নো ম্যানস ল্যান্ডই এখন রোহিঙ্গাদের আশ্রয়স্থল!

মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বিজিপি রাখাইন প্রদেশের মংডুতে অভিযান আরো জোরদার করেছে। তারা বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গাদেরও গুলি করছে। গতকাল সোমবার দিনভর রাখাইনের উত্তরাঞ্চলের গ্রামগুলো থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলি উড়তে দেখা গেছে। অন্তত ১৩ বার সামরিক হেলিকপ্টার টহল দিতে দেখা গেছে মংডুর আকাশে। নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা ও প্রাণ বাঁচাতে দলে দলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। বিজিবিও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সীমান্তে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা ও যেসব অনুপ্রবেশকারীকে বিজিবি ফেরত পাঠাচ্ছে তারা সবাই নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করছে।

গত অক্টোবরে রাখাইন প্রদেশের সহিংসতায় সময় মিয়ানমার সৈন্যদের বাংলাদেশ সীমান্তে আসতে দেখা যায়নি। তবে এবার তারা বাংলাদেশের কাঁটাতারের পাশে এসে রোহিঙ্গাদের ভীতি প্রদর্শন করছে। কাছাকাছি কাউকে পেলে ফাঁকা গুলি করছে। গতকাল দিনভর কয়েকটি এলাকায় গুলির শব্দ শোনা গেছে। এতে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রামবাসীরাও আতঙ্কের মধ্যে আছেন।

রোহিঙ্গাদের ভাষ্য, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ঘুমধুম, জলপাইতলী, তমব্রুসহ বিভিন্ন এলাকার নো ম্যানস ল্যান্ড, জিরো পয়েন্টগুলোতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশায় অপেক্ষা করছে। অনেক সীমান্ত লাগোয়া বন জঙ্গল, খাল, পাহাড়ের ঝিরিপথেও অপেক্ষা করছে। তারা অনাহারে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অনেকে সৈন্যদের গুলি খেয়ে কাতরাচ্ছে। যদিও কী পরিমাণ রোহিঙ্গা সেখানে অপেক্ষা করছে সে বিষয়ে সুনিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি কেউ। তবে এই সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি হবে বলে দাবি করেন তারা।

সীমান্ত লাগোয়া কয়েকটি এলাকার নো ম্যানস ল্যান্ড পরিদর্শন করে রোহিঙ্গাদের এই বক্তব্যের সত্যতাও মিলেছে। জলপাইতলী এলাকার একটি নো ম্যানস ল্যান্ডে কয়েকশ’ রোহিঙ্গাকে জড়ো হয়ে থাকতে দেখা গেছে। তারা সেখানে অস্থায়ী ঘরও বানিয়েছে। তমব্রু খালের একটি অংশে দেখা গেছে, এপারে বিজিবি টহল দিচ্ছে। ২০ ফিটের খালের অপরপাড়েই জড়ো হয়ে আছে শতাধিক রোহিঙ্গা।

এদিকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকার সীমান্তে অতিরিক্ত ১৫ হাজার বিজিবি মোতায়েনের পরও তারা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে। টেকনাফ সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশ কিছুটা কঠিন      হলেও উখিয়ার বিভিন্ন এলাকা দিয়ে বিজিবিকে ফাঁকি দিয়ে রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, গত রবিবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি রোহিঙ্গা উখিয়ার অস্থায়ী বস্তিগুলোতে অনুপ্রবেশ করেছে। তবে এই সংখ্যা কমবেশি হতে পারে। যদিও অনুপ্রবেশের সময় বিজিবির সামনে পড়লে তারা তাদের এক জায়গায় জড়ো করে ফেরত পাঠাচ্ছে। তবে কক্সবাজার টেকনাফ সড়কের অনেক স্থানে পুলিশ বিভিন্ন যানবাহনে তল্লাশি চালালেও কোনো রোহিঙ্গাকে আটক করতে দেখা যায়নি।

