মোবাইল আসক্তি ও কিশোর গ্যাং

সুরাইয়া জাহান লাভলী

ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে প্রতি তিনজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একজন শিশু। ভাবতে অবাক লাগে, প্রতিদিন ১ লাখ ৭৫ হাজার অর্থাত্ প্রতি আধা সেকেন্ডে একটি শিশু নতুন করে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে! ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ২৫ শতাংশের বয়সই হচ্ছে ১০ বছরের কম এবং ফেসবুকসহ সব ধরনের সোশ্যাল মিডিয়ার ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারীর বয়স ১৮ থেকে ২৯-এর মধ্যে। জার্নাল অব ইউথ স্টাডিজ জানাচ্ছে, আমেরিকার শিশু-কিশোরদের ৯২ ভাগই প্রতিদিন অনলাইনে যায়। প্রতি পাঁচজনের একজন কিশোর গভীর রাতে ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে শুধু এটা দেখার জন্য যে তার মোবাইলে নতুন কোনো মেসেজ এসেছে কি না। আজ এটা আন্দাজ করা কঠিন কিছু নয় যে বাংলাদেশের দৃশ্যও এর চেয়ে আলাদা নয়।

শিশু-কিশোরদের ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস আসক্তি কমানোর জন্য পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ়করণসহ পারিবারিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ একান্তই প্রয়োজন। তাদেরকে দৈনন্দিন খেলাধুলা, শরীরচর্চা, বইপড়া, ঘরের কাজ, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রাণবন্ত আড্ডা, সৃজনশীল কাজে উত্সাহ প্রদান, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে বেড়ানো ও বিনোদনের ব্যবস্থা করাসহ সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। করোনাকালে শিক্ষাব্যবস্থাকে সচল রাখতে ‘অনলাইন কার্যক্রম চালু’ করে বাংলাদেশ সরকার। এর সুবিধা আছে ঠিকই কিন্তু অসুবিধাও কম নয়। কারণ এই সুযোগে কিছু কিশোর-কিশোরী এর অপব্যবহার করছে, যা অনেক বাবা-মা বুঝতে পারছেন না। আবার ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে ‘কিশোর গ্যাং’। ২০১৭ সালে উত্তরায় কিশোর আদনান হত্যার পর কিশোর গ্যাং কালচার প্রথম আলোচনায় আসে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ১৮ বছর বয়সিদের শিশু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সেটি দুর্বল। কারণ তাদের বিচার, গ্রেফতার পদ্ধতি আলাদা হয়ে থাকে।

আসলে উঠতি বয়সের কিশোরেরা ভালো-খারাপের ভেদাভেদ বুঝতে পারে না। ২০১৭ সালে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর জরিপে দেখা গেছে, অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়ার মধ্যে ৭৭ ভাগ শিক্ষার্থী পর্নগ্রাফিতে আসক্ত। আমরা জীবনের তাগিদে পার্থিব সব মেকি সুখের পিছনে অবিরাম ছুটতে থাকি। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি—ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে আমাদের সন্তানেরা। আমাদের মূল সম্পদ যদি রক্ষা করতে না পারি, তাহলে আখেরে তা দায়ে পরিণত হয়ে নিজেদের তো বটেই, সমাজ ও দেশের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই শত ব্যস্ততার মাঝেও সন্তানদের সময় দিতে হবে। সুদৃঢ় করতে হবে পারিবারিক বন্ধন। সন্তানের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্বই পারে তাদের ফেরাতে।

বরিশাল