মা ন ব পা চা র

হোতাদের চিহ্নিত করতে তিন দেশে যৌথ অভিযান

সমুদ্রপথে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিদের মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রের সদস্য ও মূল হোতাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের প্রশাসন মানবপাচার চক্রকে ধরতে অভিযান শুরু করেছে। চক্রের সদস্যরা আত্মগোপনে রয়েছে। থাইল্যান্ডে এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন ৮৫ জন মানবপাচারকারীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। সর্বশেষ গত রবিবার ৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতার পরোয়ানা জারি করা হয়। সন্দেহভাজন প্রায় ৫১ জনকে গ্রেফতার করেছে থাই পুলিশ। চলতি মে মাসে শুধু কক্সবাজারে ৫০ জনের মতো মানবপাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বেশ কয়েকজন মানবপাচার চক্রের সদস্য ক্রসফায়ারে মারা গেছে। সর্বশেষ সোমবার রাজধানীর ফকিরাপুল থেকে মানবপাচারকারী ৩ সদস্যকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ আটক করেছে। মালয়েশিয়াও মানবপাচারের মাফিয়াদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। মানবপাচারে সম্পৃক্ততা থাকার অভিযোগে ১২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়। তবে মানবপাচারের শিকার হওয়া রোহিঙ্গাদের ঝুঁকিপূর্ণভাবে সমুদ্রপথে পাঠানোর সাথে সম্পৃক্তদের বিষয়ে মিয়ানমার সরকার এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বরং সম্প্রতি নৌকা থেকে উদ্ধার করা অবৈধ অভিবাসীদের বাংলাদেশি বলে দাবি করলেও তা প্রমাণ করতে পারেনি দেশটি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন ওই অবৈধ অভিবাসীদের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা পোষণ করলে মিয়ানমার সরকার দেখা করতে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

 
থাইল্যান্ডভিত্তিক অনলাইন সংবাদপত্র ‘দ্য নেশন’ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে সন্দেহভাজন প্রায় ৫১ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বাকি ৩০ সন্দেহভাজন পাচারকারীকে ধরতে সংখলা, সাতুন ও রানোং প্রদেশে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত রবিবার পুলিশ মানবপাচারকারীদের শিবির শনাক্তে ১২ রোহিঙ্গা অভিবাসীকে সংখলা প্রদেশের সাদাও জেলার গ্লাস মাউন্টেন এলাকায় নিয়ে যায়। পাহাড়ি জঙ্গলে শিবির স্থাপন করে ওই অভিবাসীদের আটকে রেখেছিল মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা। অভিবাসীরা বন্দি-শিবিরের পথ মনে রাখতে পেরেছিলেন। ওই বন্দি-শিবিরগুলোর বিস্তারিত তথ্য তারা পুলিশকে দেন। পুলিশকে ওই শিবিরগুলোতে অভিবাসীদের নিয়ে গেলে সন্দেহভাজন মানবপাচারকারীদের চিহ্নিতও করেন তারা। পুলিশ বিভিন্ন বন্দি-শিবিরের ছবি তুলে সেগুলো পাচারকারীদের দেখায়। তারা তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ স্বীকার করে এবং কোন্ শিবিরে তারা            কাজ করতো, ওই ছবিগুলোর মধ্য থেকে সেটি শনাক্তও করে। সম্প্রতি ২ শতাধিক অভিবাসীসহ একটি বোট উদ্ধার করে মিয়ানমার নৌবাহিনী। ওই বোটের মালিক এক থাই নাগরিককে মানবপাচারে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। ৫২ বছর বয়সী ওই ব্যক্তিকে দেশটির বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুনে আটক রাখা হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী মানবপাচার বিরোধী অভিযান নিয়ে মিয়ানমারের ভূমিকা বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ।
 

এদিকে অবৈধভাবে সাগরপথে বিদেশে যাওয়ার সময় গত প্রায় সাড়ে ৩ বছরে বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় দুই হাজার ৯৪৫ জনকে উদ্ধার করেছে প্রশাসন। একই সময়ে মানবপাচার আইনে মামলা হয়েছে ৩০৬টি এবং এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে এক হাজার ৫৩১ জনকে। এদের মধ্যে আটক হয়েছে ৪৭৭ জন। চলতি মে মাসে জেলায় ৫০ জনের মতো মানবপাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে অনেকেই তালিকাভুক্ত মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য। তবে কক্সবাজারের টেকনাফ দিয়ে মানবপাচারের ঘটনায় স্থানীয় অনেক জনপ্রতিনিধির সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাদের সহায়তায় মূলত বাংলাদেশি মানবপাচার চক্র গড়ে উঠেছে। কক্সবাজার জেলা পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব জেলায় ৩৫০ জন মানবপাচারকারীর তালিকা তৈরি করেছে। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ১৭৬ জনের একটি তালিকা রয়েছে। তালিকাভুক্তদের মধ্যে জেলার টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলাতেই মানবপাচারকারীর সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে শুধু টেকনাফেই মানবপাচারের গডফাদার রয়েছে ৩১ জন। গডফাদাররা বর্তমানে আত্মগোপনে গেলেও তাদের অনুসারীদের অনেকেই নিরাপদ দূরত্বে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।