শীত ফ্যাশনে শাল

শীতবস্ত্র হিসেবে শালের প্রচলন বেশ পুরনো। মা-খালারা শাড়ির আঁচলের সঙ্গে জুড়ে নিতেন শাল বা চাদরের আঁচল। আরেকটু অতীতে তাকালেই মিলবে সাম্রাজ্যে রাজত্ব করা রাজা-মহারাজারা আভিজাত্যের উপঢৌকন হিসেবে কাঁধে ঝুলিয়ে নিতেন বাহারি কারুকাজ করা শাল। সেকেলে বণিকরা এমনকি গ্রামের মাতব্বররা কাঁধে শাল বা চাদর ঝুলিয়ে নিতেন পারিবারিক ঐতিহ্য বা আভিজাত্য হিসেবেই। শীত নিবারণের জন্যে যত আধুনিক পোশাকই থাকুক না কেন অনুভূতির জায়গা জুড়ে শাল বা চাদরের গ্রহণযোগ্যতা সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়। বর্তমান সময়ে শীতের আধুনিক এতসব পোশাক থাকতেও শীত নিবারণের পাশাপাশি সাজসজ্জায় শাল বা চাদরকে এক বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হয়। হালকা বুননের পশমি শাল বা চাদরে সহজেই কাবু করা যেতে পারে শীতকে। শুধু শীতের পোশাক হিসেবেই নয়, ফ্যাশন অনুষঙ্গ হিসেবেও তরুণ প্রজন্মের কাছে শাল-চাদরের রয়েছে আলাদা কদর। শালের ফ্যাশন ট্রেন্ডেও আসে নতুনত্ব। দেশি-বিদেশি সব রকম শাল বেশ জনপ্রিয়। সেকাল থেকে একাল-শীত ফ্যাশনে শালের কদর ঊর্ধ্বগামী বলা চলে। বর্তমান সময়ে ছেলেমেয়ে উভয়ই শীতের ফ্যাশন হিসেবে শাল-চাদর ব্যবহার করেন।

shal-1

তরুণীরা শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, জিন্স, ফতুয়া, স্কার্ট সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে পরছেন ফ্যাশনবল শাল। বিভিন্ন রং, নকশা, কাটিং, ডিজাইন সব বয়সী নারীর সঙ্গে মানিয়েও যায় বেশ। শীতের সময় উষ্ণতা পেতে শাল তো নিত্য পরিধেয় বস্ত্র। অষ্টপ্রহর ঘরের কাজেই হোক আর অফিস যাওয়ার সময়ই হোক, শাল প্রচলিত শীতপোশাক। তবে নিত্য যখন আসে নতুনত্ব, ফ্যাশনধারায় আনে বৈচিত্র্য। দেশি শালের মধ্যে বাঙালি মেয়েদের প্রথম পছন্দ খাদি শাল। খাদি কাপড়ে এমনিতেই আলাদা একটা স্ট্রাকচার আছে। যে কারণে খুব বেশি নকশা করার দরকার পড়ে না। তারপরও খাদি শালের নকশায় এখন নতুনত্ব আনা হচ্ছে। খাদি ছাড়াও তাঁতের শাল, উলের শাল, পশমি চাদর বা শাল টাঙ্গাইলের শাল বাজারে বেশ জনপ্রিয়। দাম তুলনামূলকভাবে কম বলে এ শালগুলো সব শ্রেণীর মানুষ কিনতে পারে। তাছাড়া প্রতি বছর যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নকশা। তাতে কখনও উঠে আসছে প্রিন্ট, অ্যাম্ব্রয়ডারি, হাতের কাজ, সিকোয়েন্সের কাজ, জরি, চুমকি, পুঁতির কাজ তো কখনো দু’রঙের ব্যবহার ও কয়েক টুকরো কাপড় একসঙ্গে জোড়া নকশা প্রভৃতি দেখা দেখা যাচ্ছে। নানা রকম রঙের উপর তৈরি শালগুলো ফ্যাশন্যাবল কিশোরী, তরুণীদের আকৃষ্ট করে। একরঙা পাতলা ওড়না শালগুলো হালকা শীতের জন্য আরামদায়ক এবং আকর্ষণীয়। টুকরো টুকরো কাপড় জুড়েও এখন শালে করা হচ্ছে ডিজাইন। যাকে বলা হয় প্যাচওয়ার্ক। এ শালগুলোর প্রতিও এখন অনেকের আগ্রহ রয়েছে। প্যাচওয়ার্কে থাকে বহু রঙের সমাহার। একরঙা শালের কিছু অংশেও প্যাচওয়ার্কের কাজ পাওয়া যায়। সিল্কের কাপড়ের ওপর নকশিকাঁথার ফোঁড় এপার-ওপার ঘুরে বেরিয়েও নকশা তুলে নিয়ে আসে শালে। টাইডাই, ব্লক প্রিন্ট তো পুরোনো গল্প, তারপরও এখনো ঐতিহ্যের সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। গত বছর থেকে আমাদের দেশেও ভেলভেটের শালের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। ভেলভেটের শালে যেমন উষ্ণতা পাওয়া যায়, তেমনি তা গর্জিয়াস লুক আনে। কারচুপি, স্যামো সি‌েÍড়র পাইপিং, অ্যাম্ব্রয়ডারি, হ্যান্ড পেইন্টসহ নানা ধরনের কাজ উঠে আসছে ভেলভেটের শালে। শালের চারপাশে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে ফ্রিল, টার্সেল। চিরাচরিত কালো, মেরুন বা নীল রং ছাপিয়ে ফ্যাশনধারায় উঠে এসেছে হালকা বেগুনি, সি-গ্রিন, পিচ-গোলাপি, জলপাই-সোনালি, পেস্ট, সর্ষে-হলুদ, হালকা ছাই রং আর সুরমা রং। অন্যদের চেয়ে আলাদা দেখাতে ভিন্ন ধাঁচের রং বেছে নেওয়া যেতে পারে। এসবের বাইরেও বিদেশি শাল লুধিয়ানা, জয়পুরি, চায়নিজ, বার্মিজ ও ইরানি শালও হতে পারে শীতের সঙ্গী। কাশ্মীরি শালের মধ্যে পশমিনা শাল জনপ্রিয়তার শীর্ষে। নেপাল থেকেও পশমিনা সংগ্রহ করেন কেউ কেউ। এখন দেশেও তৈরি করা হচ্ছে এই শাল। দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলো এরই মধ্যে নানা রকম শালের কালেকশনে সাজিয়েছে তাদের শীত সমাহারে। শালের নকশায় উঠে আসছে দেশীয় ঐতিহ্য, সুন্দর এসব শালে সাজতে সচেতন নতুন প্রজন্ম।

