উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের নিচু এলাকায় পানি ঢুকছে

তিস্তার পানি বিপদসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। করোতোয়ায় পানি বাড়তে থাকায় পঞ্চগড়ের অনেকস্থানে ঘরবাড়িতে পানি ঢুকেছে। কুড়িগ্রামে ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তাসহ সবকটি নদ-নদীর পানি দ্রুত গতিতে বাড়ছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। সুনামগঞ্জে সুরমা, চেলা ও পিয়াইন নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধির কারণে জামালপুরের নিচু এলাকায় পানি ঢুকছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি আগামী ২৪ ঘন্টা অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে সিলেট, সুনমাগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার নিম্নাঞ্চলেরর কতিপয় স্থানে বিদ্যমান বন্যার পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তরাঞ্চল ও তত্সংলগ্ন ভারতীয় অংশে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় তিস্তা, দুধকুমার, ঘাঘট নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে গতকাল বলা হয়েছে, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায়, খুলনা, বরিশাল ও ঢাকা বিভাগের কিছু কিছু                 জায়গায় এবং রাজশাহী বিভাগের দু’এক জায়গায় অস্থায়ী দম্কা হাওয়া ও বিজলী চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেইসাথে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারী ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে।

ডিমলা (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, ভারী বৃষ্টিতে ও ঢলের কারণে তিস্তার পানি বিপদসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের প্রায় দুই হাজার বসতবাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ।

পূর্বছাতনাই ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খান, টেপাখড়িবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম সাহিন, খালিশা চাপানি ইউপি চেয়ারম্যান আতাউড় রহমান সরকার জানান, তিস্তা নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এলাকার বসত বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। আবাদি জমি তলিয়ে গেছে। তিস্তার চরবেষ্টিত নিম্নাঞ্চলে ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই ইউয়িনের পূর্ব ছাতনাই, ঝাড়শিংহেশ্বর গ্রাম, খালিশা চাপানীর বাইশ পুকুর ও ছোটখাতা গ্রাম, ঝুনাগাছ চাপানীর ছাতুনামা, ভেন্ডাবাড়ী গ্রাম, খগাখড়িবাড়ির কিসামত ছাতনাই, দোহলপাড়া গ্রাম, টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চড়খড়িবাড়ী, পূর্বখড়িবাড়ী ও উত্তরখড়িবাড়ী গ্রামে বানের পানি ঢুকেছে।

পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, পঞ্চগড় শহরের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত করতোয়া নদীর পানি বেড়েছে। এরফলে পৌরসভা এলাকার খালপাড়া, নিমনগর, তুলারডাঙ্গা, রামেরডাঙ্গা, পূর্ব জ্তালাসীসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামের ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তাসহ সবকটি নদ-নদীর পানি দ্রুত গতিতে বাড়ছে। এতে কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলার ধরলা ও দুধকুমার নদের অববাহিকার অন্তত ৩০টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে কুড়িগ্রাম সেতু পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার মাত্র ১ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বুধবার সন্ধা ৬টা থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১৮ ঘন্টায় ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে ৪৯ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশরী মোঃ শফিকুল ইসলাম জানান, বুধবার সন্ধা ৬টা থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১৮ ঘন্টায় কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি ২৯ সেন্টিমিটার, চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রে পানি ৩৩ সেন্টিমিটার ও নুনখাওয়া পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রে পানি ৪০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

রংপুর অফিস জানায়, তিস্তার নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় রংপুরের গঙ্গাচড়া, কউিনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানির তোড়ে লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী ও হাতিবান্ধা উপজেলায় প্রায় অর্ধশতাধিক বাড়ি-ঘরসহ বিস্তীর্ণ ফসলের জমি তলিয়ে গেছে।

সিলেট অফিস জানায়, সিলেট অঞ্চলে গতকাল দিনের বেলা তেমন ভারী বৃষ্টি না হলেও ভাটির দিকে পানি বেড়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অনেকস্থানে রাস্তাঘাট ডুবে গেছে, শিক্ষা প্রতিষ্টানে পানি উঠেছে। গতকাল বৃহষ্পতিবার সুনামগঞ্জের দোয়ারা বাজার ও সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় অনেক স্থানে উপজেলা সদরের সাথে জেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। অনেক স্থানে ফসলের ক্ষেত ডুবে গেছে।

সারী-গোয়াইন, সালুটিকর-গোয়াইনঘাট, হাদারপার-বঙ্গবীর-গোয়াইনঘাট, গোয়াইনঘাট-রাধানগর জাফলং সড়কের উপর দিয়ে হাঁটু ও কোমর পানি বইছে। উপজেলার সবকটি সড়ক পানিবন্দি থাকায় উপজেলা সদর ও জেলা শহর সিলেটের সাথে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসার এম আনিছুজ্জামান জানান, নিমজ্জিত হয়ে গেছে ১ হাজার হেক্টর আউশক্ষেত।

গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় সিলেট শহরের নিকট সুরমা বিপদসীমার ৪৪ সে.মি ও কানাইঘাটে ৭ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এছাড়া সুনামগঞ্জে সুরমা বিপদসীমার ৭৬ সে.মি, শেরপুরে কুশিয়ারা বিপদসীমার ২৪ সে.মি, সরিঘাটে লোভা নদী বিপদসীমার ২৬ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী প্রকৌশালীর অফিস সূত্র জানায়, সিলেটের পাশে চেরাপুঞ্জিতে অতিভারী বৃষ্টি হয়েছে।

ছাতক (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার নিম্মাঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সুরমা, চেলা ও পিয়াইন নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে গ্রামাঞ্চলের ঘর-বাড়ি ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, যমুনা তীরবর্তী ইসলামপুর উপজেলার সাপধরী, নোয়ারপাড়া, চিনাডুলী, বেলগাছা ও কুলকান্দি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ফসলি জমি ও রাস্তাঘাটে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। বন্যার পানির প্রচন্ড স্রোতে ইসলামপুর উপজেলার ডেবরাইপ্যাচ এলাকায় ব্রিজের অ্যাপ্রোচ রোড ধসে যাওয়ায় দক্ষিণ চিনাডুলী গ্রামের সাথে উপজেলা সদরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার যমুনার পানি আরিচা পয়েন্টে ২১ সে.মি ও বাঘাবকাড়ি পয়েন্টে ১২ সে.মি বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইত্তেফাক/নূহু