাই লাখো সালাম—ইয়ানবি সালামু আলাইকা।