বিশ্বজুড়েই মানব পাচার বাড়ছে

প্রতিবছর সাড়ে চার কোটি লোক শরণার্থী হচ্ছে, এর মধ্যে পৌনে তিন কোটিই সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য দেশে যাচ্ছে, এদের ৫৫ শতাংশই যুদ্ধের কারণে দেশ ত্যাগ করছে, অন্য কারণগুলো হলো- জাতিগত সংঘাত, দারিদ্র্য ও আইএস জঙ্গিদের দৌরাত্ম্য
 
বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিগ্রহ, জাতিগত সংঘাত এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার কারণে সাগর কিংবা দুর্গম স্থলপথে মানব পাচার যে কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। শুধু বাংলাদেশ কিংবা মিয়ানমার নয়, পৃথিবীব্যাপী এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলো থেকেও ইউরোপের নানা দেশে, বিশেষ করে ইতালির উদ্দেশে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা করছে অভিবাসন প্রত্যাশীরা। অস্ট্রেলিয়াও এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশ থেকে স্থলপথে দুর্গম এলাকা পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে অনেকে। এশিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া সব মহাদেশকেই গ্রাস করছে এই মানব পাচার সমস্যা। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের গহিন বনে অভিবাসন প্রত্যাশীদের কবরের সন্ধান পাওয়া যাওয়ায় বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে মানব পাচারের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে।
 
জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) পৃথিবীব্যাপী মানব পাচার এবং উদ্বাস্তুদের হিসাব রাখে। সংস্থার এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৯৪ সালের পর পৃথিবীতে শরণার্থীর সংখ্যা এখন যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি। মানব পাচারের ঘটনা এসব শিবির থেকে বেশি ঘটছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবছর নানা কারণে সাড়ে চার কোটি লোক শরণার্থীর খাতায় নাম লিখাচ্ছে। এর মধ্যে সাড়ে নয় লাখ লোক বৈধ উপায়ে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিচ্ছে এবং দুই কোটি ৮৮ লাখ লোক নিজ দেশের সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য দেশে যাচ্ছে। নিজ দেশে উদ্বাস্তু হচ্ছে প্রতিবছর দেড় কোটি লোক। বিশেষ করে সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সুদান, কংগো, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া, ইথিওপিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে উদ্বাস্তু হচ্ছে বেশি। উদ্বাস্তুদের ৫৫ শতাংশই যুদ্ধবিগ্রহের কারণে দেশ ত্যাগ করছে বলে ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসের দৌরাত্ম্যের কারণেও অনেকে নিজ দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন।
 
ইউএনএইচসিআরের মতে, যুদ্ধবিগ্রহের কারণে আফ্রিকার অনেক দেশ থেকে নৌকাযোগে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপের দেশগুলোতে পালিয়ে যাওয়ার হার অনেক বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব অভিবাসন প্রত্যাশীদের বহনকারী নৌকাগুলো ডুবে গিয়ে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। এসব কাফেলায় শুধু আফ্রিকান দেশগুলোর নাগরিকরাই নয়, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার দেশগুলোর নাগরিকরাও শামিল হচ্ছে। নিজ দেশে নানা কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার কারণে অনেকে উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় পুরো পরিবার নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেয়। অভিবাসন প্রত্যাশীদের বহনকারী নৌকাগুলো অনেক সময় সংশ্লিষ্ট দেশের কোস্টগার্ড বা নৌবাহিনীর নজরে এলে সেগুলোকে আটক করা হয়। পরে তাদেরকে বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে রাখা হয়। সেসব আশ্রয় শিবিরেও অনেকে মানবেতর জীবন যাপন করছে। অভিবাসন প্রত্যাশীদের চাপ ঠেকানোর কৌশল নির্ধারণ করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো সম্প্রতি জেনেভায় বৈঠক করেছে। সে বৈঠকে আফ্রিকান দেশগুলোর সরকারের সাথে এ নিয়ে আলোচনা করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
 
বাংলাদেশের চিত্র: বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের টেকনাফ হয়ে মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডে যাওয়ার প্রবণতা গত কয়েক বছরে বেড়েছে। বিশেষ করে মিয়ানমারে জাতিগত সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার পর এ সমস্যা আরো প্রকট হয়েছে। ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৫৩ হাজার লোক মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড বা অন্য দেশে গেছে। পাচারের জন্য জড়ো করা অনেককে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করতে সমর্থ হয়। এছাড়া মাঝ সমুদ্রে নৌকা ডুবে মারা গেছে অনেকে। ধরা পড়েছে পাচারের সাথে যুক্ত অনেকে। ভালো চাকরির আশায় অনেকে সমুদ্র পাড়ি দিতে চাইলেও অনেকের ভাগ্যে তেমন কিছুই জোটে না। ইদানীংকালে মাঝ সমুদ্রে নিয়ে পাচার হওয়া মানুষদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও বেড়েছে। সাধারণত দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ আদায় করা হয়। এছাড়া থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ার গহিন জঙ্গলে নিয়ে আটকে রেখেও অনেকের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। মুক্তিপণ না দিতে পারলে মেরে লাশ পুঁতে রাখা হয়।
 

সূত্র মতে, মিয়ানমারে জাতিগত দাঙ্গার পর অনেক রোহিঙ্গা প্রায়ই টেকনাফ এবং কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছে। সেখানে অনেকের কিছু করার থাকে না বলে কেউ কেউ অবৈধভাবে সাগর পাড়ি দিয়ে অন্য দেশে যেতে চায়। একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে বাংলাদেশ দিয়ে সমুদ্রপথে যারা মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ড গিয়েছেন তাদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা।