রাউজার, সুজন, নজরুল ও গোলাম হাসান ওরা চার বন্ধু । ওরা সকলেই উদ্যোক্তা। চার বন্ধুর যৌথ উদ্যোগে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা ও ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী বেতবাড়ি নামক স্থানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে বাণিজ্যিক ভাবে গড়ে তুলেছেন ‘এরো চিকস এন্ড হ্যাচারি’ হাঁসের হ্যাচারি। তাদের স্বপ্ন হাঁসের খামার করে দেশের স্বল্প আয়ের প্রান্তিক মানুষগুলোকে স্বাবলম্বী এবং অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ করা।
এই হ্যাচীর মূল পরিকল্পনাকারী গাজীপুর ফিডের পরিচালক মোহাম্মদ রাউজার সাহাদাৎ আলী । তার সহযোগী হিসেবে হ্যাচারীর সার্বিক দায়িত্ব পালন করছেন ভেটেনারী ডা. নজরুল ইসলাম ও গোলাম হাসান তালুকদার হাবিবুল্লাহ বাহার সুজন । হাবিবুল্লাহ বাহার জানান, মুরগীর ফিডের ডিলারশীপ ব্যবসার মাধ্যমে গাজীপুর ফিডস্ এর পরিচালক রাউজার সাহেবের সাথে আমার পরিচয় হয়। তিনি সব সময় ভাবতেন কিভাবে অল্প টাকা বিনিয়োগ করে স্বল্প আয়ের মানুষদেরকে অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ করা যায়। সেই ভাবনা থেকে তিনি বিভিন্ন দেশ ঘুরে এসে হাঁসের উপর গবেষণা চালান। পরে তিনি হাঁস পালনের মাধ্যমেই তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব মনস্থ করেন। তাই প্রথমে তারা উন্নত জাতের ১ হাজার পিকিং ব্রয়লার হাঁস,জিনডিং ও খাকি ক্যাম্বেল জাতের ৪ হাজার প্যারেন্টস্ (হাঁসা-হাঁসি) দেশে নিয়ে আসেন। প্যারেন্টস্ হাঁস থেকে প্রাপ্ত ডিম থেকেই বর্তমানে হ্যাচারিতে বাচ্চা উৎপাদন করা হচ্ছে। সপ্তাহে একদিন রবিবার ঠিক করা হয়েছে বাচ্চা উৎপাদনের দিন। আর একদিনে বাচ্চা উৎপাদন আসে প্রায় ১৬ হাজার। লেয়ার মুরগীর ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন¤œ যেখানে ১ হাজার মুরগীর ভ্যাকসিন করতে হয় আর হাঁসের ক্ষেত্রে সেখানে মাত্র ১শত হাঁসের ভ্যাকসিন পাওয়া যায়। ১ হাজার মুরগীর খামার করতে প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকার প্রয়োজন যা একজন গ্রামের সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজ লভ্য নয়। অপর দিকে ১শত হাঁসের খামার করতে টাকা লাগে মাত্র ৭০ থেকে ৮০ হাজার। যা কিনা স্বল্প আয়ের প্রান্তিক মানুষ অনায়াসে পালন করে সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম।
হাঁসের রোগ-বালাই মুরগীর তুলনায় খুবই কম । রোগ বালাই নেই বললেই চলে। তাই হাঁসের খামার করতে মানুষের ভয়ের তেমন কারণও নেই। আর অল্প পরিসরে এ খামার করা যায়। হাঁসের সাথে সমন্বিত মাছ চাষ করতে পারলে একজন খামারই বেশী লাভবান হবেন বলে জানান ডা. নজরুল ইসলাম।
শুরুতে প্রতি ব্রয়লার হাঁসের বাচ্চার দাম ধরা হচ্ছে ৪৫ টাকা এবং লেয়ার বাচ্চার দাম ৩৫ টাকা। ব্রয়লারের ক্ষেত্রে সঠিক পরিচর্যায় ৪০ দিনে প্রতিটি হাঁসের ওজন ৪ থেকে ৫ কেজি হয়ে থাকে। যার বাজার মূল্য প্রতিটি প্রায় ৫শত থেকে ৬শত টাকা। লেয়ারের ক্ষেত্রে মুরগীর মতই ৬ মাস পালনে ডিম আসতে শুরু করে এবং একটানা দুই থেকে আড়াই বছর পর্যন্ত ডিম দিয়ে থাকে। ডিমের উৎপাদনও আসে বেশ ভাল। তুলনামূলক ভাবে মুরগীর চেয়ে হাঁসের ডিমের বাজার মূল্য বেশী। ইউরোপের দেশগুলোতে ব্রয়লার হাঁসের মাংস ও লেয়ারের ডিমের বেশ চাহিদা আছে বলে জানান হাবিবুল্লাহ বাহার সুজন। লেয়ারের ক্ষেত্রে একটি প্রাপ্ত বয়স্ক হাঁস দিনে ১৪০ গ্রাম খাবার খেয়ে থাকে যা মুরগীর তুলনায় ২০গ্রাম বেশী। হ্যাচারীর পাশাপাশি তাদের রয়েছে নিজস্ব ফিড মিল। ডিলারের মাধ্যমে খামারীরা যেন ফিড ক্রয় করতে পারে তার জন্যই এ ব্যবস্থা। স্বপ্ন তাদের অনেক বড়। শুধু ঘাটাইল এবং ফুলবাড়িয়া নয়, হাঁসের খামার করে একদিন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে এবং প্রান্তিক মানুষগুলো অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এগিয়ে যাবে এটাই তাদের মূল স্বপ্ন।
ইত্তেফাক/রেজা