গত শনিবার দুপুরে আকস্মিকভাবে যেন ‘শনির দশা’ নেমে এলো নেপালবাসীর কপালে। স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৫৬ তে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রচণ্ড গতিতে কেঁপে উঠল হিমালয় পাদদেশীয় গোটা অঞ্চল। প্রকৃতির এই নির্মম ধাক্কায় দুই সহস্রাধিক লোকের প্রাণহানি এবং সম্পদের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই কমে আসছে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে প্রাণ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা। দু’দিন পেরিয়ে গেলেও জীবিতদের উদ্ধারে মরিয়া নেপাল। সরকারি বেসরকারি উদ্ধার কর্মীদের হাতে হাত মিলিয়ে ঐ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষও। স্বজন হারিয়ে আর দৈনন্দিন জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ঐতিহাসিক মন্দির ও স্থাপনাগুলোকে মাটির সাথে মিশে থাকতে দেখে অনেকেই হতভম্ভ, অশ্রুসজল। ভূমিকম্পে প্রাণভয়ে যারা বাড়ি ছেড়ে উন্মুক্ত স্থানে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেই সব আতঙ্কিত নারী ও শিশুরাও ঘরে ফিরতে নিরাপদ বোধ করছেন না। খোলা আকাশের নিচেই রাত কাটাচ্ছেন তারা। কারণ পরিমাণে খুব সামান্য হলেও কিছুক্ষণ পরপরই কম্পন অনুভব করছেন তারা। অনেক ফাঁকা স্থান পরিণত হয়েছে উন্মুক্ত হাসপাতালে। দেয়া হচ্ছে অপ্রতুল চিকিত্সা সেবা। উদ্ধার ও ত্রাণ কাজে আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে নেপাল সরকার। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে সহায়তার হাত বাড়িয়ে কাঠমাণ্ডুর পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন দেশ।
শক্তিশালী এই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল নেপালের জনবহুল রাজধানী কাঠমাণ্ডু এবং পোখরা নগরীর ঠিক মাঝামাঝি এলাকায় ভূ-পৃষ্ঠের মাত্র ১৫ কিলোমিটার নিচে। এতে মাটির সাথে মিশে যায় নেপালের অসংখ্য ঘরবাড়ি, প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। কাঠমাণ্ডু ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বসন্তপুর, থামেল, নরদেবী ও ঝোছেন এলাকার ঘরবাড়ি। বিশেষ করে মাটির সাথে মিশে গেছে বসন্তপুর দুর্বার স্কোয়ার ও পতন দুর্বার স্কোয়ার। আর কোন দিনই উপভোগ করা যাবে না পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় এই প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী।
তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতিক্ষতি হয়েছে ভূমিকম্প কেন্দ্রস্থলের চারপাশের মানুষের জীবনের। নিহত হয়েছে দুই সহস্রাধিক। আহত হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ। ভূমিকম্পে ভারতের বিহারে অন্তত ৪০ জন প্রাণ হারায়। তিব্বত ও বাংলাদেশেও হতাহতের ঘটনা ঘটে। এছাড়া মাউন্ট এভারেস্টের বেস ক্যাম্পে ভূমিকম্পের সময় ব্যাপক তুষারপাতের ঘটনা ঘটে। এতে বরফ চাপা পড়ে ঐ ক্যাম্পের অসংখ্য তাবু। মারা যান অন্তত ১৭ জন অভিযাত্রী। যাদের মধ্যে রয়েছে গুগলের নির্বাহী ড্যান ফ্রেডিনবার্গও।
ভূমিকম্পে ভেঙে পড়েছে নেপালের ঐতিহাসিক ভবন ধারারাসহ অসংখ্য মন্দির ও মঠ। এরপরও অন্তত ত্রিশবার প্রচণ্ড বেগে দুলে ওঠে সবকিছু। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাঠমাণ্ডু বিমানবন্দর ও স্টেডিয়াম। ভূমিকম্প কেন্দ্রস্থলের চারপাশে ভেঙে পড়া পুরোনো ও ঐতিহাসিক ভবনগুলোর নিচে ঠিক কতজন মানুষ চাপা পড়েছেন, তার কোনো হিসেব নেই। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ জানা না গেলেও সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কথা। এক কথায়, ধ্বংসের পরিমাণ ভয়াবহ এবং কল্পনাতীত। ভূমিকম্পের পরই জরুরি অবস্থা জারি করে নেপাল। কাঠমাণ্ডুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে জরুরিভিত্তিতে ত্রাণ ও উদ্ধার কাজে সাহায্য পাঠিয়েছে বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। নেপালের জন্য প্রাথমিকভাবে দশ লাখ মার্কিন ডলার সাহায্য ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন। আরো সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। তবে ৩৯ লাখ মার্কিন ডলার মানবিক সাহায্য দেয়ার কথা জানিয়েছে নরওয়ে। চীন পাঠিয়েছে ৬২ সদস্যের উদ্ধার বাহিনী। এই কাজে এগিয়ে এসেছে রেডক্রস, অক্সফাম, ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস এবং খ্রিস্টান এইডসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। সহায়তা দিচ্ছে ইউরোপ, ব্রিটেন, জার্মানি ও স্পেন।
নেপালের অনেক স্থানে এখনও ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়নি। তাই মৃতের সঠিক সংখ্যা আর বিপদাপন্ন মানুষের কথা জানা দুরুহ হয়ে পড়েছে। উদ্ধার কাজে খালি হাত আর হাতের যন্ত্রপাতিই একমাত্র সম্বল। কারণ প্রাচীন প্রত্যন্ত অনেক এলাকায় রাস্তা সরু হওয়ায় সেখানে যেতে পারছে না বুলডোজার। ফলে চাপা পড়া মানুষকে দ্রুত উদ্ধার করা নিয়েও সংশয় রয়েছে। ভূমিকম্প কেন্দ্রস্থলের কাছাকাছি এলাকা পরিণত হয়েছে ইটখোয়ার স্তূপে। ভূ-কম্পনের সময় অনেক জায়গায় ভূমিধসের ঘটনাও ঘটে। ফলে কোন কোন স্থানে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। ব্রিটিশ রেড ক্রসের মুখপাত্র পেনি সিমস তাই বলেছেন, নেপালের পরিস্থিতির সঠিক চিত্র উপলব্ধি করা খুবই কঠিন। এভারেস্টেও বরফ ধসে আহত অন্তত ৬১ জন অভিযাত্রীর উদ্ধারে হেলিকপ্টার পাঠানো হলেও মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়ার কারণে সেখানে তাদের পৌঁছাতেও দেরি হয়।