মাচায় সবজি চাষে স্বাবলম্বি হচ্ছে চৌহালীর যমুনা চরের কৃষকেরা

সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী উপজেলার দুর্গম ঘোড়জান যমুনার চরে একদল কৃষক স্থানীয় এনজিও 'মানব মুক্তি সংস্থা'র (এমএমএস) করিগরি সহযোগিতায় গড়ে তুলেছে আধুনিক পদ্ধতিতে মাচায় সবজি চাষ। এই চাষের মধ্য দিয়ে তারা স্বাবলম্বী হবার স্বপ্ন দেখছে।
 
পূর্বে তারা গতানুগতিক পদ্ধতিতে ধান চাষের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখত। এই অবস্থায় তারা বছরে দুইবার শুধু ধান চাষ করতো। আগাম বন্যার করণে ফসল ঘরে তুলতে পারতো না। তাছাড়া বছরের একটা সময় জমি প্রায় অনাবাদি অবস্থাতেই পড়ে থাকতো। এ অবস্থায় বেশিরভাগ সময় চরের কৃষকেরা অর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতো। ফলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়াতো। সেই অবস্থার পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে আর্ন্তজাতিক উন্নয়ন সংস্থা অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের সহযোগিতায় স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠন মানব মুক্তি সংস্থা। 
 
রেজিলেন্স থ্রু ইকোনোমিক এমপাওয়ারমেন্ট, ক্লাইমেট চেইঞ্জ এডাপটেশন, লিডারশীপ এন্ড লার্নিং  রি-কল)- প্রকল্পের আওতায় জলবায়ুজনিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে আধুনিক পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদন করে চরের কৃষকেরা সত্যিই নতুন এক স্বপ্নের পথে চলেছেন। নিজেদেরকে ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত করার পাশাপাশি দেশের পুষ্টিচাহিদা মেটাতেও তারা অনন্য ভূমিকা পালন করছেন। 
IMG0
চৌহালীর চরাঞ্চলে রিকল প্রকল্পের শুরুতে স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠন মানব মুক্তি সংস্থা  কৃষকদের উঠান বৈঠক করে তাদের বুঝাতে সক্ষম হয় যে, কিভাবে চরের পতিত জমি ব্যবহার করে বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করা যায়। আর তাই চরের কৃষকেরা মাচায় সবজি চাষের বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং গত ৩ বছর হলো তারা বাণিজ্যিকভাবে সবজি চাষ শুরু করেছে। সবজিগুলোরা মধ্যে রয়েছে শশা, কুমড়া, ঝিঙ্গা, পটল, কাকরোল পুইশাক, ডাটা ইত্যাদি। 
 
এর আগেও কৃষকরা সবজি চাষ করত, কিন্তু সেটি ছিল সীমিত আকারে এবং কেবল নিজেদের চাহিদা মেটানোর জন্যে। চরের কৃষকেরা মূলতঃ বাড়ির আঙ্গিনা এবং আশেপাশে কিছু সবজি চাষ করত এবং এগুলো  নিজেদের খাবারের জন্যই ব্যবহার হত। এখন তারা মাচায় সবজি চাষ করে নিজেদের খাবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি সপ্তাহে দুদিন হাটে তাদের সবাজি বিক্রি করছে। শুধু তাই নয় অনেকেই আবার একটু বেশি চাষ করার কারণে মহাজনরা হাটবার ছাড়াও জমিতে এসে তাদের সবজি সরাসরি কিনে নিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেকে ভাল মূল্য পাওয়ার জন্য উপজেলা সদরে নৌকাতে করে সবজি নিয়ে যাচ্ছে।
 
মাচায় সবিজ চাষের সুবিধা হলো কোন সবজি অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে নষ্ট হয় না এবং পরিমাণমত জৈব সার ব্যবহাররের কারণে ফলনও বেশি হয়। এখান তারা  মাচায় সবজি চাষ করে অনেক বেশি আয় করছে। এই বাড়তি আয় থেকে তারা তাদের পরিবারের খরচ নির্বাহ তাছাড়াও ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার উন্নতিতে খরচ করছে। সবজি বিক্রির আয় থেকে চরের কৃষকরা প্রতিমাসে সঞ্চয়ও করতে পারছে।
 
