উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ পদত্যাগ না করায় নতুন কর্মসূচি নিয়েছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পুলিশ ও সংবাদকর্মী ছাড়া উপাচার্য বাসভবনে কেউ যেন প্রবেশ করতে না পারেন, সেজন্য তারা ঘেরাও করে রেখেছেন। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তারা উপাচার্যের বাসভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
রবিবার (২৩ জানুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। এই সময় তারা ঘোষণা দেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়া উপাচার্যের বাসভবনের ভেতরে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হবে না।
আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে শাবি শিক্ষার্থী মোহাইমিনুল বাশার বলেন, 'আমরা উপাচার্যের বাসার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি। উনার পদত্যাগ দাবিতে আমাদের মধ্য থেকে যারা অনশন করছে, তারা দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অথচ উনার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।'
এদিকে রবিবার সন্ধ্যায় অনশনের ১০০ ঘণ্টা পার হয়। তবু কোনো সমাধান না হওয়ায় তারা সন্ধ্যায় মশাল মিছিল বের করেন। বুধবার ২৩ জন অনশনে বসেন। তাদের সঙ্গে নতুন করে আরও পাঁচজন যোগ দিয়েছেন।
সংকট নিরসনে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীরা। শাবির আইআইসিটি ভবনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের মধ্যস্থতায় এ ভার্চুয়াল আলোচনা শুরু হয়। আলোচনায় শিক্ষামন্ত্রী অনশনকারীদের অনশন ভাঙার জন্য আহ্বান জানান। তবে উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ পদত্যাগ করা আগ পর্যন্ত তারা অনশন ভাঙতে নারাজ। এখনো পর্যন্ত কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি উভয়পক্ষ।
শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা
শাবির সংকট নিরাসনে শিক্ষামন্ত্রীর সাথে দফায় দফায় আলোচনা করছেন শাবির আন্দোলনকারীরা। কিন্তু এ পর্যন্ত কোন সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি উভয়পক্ষ। গত ১৩ জানুয়ারী থেকে একটি ছাত্রী হলের মামুলী সমস্যাকে কেন্দ্র করে ঐ হলের প্রোভোষ্টের পদত্যাগ দাবি করেন ঐ হলের ছাত্রীরা। কিন্তু সঠিক সময়ে ঐ সমস্যার সমাধানে ব্যর্থ হওয়ায় শাবি ক্যাম্পাপসে পুলিশের হামলা,গুলি চালানো ও শিক্ষার্থীরা আহত হওয়ার ঘটনায় ক্যাম্পাস উত্তাল হয়ে উঠে। এক পর্যায়ে পুলিশী তৎপরতার জন্য শিক্ষার্থীরা ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিনকে দায়ি করে তারা আন্দোলন শুরু করেন।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা দিয়ে আবসিক শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তা না মেনে একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন সহ বিভিন্ন ভবনে উল্টো তালা ঝুলিয়ে দিয়ে তারা হলেই অবস্থান করতে থাকে এবং ভিসির পদত্যাগের দাবিতে তার বাসভবনের সামনে থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করেন।
অন্যদিকে শাবি শিক্ষকরা আলোচার মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা করতে বিভিন্ন সময় আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলেন, কিন্তু আন্দোলনকারীরা ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিনের পত্যাগের দাবিতে অনড় থাকায় আলোচনা আর আগায়নি। তীব্র শীতে খোলা আকাশের নিচে অনশনকারীরা দিনে দিনে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সংবাদে সিলেট সহ সারা দেশে শঙ্কা বিরাজ করছে।
উদ্ভুত পরিস্থিতিতে রবিবার (২৩ জানুয়ারি) দিবাগত রাত ২টার দিকে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা শুরু করে আন্দোলনকারীরা। শাবির আইআইসিটি ভবনে আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক স¤পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের মধ্যস্থায় এ ভার্চুয়াল আলোচনায় শিক্ষামন্ত্রী অনশনকারীদের অনশন ভাঙার জন্য জোর আহ্বান জানান। তবে তারা ভিসির পদত্যাগ করার আগ পর্যন্ত অনশন ভাঙতে সম্মত হয়নি। এসময় শিক্ষা মন্ত্রী শাবির ভিসির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো মনযোগ দিয়ে শুনে একপর্যায়ে, অভিযোগগুলো লিখিত আকারে তাকে (শিক্ষামন্ত্রী) দেওয়ার জন্য বলেন। আন্দোলনকারীরা রবিবার দুপুর ২টার দিকে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে পরের দফায় আলোচনার সময় তুলে ধরবেন বলে জানান।