shal-2

অঞ্জন’স-এর প্রধান নির্বাহী শাহীন আহম্মেদ জানান, প্রতিবারের মতো এবারের শীতকে কেন্দ্র করে শীত পোশাক আয়োজন করেছে অঞ্জন’স। সাধারণত দেশীয় মেটেরিয়াল নিয়ে করা হয়েছে বিভিন্ন কাজ। বিভিন্ন কাপড়ের সঙ্গে মিল রেখে এবারও তৈরি করা হয়েছে নতুন ডিজাইনের শাল। হালকা ও উজ্জ্বল রঙে সাজানো হয়েছে এবারের শীত আয়োজন। সাদা, নীল, কালো ও লালসহ বিভিন্ন উজ্জ্বল রঙ বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। ডিজাইনে রয়েছে বেশ বৈচিত্র্যতা। কটন, লিনেন কটন কাপড়ে, মাধ্যম হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে স্ক্রিন প্রিন্ট, ব্লক প্রিন্ট, এ্যামব্রয়ডারি ও কারচুপি। তাছাড়া শালের ডিজাইনে এপ্লিক, মেশিন এম্ব্রয়ডারি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। রঙ বৈচিত্রে্যর শীতের ক্যাজুয়াল ও পার্টি ওয়ার হিসাবে অঞ্জন’স-এর ট্রেন্ডি পোশাকগুলো সবসময় ভাইব্র্যান্ট উইনটার লুক দিয়ে থাকে।

ফ্যাশন এবং স্টাইলে আজকাল মেয়েদের থেকে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই ছেলেরা। বিয়েবাড়ি হোক বা পার্টি কিংবা ঘরোয়া আড্ডায় সব জায়গায় মেয়েদের সাথে পাল্লা দেয় ফ্যাশনে। শীতের ফ্যাশনেও আজকাল তাক লাগিয়ে দিচ্ছে ছেলেরা। জ্যাকেট, ব্লেজার, ওয়েস্ট কোটের পাশাপাশি শালও আজকাল জমিয়ে ফ্যাশন করছেন পুরুষরা। সাধারণত পায়জামা-পাঞ্জাবির সঙ্গে শাল সবচেয়ে বেশি মানানসই। তবে শার্ট-জিন্সের সঙ্গেও শাল মানিয়ে যায় বেশ। নারীদের তুলনায় পুরুষদের শাল একটু বড় হয়ে থাকে। ছেলেদের শালগুলো কিছুটা সাদামাটা। তবে হালকা ডিজাইনে ছেলেদের শালে নান্দনিক সৌন্দর্য ফুটে উঠে। পোশাকে আধুনিকতা এলেও বদলে যায়নি আমাদের প্রথা ও সংস্কৃতি। খাদি, উল, কটন কাপড়ের, হাতে বোনা মোটা কটনের শাল রয়েছে ছেলেদের জন্য। এছাড়াও কাশ্মিরি, দেশি সিল্কের শাল পাওয়া যায়। রঙে ও নকশায় এসব শালে রয়েছে ভিন্নধর্মী লোকজ আমেজ। এখন শালের রঙ ও নকশায় এসেছে অনেক পরিবর্তন। নকশায় ডিজাইনাররা ফুটিয়ে তোলেন ভাষা অন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্যসহ দেশের বিভিন্ন লোকজ ঐতিহ্য। একদিকে যুগের সাথে তাল মেলানো আভিজাত্যে পরিপূর্ণ পোশাকও পড়া হয়, অন্যদিকে কনকনে শীতেও সমস্ত শরীরকে উষ্ণতার ছোঁয়া পাওয়ানো সম্ভব হয়। বিশ্বায়নে অংশগ্রহণ করে দেশি সংস্কৃতিকে সামনে রেখেই শীতের মতো প্রতিটি ঋতু কাটানো হোক বাংলার জীবনকথায়।