পিটার আল্ডারম্যানের বয়স তখন ২৫ বছর। টগবগে যুবক পিটার ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারের ১০৭ তলায় একটি কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করার জন্য গিয়েছিলেন। আর ফিরে আসেননি। ২ হাজার ৯৯৬ জনের সঙ্গে পিটারও প্রাণ হারান ভয়াবহ, বর্বর এক জঙ্গি হামলায়। উগ্র জঙ্গিরা সেদিন চারটি বিমান ছিনতাই করে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্রে। নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার খ্যাত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ছাড়াও তারা হামলা চালায় মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগনে। আরেকটি বিমান ওয়াশিংটনে যাওয়ার পথে বিধ্বস্ত হয় পেনসিলভেনিয়ার শাঙ্কসভিলের বাইরে।
পিটারের বাবা-মা জানেন তাদের জন্য ওই হামলা কতটা কষ্টের ছিলো। এখনো ছেলের মৃত্যুকে মেনে নিতে পারেননি তারা। কারণ ওই হামলার কিছুক্ষণ আগেই বাবা স্টিভ আল্ডারম্যান ও মা লিজের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ওই কনফারেন্সে যান পিটার। ছেলেকে যে সেদিন শেষ বিদায় দিয়েছিলেন সেটা পরেই বুঝতে পারেন আল্ডারম্যান দম্পতি। এক সাক্ষাত্কারে সিএনএনকে তারা বলেন, স্বজনহারা পরিবার ছাড়া ওই জঙ্গি হামলার ভয়াবহতা এখনো অনেকের জন্য উপলব্ধি করা কঠিন। ৯/১১ বা নাইন ইলেভেনের হামলার ১৫ বছর পরও তাদের ক্ষত শুকায়নি। হামলার ১৫ বছর পূর্তির দুই দিন আগেই তাই এসেছিলেন ৯/১১ হামলায় নিহতদের জন্য নির্মিত স্মৃতি সৌধে। ইচ্ছা ছিলো সেখানে পাথরে খোদাই করে লেখা ছেলে পিটারের নামটি স্পর্শ করা।
পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশের নাগরিক ওই হামলায় প্রাণ হারায়। তাই এই হামলার দুঃখ আর স্মৃতি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের মনে নেই বরং ছড়িয়ে আছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের স্বজনহারাদের মনেও।
নাইন ইলেভেন এর হামলায় কেউ সন্তান হারিয়েছিলেন আবার কেউ হারিয়েছিলেন পিতা-মাতাও। প্রায় তিন হাজার শিশু সেদিন তাদের বাবা নয়তো মাকে হারিয়েছিলো। এমন শিশুরা বেড়ে উঠছে আত্মীয়, স্বজনের ছত্র ছায়ায়। এসব শিশুর অনেকেই এখন প্রাপ্ত বয়স্ক। এদের অনেকেরই বাবা-মায়ের কথা মনে নেই। তাদের একজন জ্যাকসন ফাইফে’র বয়স এখন ১৬ বছর। সে এখনো বাবাকে হারানো অভাব বোধ করে। তার বাবা কার্লেটন ফাইফে নাইন ইলেভেনের দিন জঙ্গিদের ছিনতাই করা একটি বিমানের যাত্রী ছিলেন। সেই বিমানটি দিয়েই প্রথম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলা করে জঙ্গিরা।
বাবার সঙ্গে খেলা করার কোনো কথাই ফাইফে’র স্মৃতিতে নেই। বাবার আদরও সে কখনো বুঝতে পারেনি। তার মতো কিশোর-কিশোরীরা এখনো বুঝতে পারে না সেদিন কেনো এ ধরনের হামলা হয়েছিলো। কি দোষ ছিলো তাদের। কেনো শৈশবে তারা পেল না বাবা-মায়ের আদর, ভালোবাসা। ওই হামলার পেছনে জড়িতদের এখনো বিচার না হওয়ায় তাদের অনেকেই ক্ষুদ্ধ।
শুক্রবার নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার ১৫ বছর পার হতে চললেও এখন পর্যন্ত কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। বিমান ছিনতাইকারীরা সেদিনের হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলো। আর অন্যতম সন্দেহভাজন আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদনকে ২০১১ সালের মে মাসে পাকিস্তানে মার্কিন বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়। কিন্তু কারা এই জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা করেছিলো, অর্থ ও সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করেছিলো তাদের এখনো বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হয়নি।
তবে শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আপত্তি সত্ত্বেও ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার জন্য সৌদি সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সুযোগ রেখে মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে একটি বিল পাস হয়েছে। শুক্রবার বিলটি সর্বসম্মতিক্রমে কণ্ঠভোটে পাস হয়। চারটি বিমান ছিনতাই করে ৯/১১-এর হামলা চালানোর ঘটনায় জড়িত বলে সন্দেহভাজন ১৯ জনের মধ্যে ১৫ জনই ছিলেন সৌদি নাগরিক। তবে সৌদি আরব প্রথম থেকেই ৯/১১-এর ঘটনায় দেশটির সরকারের জড়িত থাকার সম্ভাবনা নাকচ করে আসছে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ৩৮১৫ নম্বর প্রস্তাবটি জাস্টিস এগেনেইস্ট স্পনসরস অব টেরোরিজম অ্যাক্ট বা ‘জাসটা’ নামেও পরিচিত। সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে মামলা করার যে দায়মুক্তি এর আগে দেওয়া হয়েছিল এ বিলে তা বাতিল করা হয়।
তবে এই বিলের ব্যাপারে বারাক ওবামা এখনো আগের অবস্থানেই অটল রয়েছেন। তিনি বিলটিতে ভেটো দিয়ে আটকে দেবেন। কারণ এটি পাস হলে অন্য দেশগুলোয়ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিরুদ্ধে একই ধরনের আইন প্রণীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর এটা হলে ৯/১১ হামলার প্রকৃত দায়ীদের বিচারের সুযোগ আরো সঙ্কুুচিত হয়ে পড়বে।
ইত্তেফাক/এএন