চৌহালী উপজেলার চর ঘোড়জান, কাঁঠালবাড়ি, ছোট চৌহালী, ফুলহারা, উত্তর ববংগাইল, তেঘুড়ি, মুরাদপুর, ধীতপুরসহ ২০ টি চরের অন্তত চার হাজার কৃষক এখন রিকল প্রকল্পের আওতায় সবজি চাষের মধ্যে দিয়ে নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পেরেছেন।
 
রিকল প্রকল্পের প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর মুনিরা সুলতানা জানিয়েছেন, চৌহালী একটি বন্যাকবলিত দুর্গম চর এলাকা। রিকল প্রকল্পের মাধ্যমে চৌহালীর বিভিন্ন চরের কৃষকদের বিশেষ পদ্ধতিতে সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষ পদ্ধতিতে সবজি চাষ করার কারণে কৃষকরা ভালো ফলাফলও পাচ্ছেন। অর্থনৈতিকভাবে তারা এখন অনেক লাভবান হচ্ছেন। 
 
চরের অনেকেই জানিয়েছেন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সবজি চাষের আগে চর এলাকায় বেশ অভাব লক্ষ্য করা যেতো। কাজের সন্ধানে অনেকেই চরাঞ্চলের বাইরে যেত। কিন্তু সবজি চাষ জনপ্রিয় হওয়ার কারণে চরের অভ্যন্তরেই কৃষকদের কাজ করার অনেক সুযোগ তৈরি হয়েছে।
IMG1
উন্নয়ন সংগঠন মানব মুক্তি সংস্থার উদ্যোগে পরিবেশ সম্মত কৃষির আওতায় মাচায় সবজি চাষ চৌহালীর ঘোড়জান চরে সকলের কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে। তাদের দেখাদেখি অনেকেই এখন গতানুগতিক পদ্ধতিতে সবজি চাষের পরিবর্তে মাচায় সবজি চাষ শুরু করছে এবং বাড়তি আয়ের স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু এই দুগম চরে নৌকা ছাড়া যোগাযোগের আর কোন পথই তাদের জানা নেই।
 
মূল ভূখণ্ড থেকে চরগুলো বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে ফসলের বাজারজাতকরণ একটি বড় সমস্যা।  ফলে অনেক সময় মাহাজনরা সুযোগ বুঝে সবজির বাজার নিয়ন্ত্রণ করায় মূল কৃষকরা মূল্য কম পাচ্ছে। এমতাবস্থায় চরের কৃষকেরা সবজির বাজারজাতকরণে সরকারি-বেসরকারি সহায়তা কামনা করেছেন।  
 
অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের পলিসি, অ্যাডভোকেসি, ক্যাম্পেইন এন্ড কমিউনিকেশন্স ম্যানেজার এস এম মনজুর রশীদ বলেন, দেশের চরের কৃষি অপার এক সম্ভাবনার জায়গা। কিন্তু বহুবিধ কারণেই চরের উন্নত কৃষি ব্যবস্থাপনায় এখনও নানান ধরনের জটিলতা বিদ্যমান। চরের কৃষিসেবা ও ব্যবস্থাপনাকে আধুনীকিকরণের মধ্যে দিয়ে অধিক হারে খাদ্য উৎপাদনের প্রচেষ্টা সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরো জোরদার করা প্রয়োজন। চরের কৃষিতে অধিক হারে বিনিয়োগ করা হলে দেশের খাদ্যচাহিদার বিরাট অংশ পূরণ করা সম্ভব।
 
তিনি আরো বলেন, চরের কৃষিজমিতে যদি কৃষি বিপ্লব করা সম্ভব হয় তাহলে এটি নিশ্চিত করেই বলা যায় প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের যে পরিমাণ খাদ্য আমদানী করতে হয় তা অনেক কমে আসবে। একই সাথে চরের অতিদরিদ্র মানুষের নিত্য যে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মাঝে বসবাস সেটাও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। চরের কৃষিব্যবস্থার উন্নয়নকে একটি অগ্রগণ্য এজেন্ডা হিসেবে নেওয়া এখন সময়ের দাবি। চরাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টিকে জাতীয়ভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। 
 
ইত্তেফাক/নূহু