আশুলিয়ায় শ্রমিকদের কর্মবিরতির শিকার হয়েছে ৫০ এর অধিক কারখানা। গত ১১ তারিখ থেকে কর্মবিরতি শুরু হয়ার পর গতকাল ২৬ ডিসেম্বর সব বন্ধ কারখানায় কাজ শুরু হয়েছে। কার-খানাগুলোতে থেকে সর্বোচ্চ ১২দিন (দুই শুক্রবার বাদ দিয়ে) উত্পাদন বন্ধ ছিল। এ সময়ের জন্য বড় ক্ষতির শিকার হতে যাচ্ছেন মালিকরা। সময়মত অনেকে পণ্য জাহাজে উঠাতে পারেননি।
কারখানা মালিকরা জানিয়েছেন, উত্পাদন শুরু হওয়ার পর কী উপায়ে পণ্য পাঠানো যায়, তা নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। কোন কোন বায়ার বিমানযোগে পণ্য পাঠাতে বলছেন। আবার কেউ কেউ দেরি হওয়ার জন্য ডিসকাউন্ট (পণ্যে দাম কমিয়ে দেয়া) দেওয়ার জন্য বলছেন। কী ধরণের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তার হিসাব করছেন মালিকরা। এদিকে গতকাল খুলে দেয়া ৫৬টি কারখানায় শান্তিপূর্ণভাবে কাজ শুরু হয়েছে। এসব কারখানায় শ্রমিক সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। গতকাল শ্রমিক উপস্থিতি ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ।
মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, শ্রমিকদের কর্মবিরতি শুরু হওয়ার পর তারা নিয়মিত বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে গেছেন। কর্মবিরতির শিকার হয়েছে বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী, আতিকুল ইসলাম, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি একে আজাদের মালিকানাধীন কারখানাও। একে আজাদের মালিকানাধীন কারখানা ১০ দিন বন্ধ ছিল। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, ‘আমরা ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছি। কিছু পণ্য বিমানে পাঠাতে হবে, কিছু ক্ষেত্রে ডিসকাউন্ট দিতে হবে। আবার কিছু ক্ষেত্রে তারা চাইলে অর্ডার বাতিলও করে দিতে পারে। আমরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি, ক্ষতি যতটা কমিয়ে আনা যায়।’
বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলামের মালিকানাধীন চারটি গার্মেন্টসে প্রায় ৭ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। ওই কারখানাগুলোও বন্ধ ছিল ১০ দিনের বেশি। ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত বায়ারদের হালনাগাদ পরিস্থিতি জানিয়েছি। কিছু বায়ারকে বিমানযোগে পণ্য পাঠাতে হবে। আবার কাউকে ডিসকাউন্টও দিতে হবে। স্বাভাবিকভাবে জাহাজে পণ্য পাঠালে ওই খরচ ক্রেতা বহন করে থাকেন। কিন্তু দেরি হলে ওই পণ্য বিমানে পাঠাতে হয়। এ জন্য বাড়তি ১৩ গুণ অর্থ খরচ হয়। এ অর্থ পুরোটাই কারখানা মালিককে বহন করতে হয়।’ আতিকুল ইসলাম বলেন, এর বাইরে ভাবমূর্তির ক্ষতি অর্থের অঙ্কে হিসাব করা যাবে না। এ ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি। অবশ্য কারখানা খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের প্রশংসা করেন তিনি।
উত্পাদন বন্ধের কারনে কারখানা মালিকদের কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তার হিসাব শুরু করেছে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান জানিয়েছেন, উত্পাদন বন্ধের কারনে সব কারখানার আনুমানিক ক্ষতি প্রতিদিন গড়ে ৭০ কোটি টাকা। তবে প্রকৃত ক্ষতির হিসাব পেতে আরো অপেক্ষা করতে হবে। দুটি শুক্রবার বাদ দিলে মোট বন্ধ ১২দিন। সবগুলো কারখানা অবশ্য ১২ দিন বন্ধও ছিল না। সে হিসেবে উত্পাদন বন্ধের কারণে এ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮শ’ কোটি টাকা। অবশ্য কারখানা মালিকরা বলছেন, এ হিসাব এখনি করা সম্ভব নয়। প্রকৃত ক্ষতি নির্ণয় করা কঠিন।
কাজ চলেছে বন্ধ গার্মেন্টসে
অনির্দিষ্টকালের জন্য টানা ৫দিন বন্ধ থাকার পর ৫৫ টি তৈরি পোশাক কারখানা বিজিএমইএ’র নির্দেশে গতকাল খুলে দেওয়া হয়েছে। স্বস্তি ফিরে আসে উদ্বিগ্ন শ্রমিকদের মধ্যে। গতকাল সোমবার সকাল থেকে শ্রমিকরা দলবেঁধে কারখানায় প্রবেশ করেন। সকাল থেকেই আশুলিয়ার জামগড়া, বাইপাইল, নরসিংহপুরসহ সব কারখানায় শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার জন্য দলে দলে আসতে দেখা যায়। শুরু হয় উত্পাদন কাজ। কারখানা ফিরে পায় চেনা রূপ। কোন কারখানায় অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে শ্রমিকদের আন্দোলন উস্কে দেওয়ার অভিযোগে বেশিরভাগ কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই করেছে কারখানা কতৃপক্ষ। সকালে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকরা কারখানার সামনে আসলেও তারা কারখানায় প্রবেশ করতে না পেরে বাড়ি ফিরে যান। রবিবার ৯১ শ্রমিককে বরখাস্তের নোটিস কারখানার মূল ফটকে টাঙ্গিয়ে দেয় হা-মীম গ্রুপ। এর আগে উইন্ডি অ্যাপারেলস ও ফাউন্টেন গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেড ২৫৬ শ্রমিককে করখানা থেকে ছাঁটাই করে। কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ এবং আন্দোলনের সাথে জড়িত শ্রমিকরা পূনরায় কোনভাবেই যেন কারখানায় প্রবেশ এবং কাজে যোগ দিতে না পারেন সে ব্যাপারে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে কারখানা কর্তৃপক্ষ এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।
শিল্প পুলিশ-১ এর পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বর্তমান পরিস্থিতি শান্ত এবং স্বাভাবিক রয়েছে। শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কাজে যোগ দিয়েছেন। কোথাও কোনো শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটেনি।
গত ১১ ডিসেম্বর বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আশুলিয়ার উইন্ডি অ্যাপারেলে কর্মবিরতি শুরু করেন শ্রমিকরা। ১৫ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে বেনামে ছড়িয়ে দেওয়া লিফলেটের উপর ভর করে এ কর্মবিরতি শুরু করেন শ্রমিকরা। ক্রমেই এটি ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য কারখানায়। ১৯ ডিসেম্বর নাগাদ এ সংখ্যা বেড়ে ৫০ ছাড়িয়ে যায়।
এর পরদিন শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় শ্রমিকদের আন্দোলনে উস্কে দেওয়া ও শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি করার অভিযোগে দায়েরকৃত ৭টি মামলায় ইতিমধ্যে ১০ শ্রমিক, ৮ শ্রমিক নেতা, স্থানীয় সাংবাদিক ও সাভার উপজেলা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিনি আক্তারসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবির প্রেক্ষিতে কারখানা খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে রবিবার বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে জানানো হয়।
ইত্তেফাক/এএন