বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি: পৌর মেয়র আব্বাসের বিরুদ্ধে উত্তাল রাজশাহী

রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার মেয়র আব্বাস আলীর একটি অডিও ক্লিপ ভাইরাল হওয়ার পর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে স্থানীয় রাজনীতির মাঠ। ক্লিপটিকে তাকে বলতে শোনা যায়, বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল করা ‘পাপ হবে’। মেয়র আব্বাসের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মাঠে নেমেছেন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা ও জনপ্রতিনিধিরা। তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় মামলাও হয়েছে। এমনকি তাকে কাটাখালি পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়কের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেছেন মেয়র আব্বাস আলী। তিনি অফিস করছেন না। মোবাইল ফোনও বন্ধ। আব্বাসের শ্বাশুড়ি ফাহিমা বেগম পবার পারিলা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হয়েছেন। আগে ভোটের মাঠে আব্বাস আলী ব্যস্ত থাকলেও গত মঙ্গলবার থেকে তাকে দেখা যাচ্ছে না। কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেও জানা যায়নি আব্বাস আলী এখন কোথায় আছেন। তবে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে আব্বাস আলী বলেছেন, অডিওটি এডিট করা। এসব কথা তিনি কাউকে বলেননি। তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে লালন করেন।  

এক সংবাদ সম্মেলন থেকে মেয়র আব্বাসকে দল ও মেয়রের পদ থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ। পৌর মেয়র আব্বাস আলী ধৃষ্টতাপূর্ণ অবমাননাকর মন্তব্য করায় তার শাস্তি চেয়ে বৃহস্পতিবার (২৫ নভেম্বর) এ সংবাদ সম্মেলন করা হয়। বলা হয়, ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ মিডিয়াতে আব্বাস আলীর মন্তব্য প্রচার হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির অনুভূতি ও আবেগের জায়গা। তাকে নিয়ে কটূক্তি ও অশোভন মন্তব্য করা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে আব্বাসের এমন কটূক্তি ও অবমাননাকর মন্তব্যে সারাদেশের মানুষের মতো মহানগর আওয়ামী লীগ চরমভাবে মর্মাহত।

আরও বলা হয়, এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন রাজশাহী মহানগরীকে আধুনিক তিলোত্তমা নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সু-শোভায় সজ্জিত করার লক্ষ্যে রাজশাহী মহানগরের মূলপ্রবেশ দ্বারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল স্থাপনের পাশাপাশি সৌন্দর্য বর্ধনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালকে নিয়ে আব্বাসের ঔদ্ধত্যপূর্ণ অবমাননাকর মন্তব্য জাতি সমর্থন করে না। তার এমন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য দেশের সুষ্ঠু রাজনীতির পরিবেশকে অস্থিতিশীল করতে ইন্ধন যোগাবে বলে মনে করে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ। 

মহানগর আওয়ামী লীগের সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার। উপস্থিত ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আলী কামাল, শফিকুর রহমান বাদশা, সাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইশতিয়াক আহমেদ লিমনসহ প্রমুখ।

মেয়র আব্বাস পবা উপজেলার কাটাখালী পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার বক্তব্যের বিষয়ে বুধবার বিকালে জরুরি সভা করেছে উপজেলা আওয়ামী লীগ। সভায় তাঁকে আহ্বায়কের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। 

পবা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইয়াসিন আলী জানান, উপজেলা আওয়ামী লীগ তাকে বহিষ্কার করতে পারে না। তাই পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে। তিনদিনের মধ্যে তাঁকে জবাব দিতে হবে। এই জবাব আসার পর পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য কাগজপত্র আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পাঠানো হবে।

এদিকে আব্বাসের শাস্তির দাবিতে মাঠে নেমেছেন কাটাখালী পৌর আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, মহানগর আওয়ামী লীগ, সাবেক ছাত্রলীগ ফোরাম, জেলা ও মহানগর যুবলীগ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ, জেলা আওয়ামী লীগ, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন। এছাড়া বঙ্গবন্ধুকে অবমাননার প্রতিবাদে ছাত্রমৈত্রীর জেলা ও মহানগর প্রতিবাদ সভা করেছে।

সাহেবাবাজারে ওয়ার্কার্স পার্টির কার্যালয়ে সভায় বক্তারা বলেন, মেয়র আব্বাস জামায়াতের পৃষ্টপোষক। তিনি আওয়ামী লীগের লেবাসে অন্তরে রেখেছেন সাম্প্রদায়িকতা। সভা থেকে আব্বাস আলীর শাস্তি দাবি করা হয়। মেয়র পদ থেকে তকে অপসারণেরও দাবি তোলেন বক্তারা। অন্যদিকে মেয়রের অডিও ক্লিপ ইস্যুতে এলাকায় উত্তেজনা থাকায় কাটাখালী বাজারে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। দুপুরে বিক্ষোভ চলাকালে কয়েকজন নেতাকর্মীরা কাটাখালী বাজারের ‘আব্বাস চত্বর’-এ ভাঙচুরের চেষ্টা করে। এতে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় উত্তেজনা দেখা দেয়। 

গত সোমবার রাতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবদুল মমিন বোয়ালিয়া থানায়, ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন আনার রাজপাড়া থানায় এবং ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তৌহিদুল হক সুমন চন্দ্রিমা থানায় মেয়র আব্বাসের বিরুদ্ধে মামলা করতে এজাহার দাখিল করেন। তবে পুলিশ মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আব্দুল মমিনের এজাহার বুধবার রাতে মামলা হিসেবে রেকর্ড করেছে। একই অভিযোগের জন্য একই আইনে এজাহার দেওয়ায় অন্য দুটি মামলা রেকর্ড হয়নি।

এর আগে গত সোমবার রাত থেকে দুটি অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে। বলা হচ্ছে অডিও দু’টির কথোপকথন আব্বাসের। একটি অডিওতে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নির্মাণ করলে ‘পাপ হবে’ এমন কথা বলতে শোনা যাচ্ছে। অন্যটিতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের সমালোচনা করা হচ্ছে। ঘরোয়া বৈঠকের ওই কথোপকথমে অশ্লীল ভাষায় গালাগালও রয়েছে। অডিও দু’টি ছড়িয়ে পড়লে রাজশাহীতে তোলপাড় শুরু হয়।