নিজ দেশে ‘শরণার্থী’!

 
ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ আনবারের রাজধানী রামাদি শহরের নিয়ন্ত্রণ জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হাতে চলে গেছে গত সপ্তাহেই। আইএস রামাদির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর থেকে অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ শহর ছেড়ে অন্যত্র পালানোর চেষ্টা করছে। কয়েক দিনের টানা লড়াইয়ে পাঁচ শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। গত সপ্তাহে রামাদি আইএসের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর থেকে তা পুনরুদ্ধারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে ইরাকি প্রশাসন। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত ভূমিকা পালন করছে ইরান সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদের গ্রুপ ‘পপুলার মোবিলাইজেশন’। রামাদি থেকে বাগদাদে আশ্রয় প্রার্থীদের সন্দেহের চোখে দেখছে তারা। শিয়া মিলিশিয়ারা ইতিমধ্যে এ ধরনের আশ্রয়প্রার্থী কয়েক হাজার বেসামরিক মানুষকে আইএস সন্দেহে আটক করেছে। এদের জন্মমাটি নিজ প্রদেশের মাটিতেও ঠাঁই হচ্ছে না, আবার অন্য প্রদেশে পালাতে গিয়েও সফল হচ্ছে না। ফলে অগণিত বেসামরিক নারী-পুরুষ ও শিশু বাগদাদের আশপাশে খোলা স্থানে শরণার্থীর মতো ঠাঁই নিয়েছে! তবে তারা এখানেও নিরাপদ বোধ করছে না। আশঙ্কা করছে আইএস কিংবা শিয়া মিলিশিয়ারা কিংবা সরকারি বাহিনী যেকোন সময় তাদের আবার আটক করতে পারে!
 
শিয়া মিলিশিয়ারা মনে করছে, রামাদি থেকে আইএস সদস্যরা পালাতে সাধারণ মানুষের মাঝে মিশে যাওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে। একারণে যেসব সাধারণ মানুষকে আটক করা হয়েছে তাদের প্রত্যেকের হাতে শেকল পরিয়ে মরুভূমির মধ্য দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বন্দীশালায়। শিয়া মিলিশিয়াদের এ ধরনের সন্দেহের অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগই নিরীহ মানুষ এটা শিকার করছেন মিলিশিয়ারা। এসব নিরীহ মানুষরাই ইতিমধ্যে আইএসের হামলার শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করেছে। কেউ হয়তো কাছের মানুষদের হারিয়ে এখন পাগলপ্রায়। এরপরও যারা এ ধরনের সন্দেহের শিকার হয়ে শিয়া মিলিশিয়াদের হাতে গ্রেফতার হচ্ছেন তারা সত্যিই হতভাগ্য। 
 
গত বছরের শেষের দিকে ইরাকি বাহিনীর অভিযান শুরুর পর থেকে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলো আইএস। তবে বেশ কিছুদিন ধরেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে তারা। সর্বশেষ রামাদি শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার মধ্য দিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দিলো জঙ্গিগোষ্ঠীটি। রামাদিতে অবস্থিত প্রাদেশিক কার্যালয়গুলোতে কালো পতাকা উড়িয়ে সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে রামাদির নিয়ন্ত্রণ আইএসের হাতে চলে যাওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছে ইরাকি প্রশাসন ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী। মার্কিন নেতৃত্বাধীন আইএস বিরোধী আন্তর্জাতিক জোটের বিমান হামলাও জঙ্গিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে পারেনি। ইরানের শীর্ষ সেনা কমান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সোলেইমানি যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, আইএসের হাতে রামাদির পতন ঠেকাতে কোন ব্যবস্থা নেয়নি ওয়াশিংটন। রামাদির খুব কাছেই মার্কিন সেনাদের আইন আল-আসাদ বিমান ঘাঁটি থাকার পরও সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করতে কোন পদক্ষেপ নেয়নি তারা। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করলেও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের নির্দোষ দাবি করে দায় চাপাচ্ছে ইরাকি সেনাবাহিনীর ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ আইএসের সাথে লড়াইয়ের কোন ইচ্ছাশক্তি নেই ইরাকি সেনাদের। 
 
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইরাকি প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল আবাদি সুন্নী প্রধান রামাদিতে শিয়া মিলিশিয়া মোতায়েন করেননি। তিনি স্থানীয়ভাবে মোতায়েন করা নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে আইএস’কে মোকাবেলা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আইএসের সামনে এক প্রকার দাঁড়াতেই পারেনি স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী। একের পর এক আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানোর মধ্যে দিয়ে আইএস জঙ্গিরা সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে ঢুকে পড়ে।
 
আইএস ইস্যুতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ছে মার্কিন সামরিক জোট বাহিনী ও ইরাকি সেনাবাহিনী। এর ফলে একদিকে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে আইএস বিরোধীরা। অন্যদিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় আরো বেশি মনোবল ফিরে পাচ্ছে আইএস। রাজধানী বাগদাদ থেকে সড়কপথে সিরিয়া, সৌদি আরব ও জর্ডানে যেতে প্রবেশপথ হিসাবে কাজ করে রামাদি। ফলে এ ঘটনাটি শুধু ইরাক কিংবা মার্কিন জোটই নয় বরং সৌদি আরব ও জর্ডানের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
 
বাগদাদ থেকে মাত্র ৯০ কিলোমিটার দূরের রামাদি ছেড়ে পালানো মানুষগুলোর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটু নিরাপদ আশ্রয়। জীবন বাঁচাতে নারী, শিশু-বৃদ্ধ সবাই পায়ে হেঁটে রওনা দিয়েছে রাজধানী বাগদাদের দিকে। তবে কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য মতে, এসব মানুষকে বাগদাদে ঢুকতে বাধা দেয়া হচ্ছে। নিরাপত্তার নামে তল্লাশি করে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে, আইএস সন্দেহে কাউকে আটক করা হচ্ছে। তবে সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো ঘরবাড়িহীন এই মানুষগুলোকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে বিপদসংকুল রামাদিতেই। নদীর কূলে আশ্রয়প্রার্থীদের সাগরে ঠেলে দেয়ার মতোই অনেকটা। নিজ দেশেই যেন পরবাসী এরা। ইরাক সরকারের সামরিক এবং রাজনৈতিক দেউলিয়ার কারণে গত এক বছরে ২৮ লাখের বেশি মানুষ গৃহহীন হয়েছে। এর মধ্যে ৯ লাখই আনবার প্রদেশের মানুষ। জনগণের নিরাপত্তা দেয়াটা যেখানে সরকারেরই দায়িত্ব সেখানে বিপদগ্রস্ত এ মানুষগুলোর সাথে এমন নিষ্ঠুর আচরণ সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।