সর্বনাশা পদ্মা আমাকে ক্ষমা করল না, বাঁইচা থাকার মতো করে মাথা গোঁজার শেষ সম্বল ঘর, ভিটে-মাটি সবকিছু কাইড়া নিলো। এখন পোলা দুইডা আর পরিবার নিয়া কোথায় আশ্রয় নিব। পদ্মা নদী বার বার আমার সবই কাইড়া নিলো। বেঁচে থেকেও মরে গেছি আমরা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের দৌলতদিয়া দুই নম্বর ফেরিঘাট এলাকার ছিদ্দিক কাজীপাড়া গ্রামের নদী ভাঙনে সর্বস্বহারা শারীরিক প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক বাবু ভূঁইয়া ও তার স্ত্রী মাজেদা বেগম। ভিক্ষুক বাবু ভূঁইয়া’র সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুমিল্লা জেলায় তার বাড়িঘর সবই ছিল। সেখানকার একটি কাঠ চেরাই করার স’ মিলে কঠোর পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ভাগ্যের পরিহাসে একদিন গাছের গুঁড়ির আঘাতে দুটি পা হারান। সহায়-সম্বল বিক্রি করে চিকিত্সা করালেও পা দুটি ভালো করা সম্ভব হয়নি। তাই জীবন-যুদ্ধের খাতায় পঙ্গুত্বের নাম লিখিয়ে বেঁচে আছে সে। নিজ এলাকায় মানুষের কাছে ভিক্ষা চাইতে লজ্জায় সে দীর্ঘ পাঁচ বছর আগে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটের পাশে সরকারি খাস জমিতে বসতি স্থাপন করে। প্রায় তিন বছর পূর্বে পদ্মা নদীর করাল গ্রাসে সেখান থেকে বিতাড়িত হয়ে ২নং ফেরি ঘাটের অ্যাপ্রোচ সড়কের পাশে ঘর তোলেন।
গত মাস খানেক আগে এক গভীর রাতে রাক্ষুসী পদ্মা তার মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে গ্রাস করে ফেলে। সে থেকে বাবু তার ঘরের চালার টিনগুলো রাস্তার পাশে স্তূপ করে রেখেছে। কোথাও ঘর তোলার জায়াগা নেই। কর্মজীবী কল্যাণ সংস্থা(কেকেএস) স্কুলের বারান্দায় রাত কাটাই। চোখের পানি মুছতে মুছতে বাবু আরো জানায়, আমার ছেলে দুটি লেখাপড়া করতে পারে না। মানুষের কাছে হাত পেতে সংসার চালাতে হয়। টাকার অভাবে নিজের পায়ের চিকিত্সা করাতে পারলাম না । এখন মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু নদীর পেটে গেল। এখন আমি কি করব, কোথায় যাব, ভেবে পাই না। প্রতিবছরেই পদ্মা নদীর ভাঙনে গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের বাবুর মতো প্রায় শতাধিক পরিবারকে জায়গা-জমি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে দেখা যায়।
দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ নুরুল ইসলাম মন্ডল বলেন, শুধু বাবু নয়, গত কয়েক বছরে আমার ইউনিয়নের কয়েক হাজার পরিবারই চাষের জমিসহ ভিটে-মাটি হারিয়েছে। এবারও নতুন করে আমার ইউনিয়নের দেড় শতাধিক পরিবার ভাঙনের শিকার হয়েছে। আরও অনেক পরিবার ভাঙন হুমকিতে রয়েছে। তাদের তালিকা করে সাধ্যমত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে গৃহহীনদের জন্য ৯২টি ঘর পেয়েছি। যা আমার এলাকার নদীভাঙা মানুষের জন্য যথেষ্ট নয়। আরও ঘর প্রয়োজন।
দেবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতর আলী সরদার জানান, নদী ভাঙনে আমার ইউনিয়নে গত কয়েক বছরে কয়েক হাজার পরিবার ভিটে-মাটি হারিয়েছে। তাদের অনেকেই এখনো বাড়ি-ঘর করতে পারেনি।
ইত্তেফাক/নূহু