বিলাসিদের সারিতে ভারতীয় ধনীরাও

 
ভারতীয় শিল্পপতি বাবাগুথু রঘুরাম শেঠি প্রায় থিতু হয়ে গিয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ৪৫ মিলিয়ন দিরহাম (১২.২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) দিয়ে কিনে নিয়েছেন ৮২৮ মিটার উঁচু বুর্জ খলিফার ১০০তম ফ্লোরটি— যে গগনচুম্বী অট্টালিকাটির উচ্চতা নিউ ইয়র্কের এম্পায়ার স্টেইট বিল্ডিংয়ের দ্বিগুণ। শেঠি দুবাইয়ে থেকে স্বাস্থ্যসেবা ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের সাম্রাজ্য চালান। ফ্লোরটি কেনার পর এক ইমেইলে লিখেছিলেন, ‘আমি জানি অধিকাংশ ভারতীয়ই সারা জীবনে এ পরিমাণ অর্থের মুখ দেখে না। আমি এটি কিনেছি এর বিশ্বমানের স্থাপত্য ও আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা দেখে। সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি গর্বের বিষয়টিও আমাকে আকৃষ্ট করেছে। আমি আমার ফ্লোরে দাঁড়িয়ে সমস্ত দুবাই ও এর স্থাপত্য সৌন্দর্য্য দেখতে পাই।’
 
এমন বিলাস ও সৌন্দর্য্যের ব্যয়ভার বহন করা লোকের সংখ্যা ভারতে প্রচুর। যদিও অধিকাংশ ভারতীয় নাগরিক এখনও দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে, কিন্তু আল্ট্রা হাই নেট-ওয়ার্থ লোকের সংখ্যা (৩০ মিলিয়ন ডলার কিংবা তারও বেশি বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ যাদের রয়েছে) বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। ক্যাপজেমিনি ও আরবিসি ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট গ্রুপের একটি গবেষণায় উদঘাটিত হয়েছে আল্ট্রা হাই নেট-ওয়ার্থ লোকের সংখ্যার প্রশ্নে ভারতের অবস্থান বিশ্বে ষষ্ঠদশ। ২০১৩ সালে ১ লাখ ৫৬ হাজার মিলিওনেয়ারের আবাস ছিল সেখানে। বিশ্বের অতিধনীদের সম্পর্কে খোঁজখবর রাখা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন ওয়েল্থ-ইনসাইট তথ্য দিয়েছে, ২০১৮ সাল নাগাদ এ সংখ্যাটা দাঁড়াবে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫৭ তে। ভারতীয় ধনীদের তালিকায় তরুণ উদ্যোক্তা, শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি এবং উত্তরাধিকার সূত্রেই অগাধ অর্থবিত্তের মালিকদের সংখ্যাটাই বেশি। ওয়েলথ-ইনসাইট-এর তথ্যানুসারে, ২০১৪ থেকে ২০১৮ এ সময়ে ভারতের অতিধনীদের সম্পদ আরো ৪৪ শতাংশ বাড়বে এবং যার মূল্য দাঁড়াবে ২ ট্রিলিয়ন ডলারে।
 
ভারতীয় অতিধনীরা সম্পদ নিয়ে শুধু বসেই থাকে না, সে হারে খরচও করে। ফোর্বস ম্যাগাজিন তথ্য দিয়েছে, বিশ্বের বিলাসবহুল প্রায় সব গাড়িই আছে শেঠির সংগ্রহে। ভারতের অতিধনীদের সম্পদের ৪৪ শতাংশই রিয়েল এস্টেটের সঙ্গে বাঁধা। দুবাইয়ের সুউচ্চ বুর্জ খলিফাসহ অনিন্দ্য স্থাপত্য শৈলীগুলোর বিদেশি ক্রেতাদের অধিকাংশই ভারতীয়। ১৬০ ফ্লোরের বুর্জ খলিফার ডেভেলপার এমার প্রপার্টিজ এর পাবলিক রিলেশান এজেন্সি এএসডিএ’এর বার্সন মার্সটেলার-এর সহযোগী হিসাব পরিচালক নিভাইন উইলিয়াম সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, ‘আমাদের বিদেশি বিনিয়োগকারীদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ভারতীয়রা। চার ঘণ্টা ফ্লাইং ডিস্টেন্স-এর দুবাইয়ে থাকে প্রচুর ভারতীয় এবং দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক সুদৃঢ়। পাম গাছের মতো দেখতে বিশ্বের সর্ববৃহত্ কৃত্রিম দ্বীপ পাম আইল্যান্ডসহ দুবাইয়ের প্রায় সব লাক্জারি প্রোপার্টিজ-এর ক্রেতাদের একটা বড় অংশই হচ্ছে ভারতীয়। ইংল্যান্ডেও প্রায় একই অবস্থা। মেফেয়ারের মতো প্রধান আবাসিক এলাকাগুলোয় ভারতীয়দের ভিড় বাড়ছে তো বাড়ছেই। এসব স্থানে মোট ক্রেতার ২৫ শতাংশই ভারতীয়। উইদারেল এস্টেট এজেন্সি জানিয়েছে, মেফেয়ার প্রোপার্টিজ-এ ব্রিটিশ-ভিত্তিক ক্রেতাদের পরের স্থানটিতেই রয়েছে তারা। ২০১৩ সালে সেন্ট্রাল লন্ডনে (মেফেয়ার, সেন্ট জন্স উড বেলগ্রাভিয়া যার মধ্যে পড়ে) ২২১টি আবাসিক সম্পত্তি ক্রয়ে ভারতীয়রা ব্যয় করেছিল ৪৫০ মিলিয়ন পাউন্ড (৭০৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)। ভারতীয় ক্রেতারা ইদানীং মেফেয়ারে বাড়ি কেনার পেছনে ব্যয় করছে ১ থেকে ২০ মিলিয়ন পাউন্ড।  মেফেয়ারের সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হোটেলের মালিকও ভারতীয়। যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশিদের সম্পত্তি কেনার প্রশ্নে ভারতীয়রা রয়েছে চার নম্বরে। প্রথম তিনটি স্থান যথাক্রমে কানাডীয়, চীনা ও মেক্সিকানদের।
 
শুধুমাত্র বাড়ি-গাড়ি কিনেই ক্ষান্ত থাকছে না ভারতের অতিধনীরা।  স্ট্যাটাসের প্রতীক এখন প্রাইভেট বিমানও। বৈশ্বিক ব্যক্তিগত বিমান বাজারের ১২ শতাংশ ভোক্তা ভারতীয়। তাদের সম্পদশালীদের কাছে সব মিলিয়ে রয়েছে ১৩২টি ব্যক্তিগত বিমান, যেগুলোর মূল্য ৩১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত। শীর্ষ বিজনেস ব্যারন মুকেশ ও অনিল আম্বানি (দুই ভাই), বিজয় মাল্লিয়া, লক্ষ্মী মিত্তাল, রতন টাটা ও গৌতম সিংহানিয়া- এদের সবারই রয়েছে ব্যক্তিগত বিমান। বিলাসবহুল তরী ও ইয়টের ভোক্তার সংখ্যাও ভারতে কম নয়।