নৌকায় চড়ে মৃত্যুপানে

 
অনেকে একে বলছেন মৃত্যুর নেশা। কথাটা বহুলাংশে ঠিক। মানুষ দেখছে, শুনছে অবৈধপথে বিশাল সাগর সামান্য একটা নৌকায় পাড়ি দিয়ে কিভাবে প্রাণ হারাচ্ছে অন্যরা। তারপরেও এই কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারছে না অনেকে। অবৈধভাবে আরেক দেশে ঢুকতেই হবে। কেউ বা যায় কাজের সন্ধানে, কেউ অভিবাসী হতে। এর মধ্যে আলোচনায় এসেছে গত সপ্তাহে ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবির ঘটনায় শত শত মানুষের নিহত হওয়ার ঘটনা। ওই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় ওঠে।
 
ভবিষ্যতে এমনটি ঠেকাতে অনেক ইউরোপীয় নেতা সামরিক ব্যবস্থা নেয়ার পক্ষেও মত দিয়েছেন। কারণ, আটলান্টায় সামরিক অভিযানে ফল পাওয়া গিয়েছিল বলে অনেকের মত। ২০০৮ সালে জলদস্যুদের দমন এবং অবৈধ অভিবাসী বন্ধ করতে সোমালিয়ায়  বহুজাতিক সামরিক বাহিনী অভিযান চালায়। তিনি জানান, সামরিক বাহিনী সাধারণত নৌকাগুলো ধ্বংস করে। এগুলোর মূল্য খুবই কম এবং এগুলো প্রচুর পাওয়া যায়। কারণ এগুলো তৈরি করা সহজ। তিনি আরো বলেন, এই ধরনের অভিযানে অপ্রত্যাশিতভাবে কিছু জীবনের মৃত্যু ঘটে।
 
সমপ্রতি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবোট ইউরোপীয় নেতাদের তার দেশের নেতৃত্বকে অনুসরণ করতে বলেন। এখানে মৃত্যুকে বন্ধ করার জন্য দরকার নৌকা চালানো বন্ধ করা। যারা নৌকায় করে অস্ট্রেলিয়ায় আসে তাদের সবাইকে আটক করা হয়। শ্রীলঙ্কা থেকে আসা অবৈধ অভিবাসীদের নৌকায়ই রেখে দেয়া হয়। সামরিক বাহিনী নৌকাগুলো অভিবাসী নৌকাগুলোকে বাধা দেয়। তারা যেখান থেকে এসেছে সেখানেই ফেরত পাঠানো হয়। ইইউ পরিকল্পনা করেছে, অবৈধ অভিবাসীদের দ্রুত ফেরত পাঠানো হবে।
 
২০১৪ সালে ভূমধ্যসাগরে যারা অবৈধভাবে এসেছেন তাদের বেশিরভাগই যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে এসেছেন। ২০১৩ সালে সুইডেন ঘোষণা দেয়, তারা সিরিয়া থেকে আসা অভিবাসীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দেবেন। গত সপ্তাহে সহস্রাধিক অভিবাসী নৌকা ডুবে নিহত হন। অপেন বর্ডারসের জন লি বলেন, আপনি যদি বিমানের টিকেট দিয়েও দেশে পাঠিয়ে দেন তাহলেও ভূমধ্যসাগরের এই পরিস্থিতি বন্ধ হবে না। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইএমও) জানিয়েছে, চলতি বছরই ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবে মারা গেছে ১৭শ’। প্রতি দশজনের মধ্যে আটজনই মারা গেছে। সংস্থাটি জানায়, বর্তমানের মৃত্যুবরণ করার হার চলতে থাকলে চলতি বছর মৃত্যুর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ৩০ হাজারে। বেশিরভাগ অভিবাসী আসে আফ্রিকার দেশগুলো থেকে।
 
ভূমধ্যসাগরে প্রধান অভিবাসন রুট হচ্ছে, উত্তর আফ্রিকা থেকে ইতালি এবং মাল্টা। চলতি বছর যে পরিমাণ নিহত হয়েছেন তাদের মধ্যে ৯১০ জন নিহত হয়েছেন এই পথে এসে। গত সপ্তাহে আরো সহস্রাধিক এই তালিকায় যোগ হলো। অন্য পথে আসা অভিবাসীরা খুব কমই মারা গেছেন। গত বছর ৩ হাজার ২৭৯ অভিবাসী ইউরোপ আসতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে মারা যান। ইতালি আসতে গিয়ে এবছর ৯৫৪ জনের মধ্যে ৯১২ জন মারা গেছেন। আইওএম জানিয়েছে, এই সময়ের মধ্যে ২১ হাজার ১৯২জন অভিবাসী ইতালি উপকূলে আসতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে মৃত্যুর হার দাঁড়িয়েছে প্রতি ১০০ জনে ৪ দশমিক ১৩ জন। গত বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ইতালিতে জীবিত ফিরে এসেছিলেন ২৬ হাজার ৬৪৪ জন।
 
ইতালিতে বেশিরভাগ অবৈধ অভিবাসী আসে ইরিত্রিয়া, মালি এবং নাইজেরিয়া থেকে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও আছেন এই দলে। ২০১৪ সালে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালিতে আসার তালিকা সম্পর্কে জানলেই ধারণা পাওয়া যাবে কারা বেশি মারা যাচ্ছেন। ওই বছর সিরিয়া থেকে ইতালিতে এসেছেন মোট ৪২ হাজার ৩২৩ জন। এছাড়া ইরিত্রিয়া থেকে ৩৪ হাজার ৩২৯ জন, মালি থেকে ৯ হাজার ৯৩৮ জন, নাইজেরিয়া থেকে ৯ হাজার, গাম্বিয়া থেকে ৮ হাজার ৭০৭ জন, ফিলিস্তিন থেকে ৬ হাজার ৮২ জন এবং সোমালিয়া থেকে মোট এসেছেন ৫ হাজার ৭৫৬ জন।