মরা গরুর পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন রমজান মিয়া ও তার স্ত্রী। তাদের সঙ্গে পড়শিরাও কাঁদছে। রমজান মিয়ার আশা ছিল গরুটি আগামী কোরবানি ঈদের সময় বিক্রি করে ধার দেনা পরিশোধ করে দোকানের জন্য মালামাল কিনবেন। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে দেয়নি ভারতের পাগলা কুকুরের দল।
গত বৃহস্পতিবার রমজান মিয়ার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। গরু মরার সঙ্গে তার স্বপ্নও মরে গেছে।
আখাউড়ার রাজাপুর গ্রামের রমজান মিয়ার মতো অনেক গরীব কৃষক রয়েছেন যাদের গরু ছাগলকেও কামড়াচ্ছে কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে এদেশে আসা ভারতীয় পাগলা কুকুর।
আখাউড়ার উত্তর ইউনিয়নের রাজাপুর সীমান্ত পথ দিয়ে এসে ভারতের পাগলা কুকুর এদেশের গরু ছাগলকে কামড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। কয়েক দিন ধরে আখাউড়া উপজেলার রাজাপুর, আজমপুর ও রামধননগরের গরু ছাগল পালনকারীরা এ ঘটনার শিকার হচ্ছেন। তারা আতংকে রয়েছেন।
প্রতিদিন সীমানা পেরিয়ে ১০/১২টি পাগলা কুকুর দল বেঁধে সীমান্ত বেড়া অতিক্রম করে ঢুকছে। কামড়াচ্ছে সীমান্ত এলাকার ভূমিতে চরতে থাকা গরু ছাগলকে। পাগলা কুকুরের কামুড়ে ওই এলাকার ইতিমধ্যে প্রায় ১৫/২০টি গরু, ছাগল মারা গেছে। প্রতিদিনই মরছে গরু, ছাগল। ভেকসিন দেওয়া হচ্ছে আরও ১০/১২ টি গরুকে।
ওইসব গ্রামের অনেক গরীব কৃষক রয়েছেন। যারা কুকুরের কামড়ে গরু হারিয়ে এখন দিশেহারা। আবার ওই এলাকার গাভীকে কুকুরের কামড়াচ্ছে শুনে ওই গাভীর দুধ পান করেছেন যেসব মানুষ তারা জলাতকের ভয়ে কুকুরের ভেকসিন নেওয়া শুরু করে দিয়েছেন। পুরো এলাকাটি ভারতের পাগলা কুকুরের আতংক বিরাজ করছে। এমনকি প্রয়োজন ছাড়া কেউ সীমান্ত এলাকায় যাচ্ছেন না।
রাজাপুর গ্রামের বাসিন্দা তোফাজ্জল হোসেন ক্যান্টন বলেন, প্রতিদিন দুপুরে ভারতের পাগলা কুকুরের দলটি হানা দেন। ওই সময়ে লোকজনের আনাগোনা কম থাকায় এদেশে ঢুকে পড়ছে। গরু ছাগলকে কামড়াতে দেখলে লোক দৌড়ে গেলে কুকুরগুলো পালিয়ে তাদের নিজ দেশে চলে যায়। এ কারণে ওই কুকুরগুলোকে নিধন করা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, অনেক গরু পালনকারীরা জানে না তাদের গরু ছাগলকে কুকুরে কামড়েছে। কুকুরে কামড়ানো গরু ছাগল পাগল হয়ে গেলে তারা বুঝতে পারেন তাদের পোষা প্রাণীটিকে কুকুরে কামড়িয়েছে।
ওই গ্রামের মৃত আইনল মিয়ার স্ত্রী রুনা বেগম একটি গাভী কিনে ছিলেন রমজান মাসে চড়া দামে দুধ বিক্রি করবেন বলে। গাভীটির দামের অর্ধেক টাকা দিয়েছেন মালিককে। বাকি টাকা রমজান মাসে ওই গরুর দুধ বিক্রি করে পরিশোধ করবেন এ রকম আশা ছিল তার। রমজান মাসে তার গাভীটি কামড়ায় কুকুরে। বিষয়টি তার অজানা ছিল। তিনি তার গাভীর দুধ বিক্রি করে গেছেন। সম্প্রতি তার গাভীটি অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে জানতে পারে তার গাভীটিকে কুকুরে কামড়িয়েছে। গাভীটি সম্প্রতি পাগল হয়ে মারা গেছে। গাভীটির মারা যাওয়ার কথা শুনে ওই গাভীর দুধ যারা পান করেছেন তারাও এখন কুকুরের ভেকসিন নিচ্ছেন।
রাজাপুর গ্রামের নূরুন্নাহার বেগম ও সুফিয়া বেগম বলেন, আমরা মরে যাওয়া গাভীর দুধ পান করে এখন জলাতংক রোগের ভয়ে আছি। তাই এখন কুকুরের ভেকসিন নিচ্ছি।
আখাউড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. কামাল বাশার বলেন, ঘটনাটি শুনে ওই এলাকা পরিদর্শন করেছি। গরু ছাগলকে কুকুরের কামুড়ের সঙ্গে সঙ্গে ভ্যাকসিন দিলে ভাল হয়ে যায়। কুকুরের কামুড়ের বিষয়টি অজানা থাকার কারণে পালনকারীরা অনেক দেরিতে আমাদের কাছে আসে। তখন আমাদের কিছু করার থাকে না।
২৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে: কর্নেল মো. শাহ আলী বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিএসএফের সঙ্গে কথা বলব। আর স্থানীয়ভাবে ওই কুকুরগুলো নিধন করা যায় এ নিয়ে ইউএনওর সঙ্গেও কথা বলব।
ইত্তেফাক/নূহু