তবে, এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (রবিবার রাত ৭ টায়) শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আর আলোচনা হয়নি। এর আগে শুক্রবার দুপুর হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত আরো দু'দফা আলোচনা হয় শিক্ষামন্ত্রীর সাথে। এই আলোচনায় শিক্ষামন্ত্রী আন্দোলনকারীদের একটি প্রতিনিধি দলকে ঢাকায় যাওয়ার জন্য বলেন। প্রথমে আন্দোলনকারীরা ঢাকায় যেতে রাজি হলেও পরে তারা মত পাল্টিয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে আলোচনার জন্য সিলেট আসার আহ্বান জানান। আর তা যদি সম্ভব না হয় তাহলে ভার্চুয়ালি আলোচনা করার আহ্বান জানান।
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা
এদিকে আন্দোলনকারীদের একাত্মতা জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী। মাহফুজুর রহমান ও নাঈম হাসান নামের এ দুই শিক্ষার্থী ঢাকা থেকে এসে গতকাল রবিবার শাবির ভিসি‘র বাসভবনের অবস্থান নিয়ে এ সংহতি প্রকাশ করেন। এসময় তারা বলেন, অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ পদত্যাগ না করলে তারা ঢাবি থেকেও আন্দোলন শুরু করবেন। এক ভার্চুয়াল মিটিং শেষে রবিবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে, ছাত্রলীগ নেতারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শিক্ষার্থীদের এ নায্য দাবি মেনে নিয়ে সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়েছেন।
সহিংসতার দায় নেবে না আন্দোলনকারীরা
আমরণ অনশনের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দেশের বাহিরে যারা একাত্বতা পোষণ করেছেন তাদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে তারা বলেন, এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কেউ যদি তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করতে চায় এবং সহিংসতায় জড়ায় তবে তার দায়ভার কোনোভাবেই আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিবে না। রবিবার গণমাধ্যম প্রেরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষকদের বিবৃতি
শিক্ষামন্ত্রীর সাথে শাবির আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় বৈঠক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের উপর হামলার ঘটনায় বিবৃতি দিয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষকরা। এতে উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য দায়িত্বরত প্রশাসন দায় এড়াতে পারে না বলে জানান তারা।
শনিবার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেন এই পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মস্তাবুর রহমান। এতে দায়িত্বরত ব্যক্তিদের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন এ শিক্ষকবৃন্দ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের জীবন বিপন্ন হতে চলেছে। এমতাবস্থায় শিক্ষক হিসেবে আমরা শুরু থেকেই চলমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে লক্ষ করছি যে, দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের আক্রমণের ব্যাপারে কোনো অফিশিয়াল ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে না-দিয়ে কালক্ষেপন করে অনশনরত শিক্ষার্থীদের জীবন চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।
এতে বলা হয়, আমরা চরম হতাশার সঙ্গে লক্ষ করেছি এ সংক্রান্ত একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও বাস্তবে উল্লেখিত তদন্তকমিটি কোনোরকম অগ্রগতি করেছে বলে দৃশ্যমান হচ্ছে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে-যাওয়া ঘটনার দায়ভার কোনোভাবেই প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এড়াতে পারেন না। এমতাবস্থায়, আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে যাবতীয় বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ব্যক্তিদের প্রত্যেকের অফিশিয়াল ব্যাখ্যা জনসমক্ষে উপস্থাপন করার দাবি জানায়।