গতকাল দুপুরে উখিয়ার ঘুমধুম ইউনিয়নের তমব্রু সীমান্তে দেখা গেছে, অন্তত তিন শতাধিক রোহিঙ্গাকে সেখানে ফেরত পাঠানোর জন্য জড়ো করা হয়েছে। বিজিবি সদস্যরা তাদের ঘিরে রেখেছে। স্থানীরা তাদের বিভিন্ন শুকনো খাবার, পানি, বিরিয়ানি দিয়ে ক্ষুধা নিবারণে সাহায্য করছে।

নুরুল ইসলামের বাড়ি সীমান্ত লাগোয়া ঢেকিবুনিয়া গ্রামে। ৬০ বছরের এই বৃদ্ধ ইত্তেফাককে জানান, আগের বার (গত অক্টোবর) তাদের গ্রামে সৈন্যরা আসেনি। সীমান্তের কোনো গ্রামে তারা নির্যাতন চালায়নি। তবে এবার তারা দলে দলে সীমান্তের গ্রামগুলোতে আসছে। তাদের সাথে বিজিপি ও স্থানীয় বার্মিজরাও যোগ দিচ্ছে। তারা রোহিঙ্গাদের বাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে। পুরুষদের গুলি করে মারছে, নারীদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। তার কিছুটা দক্ষিণে বড় গজির বিল, ছোট গজির বিল, হাতিপাড়ার দিকে নির্যাতনের মাত্রা আরো ভয়াবহ।

জড়ো করে রাখা রোহিঙ্গাদের একজন আনোয়ার হোসেন। বাড়ি মিয়ারপাড়ায়। তিনি সাংবাদিকদের সামনে থেকেই মিয়ানমারে তার এক স্বজনকে ইত্তেফাক প্রতিনিধির সামনেই ফোন করেন। এসময় ফোনের অপর প্রান্তে তার চাচাতো ভাই সলিমুল্লাহ জানান, রবিবার রাতেও সেখানে সৈন্যরা এসেছিল। তাদের পাশের কয়েকটি বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। পাঁচজন পুরুষকে গুলি করে হত্যা করে বাড়ির উঠোনে রেখে গেছে। তারা দূর থেকে দেখেও প্রাণভয়ে সামনে যাননি। আবার গ্রামে গ্রামে টহলের কারণে তিনি বাংলাদেশে আসার চেষ্টাও করতে পারছেন না।

বিজিবি ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মনজুরুল হাসান খান জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই সতর্ক আছেন তারা। গত কয়েকদিনে কয়েকশ রোহিঙ্গাকে সীমান্ত থেকে ফেরত পাঠিয়েছেন তারা। সীমান্ত লাগোয়া ঘুমধুম ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন জানিয়েছেন, তারা বিজিবির জড়ো করা রোহিঙ্গাদের টুকটাক খাবার পানি ও শুকনো খাবার দিয়ে সাহায্য করছেন । তবে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তারা সাহায্য করছেন।

চট্টগ্রাম মেডিক্যালে গুলিবিদ্ধ ৭ ও অগ্নিদগ্ধ ২ রোহিঙ্গা

মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে গুলিবিদ্ধ ৭ জন ও পুড়ে যাওয়া ২ জন রোহিঙ্গাকে চিকিত্সার জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গত রবিবার গভীর রাতে আনা রোহিঙ্গাদের মধ্যে আগুনে পোড়া দু’জন হলেন: নুরুল হাকিম ও পারভেজ। তার দুই ঘণ্টা পর হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ সাত জনকে ভর্তি করা হয়। তারা হলেন: মামুনুর রশিদ, সাকের, সাদেক, জাহেদ , নুরুল আলম, আবুল কাসেম ও নুরুল আমিন।

নাফ নদীতে মাছ শিকার বন্ধ

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদীতে সাময়িক সময়ের জন্য মাছ শিকার বন্ধ করা হয়েছে। এ কারণে নাফ নদীর টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে এবার তেমন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে না। ২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম আরিফুল ইসলাম জানান, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সাময়িক সময়ের জন্য নাফ নদীতে দিনে এবং রাতে মাছ শিকার বন্ধ করা হয়েছে।

ইত্তেফাক/নূহু