ডিজিটালাইজেশনের এই যুগে ভয়ঙ্কর এক অপরাধের নাম হ্যাকিং। অনুমতি ব্যতীত অন্য কারো নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে গোপনীয় তথ্য সংগ্রহ বা মুছে ফেলাকে-ই মূলত হ্যাকিং বলে। হ্যাকিংয়ের সাহায্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, প্রাইভেট নেটওয়ার্ক, অনলাইন ব্যাংকিং, সঞ্চয়ী হিসাব ইত্যাদির মূল্যবান তথ্য চুরি করে অর্থ আত্মসাত্-এর মতো স্পর্শকাতর ঘটনাসমূহ সাম্প্রতিক সময়ে পরিণত হয়েছে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে। পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে এসব!
বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে ম্যাসাচুসেট ইনস্টিটিউড অফ টেকনোলজির প্রখর বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদের মেধার সর্বোত্তম প্রয়োগ ঘটাতে প্রতিষ্ঠা করেন একটি স্বতন্ত্র দল। যারা ছিলেন অন্যান্য শিক্ষার্থীর তুলনায় চিন্তন দক্ষতা ও প্রায়োগিক ক্ষমতার কয়েক ধাপ এগিয়ে। যে কোনো প্রোগ্রামিং সমস্যা সমাধানে সে সময় এই দলটিই ছিল আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এই দলের প্রত্যেক সদস্যকেই অভিহিত করা হতো হ্যাকার হিসেবে। যদিও, সত্তরের দশকে আবির্ভূত হওয়া ফ্রিকদের টেলিফোন সিস্টেমের নেটওয়ার্ক হ্যাক করে বিনা খরচে কথা বলা ছিল হ্যাকিং ইতিহাসের প্রথম সফল ও যুগান্তকারী ঘটনা।
পূর্বনির্ধারিত কম্পিউটার নেটওয়ার্কে দুর্বলতা খুঁজে বের করে সেই সিস্টেম বা নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা ভেঙে তথ্য সংগ্রহ করাই হ্যাকারদের একমাত্র উদ্দেশ্য। একান্ত গোপনীয় এসব তথ্য-উপাত্ত, পাসওয়ার্ড, ডক্যুমেন্টস ইত্যাদি হাতিয়ে নেওয়ার জন্য ওত পেতে থাকে স্বার্থান্বেষী সাইবার ক্রিমিনালরা। প্রযুক্তি যত উত্কর্ষ হচ্ছে হ্যাকিংসংক্রান্ত এই বিষয়গুলো নাগরিক জীবনকে প্রবলভাবে বিষিয়ে তুলছে। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে হ্যাকিংকে শুধু অবৈধ কাজ হিসেবেই নয়, বরং হ্যাকিং থেকে সুরক্ষিত থাকতেও বোঝানো হয়। কেননা, হ্যাকিংয়ের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের শ্রেণিবিভাজন। সেই বিভাগ ও বিভাজনের উপরই নির্ভর করে হ্যাকিং প্রক্রিয়ার বৈধতা এবং অবৈধতা। তেমনি একটি নৈতিক বিভাগ হলো ইথিক্যাল হ্যাকিং।
ইথিক্যাল হ্যাকিংয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন এক বা একাধিক সাইবার সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট হ্যাকারকে নিয়োগ করা হয় রাষ্ট্রের সাইবার সুরক্ষায়। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গোপনে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে কম্পিউটার নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে থাকেন তারা। এছাড়াও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানসমূহের সাইবার সুরক্ষার জন্য অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ, ব্যবহূত নেটওয়ার্কের সুরক্ষা, প্রাইভেসি ডাটার নিরাপত্তা, মেধা সম্পত্তি সংরক্ষণ ইত্যাদি ক্ষেত্রেও আইনি প্রক্রিয়ায় নিয়োগ প্রদান করা হয় ইথিক্যাল হ্যাকারদের। এসব ইথিক্যাল হ্যাকাররা রাষ্ট্রের গোপন নথি সম্পর্কে অবগত। আর তাই ইথিক্যাল হ্যাকিংকে বলা হয় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আইনসম্মত গোয়েন্দা প্রক্রিয়া।
সময়ের পরিক্রমায় মানবজাতি ক্রমান্বয়ে ধাবিত হচ্ছে প্রযুক্তিগত ঘূর্ণাবর্তে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে শুরু করে নাসার মহাকাশযান পর্যন্ত প্রায় সবকিছুই এখন অত্যাধুনিক কম্পিউটার সার্ভারের নিয়ন্ত্রণে। আর তাই এসব কাজে সংযুক্ত কম্পিউটার বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস যখনই কোনো নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, তখনই সেখানে উদ্ভব ঘটবে হ্যাকিংয়ের মতো অপরিণামদর্শী আশঙ্কার। ফলাফল হিসেবে অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবী পতিত হবে সাইবার আক্রমণের সংকটাপন্ন মুহূর্তে। সংগঠিত হবে সাইবার যুদ্ধ। সাইবার বিশ্লেষকদের মতে, অপ্রত্যাশিত এসব ঘটনা প্রবাহ পৃথিবীকে পৌঁছে দিবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে।
কম্পিউটার নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি, প্রযুক্তি ব্যবহারে সতর্কতার মাধ্যমে এ জাতীয় ঘটনাবলী থেকে সাময়িকভাবে রক্ষা পাওয়া গেলেও দূর ভবিষ্যতে দেশের অভ্যন্তরীণ তথ্যের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই এগিয়ে যেতে হবে সরকারের আইসিটি মন্ত্রণায়লকে। সেজন্য তৈরি করতে হবে সুদক্ষ প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন ইথিক্যাল হ্যাকার টিম। যারা অনাকাঙ্ক্ষিত সাইবার হামলার হাত থেকে সুরক্ষিত রাখবে দেশের গোপনীয় সব তথ্য। কাজ করবে রাষ্ট্রীয় তথ্যের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বিধানে। আর তাই, দেশ ও জনগণের স্বার্থে ইথিক্যাল হ্যাকিংয়ের ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে জটিল প্রযুক্তিগত এই পথকে সুপ্রশস্ত ও সাফল্যমণ্ডিত করে তোলার উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়