বন্যার পানি নেমে গেছে। আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরেছেন লোকজন। তিস্তা নদীর পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্যার পানি নেমে গেলেও রেখে গেছে ক্ষয় ক্ষতির চিহ্ন। বন্যার পানির স্রোতে বসত বাড়ি যেমন ভেঙ্গেছে তেমনি জমির উঠতি ফসলও নষ্ট হয়ে গেছে। সব মিলে এবারের বন্যায় লালমনিরহাটের তিস্তা পাড়ের লোকজনের অপূরণীয় ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ কত তা সঠিকভাবে দিতে পারেনি কোন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।
আকস্মিক এ বন্যায় লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নসহ জেলার পাটগ্রাম, কালীগঞ্জ, আদিতমারী, হাতীবান্ধা ও সদর উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী এলাকাগুলোর হাজার হাজার পরিবার শুধু পানিবন্দি হয়নি, পানির স্রোতে অনেকের বসত বাড়িও ভেঙ্গে গেছে। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোর অধিকাংশ কাঁচা পাকা রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট ভেঙ্গে গেছে। হাজার হাজার জমির ধান, ভুট্টা, আলু ও বাদামসহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট হয়েছে গেছে। অনেক জমিতে বালু পড়ে চর জেগে উঠেছে।
এ দিকে বন্যার পানির চাপে তিস্তা ব্যারাজ ফ্লাড বাইপাস ও কাকিনা-মহিপুর সড়ক ভেঙ্গে যাওয়ায় লালমনিরহাটের সঙ্গে রংপুর ও নীলফামারীর সড়ক যোগাযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে। পানি তোড়ে আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের সলেডি স্পার-২ যাওয়ার পাকা রাস্তাসহ রজবপাড়া এলাকার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা পাড়ের কৃষক সফিকুল ইসলাম জানান, আর কয়েকদিন পর ক্ষেতের আমন ধান কেটে ঘরে তোলার কথা ছিল। আশা ছিল এবার আমন ধানে গোলা ভরে যাবে। তার স্বপ্ন এক নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। আকস্মিক বন্যায় তার সাত বিঘা জমির আমন ধান নষ্ট হয়ে গেছে।
আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নে বাহাদুর পাড়া গ্রামের বাসিন্দা আফজাল হোসেন (৫৫) বলেন, আমার জীবনে এমন আকস্মিক বন্যা দেখিনি। হঠাৎ পানি এসে ক্ষেতের ধান ডুবিয়ে দিল। সব ধান নষ্ট হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে সেগুলো এখন গো খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করেছি। তিনি আরও জানান, রাতভর না খেয়ে খাটের উপর একটি চেয়ারে বসে কাটিয়েছি। কি যে কষ্ট তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়।
হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তাপাড়ের ডাউয়াবাড়ী গ্রামের কৃষক কবির হোসেন বলেন, অকাল বন্যায় চরম ক্ষতির মুখে পড়েছি। আট বিঘা জমিতে ভুট্টা লাগিয়েছিলাম। সবগুলো ভুট্টাই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষেতে দেওয়ার জন্যে সার কিনে বাড়িতে রেখেছিলাম। বন্যায় সেগুলোও নষ্ট হয়েছে। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আমরা চরে ভুট্টা চাষ করি। আকস্মিক বন্যা আমাদেরকে আরও বেশি ঋণগ্রস্ত করে দিয়েছে।
লালমনিরহাট কৃষি সস্প্রসারণ, প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও মৎস্য বিভাগ সূত্র জানায়, উজানে ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে মঙ্গলবার রাত থেকে তিস্তার পানি অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে। বুধবার সকালে এক নিমিষেই তিস্তার পানিতে প্লাবিত হয় নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলো। ১৫ হাজার একরের বেশি জমির ফসল বন্যায় তলিয়ে গেছে। দেড় শতাধিক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। পানির তোড়ে খামারের বিপুল সংখ্যক হাঁস-মুরগিও ভেসে গেছে।
লালমনিরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফ আলী খাঁন বলেন, কাকিনা-রংপুর সড়কসহ জেলার বিভিন্ন জায়গায় রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এসব রাস্তাঘাট সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হবে।
লালমনিরহাট কৃষি সস্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক শামিম আশরাফ বলেন, অকাল বন্যায় কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফসলের খেত এখনো পানির নিচে। কৃষিতে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে কৃষি বিভাগ মাঠে কাজ করছে।
ইত্তেফাক/ইআ