নাহিয়ান ও তার বন্ধুদের তৈরি রকেট উড্ডয়নের অপেক্ষায়

নাহিয়ান আল রহমান অলি রকেট উদ্ভাবনকারী দলকে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন। গাইবান্ধায় বেড়ে ওঠা এই ২৮ বছর বয়সী যুবক মাধ্যমিক সম্পন্ন করেছেন সুন্দরগঞ্জের আবদুল মজিদ সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে। এরপর ২০১১ সালে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেন। সেখান থেকে কৃতকার্য হয়ে ভর্তি হন ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। তিনি এই কলেজের চতুর্থ ব্যাচের ছাত্র। পড়ালেখা করেছেন ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগে। আলাপচারিতায় তিনি জানালেন রকেট তৈরির গল্প।


যেভাবে শুরু
নাহিয়ানের বয়স যখন অল্প, তখন টেলিভিশনে রকেট উড্ডয়নের দৃশ্য দেখে তার মনে সাধ জাগে রকেট তৈরি করার। লক্ষ্য পূরণে পরবর্তীতে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। ২০১২ সালে ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন নাহিয়ান। চিন্তা করলেন, ব্যতিক্রম কিছু তৈরি করে মানুষকে তাক লাগিয়ে দেবেন। যেই ভাবা সেই কাজ। ক্যাম্পাসের এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে শুরু করলেন রকেট তৈরির কাজ। কিন্তু পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা, অর্থ ও নির্মাণ সামগ্রীর অভাবে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হলো সেই প্রচেষ্টা। এর দুই বছর পর, নাহিয়ান আবারও নামেন তার অধরা স্বপ্নের খোঁজে। এবার পুরোপুরি সফল না হলেও ব্যর্থ বলা যাবে না তাকে। প্রায় ৫৩ মিনিটের মতো রকেট ওড়াতে সক্ষম হন সেবার। এরপর কেটে গেছে আরো তিনটি বছর। ততদিনে স্নাতক শেষ হয়েছে তার। ২০১৭ সালের শেষের দিকে আবারো শুরু করলেন। তবে এবারের নাহিয়ান যথেষ্ট অভিজ্ঞ ও দক্ষ। যার ফলও তিনি পেলেন। চার বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর, ২০২২ সালে এসে অবশেষে তৈরি হলো রকেট।

ধূমকেতু রকেট


অর্থের যোগান
শুরু থেকেই অর্থ জোগাড় করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে নাহিয়ান ও তার দলকে। শেষপর্যন্ত একটি ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়ে ২ লাখ টাকা লোন নেন তারা। তাছাড়া এর পেছনে টিউশনির টাকাও ব্যয় করেছেন নাহিয়ান।


দল গঠন
২০১৮ সালের আগ পর্যন্ত নাহিয়ান একাই এ নিয়ে কাজ করতেন। পরবর্তীতে একটি দল তৈরির প্রয়োজন অনুভব করেন। ২০১৮-তে বেশ কিছু তরুণ যুক্ত হন তার সঙ্গে। গড়ে ওঠে ১৫ সদস্যের দল ধুমকেতু এক্স। এদের মধ্য থেকে ৫-৭ জন এই প্রকল্পে সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করেছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সাইদুর, নাদিম, লিয়ান, আবরার, রিজু, বিন্দু, নাইম ও আশরাফ।


রকেটটির বৈশিষ্ট্য
নাহিয়ান দাবি করছেন, তার তৈরি রকেটগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে তৈরি প্রথম ওয়েদার রিসার্চ রকেট (সাউন্ডিং রকেট)। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত পত্রিকা ধূমকেতুর সাথে মিলিয়ে রকেটগুলোর নাম রাখা হয়েছে ধূমকেতু। মোট চারটি রকেট তৈরি হয়েছে এ নামে। ধূমকেতু-১ মডেলের দুইটি এবং ধূমকেতু-২ নামে আরো দুটি। ধূমকেতু-১ লম্বায় ৮ ফুট, আয়তনে ৬ ইঞ্চি। আর ৬ ফুট দৈর্ঘ্যের ধূমকেতু-২ এর আয়তন ৪ ইঞ্চি। আকাশে উড্ডয়ন করার পর আবহাওয়া সংক্রান্ত গবেষণার কাজে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে এসব রকেট।


বাধা পেরোনোর গল্প
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রকেট তৈরির কথা চিন্তা করা যেন আকাশ-কুসুম কল্পনা। সরকারি পর্যায়েও এখনো এ খাতে কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। তাই পৃষ্ঠপোষকতা করার ঝুঁকি নিতে চায়নি কেউ। কঠিন কাজটা আরো কঠিন হয়ে যায় নাহিয়ানের জন্য। প্রথমদিকে অনেকে হাসি-তামাশা করেছেন, ব্যর্থতার আগাম ভবিষ্যদ্বাণীও শুনিয়েছেন কেউ কেউ। আর রকেট তৈরির কথা শুনে নাহিয়ানের শিক্ষকরাও তাতে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেননি। তবে এখন সবাই উৎসাহ দিচ্ছেন।

উড্ডয়নের অপেক্ষায় ধূমকেতু


উড্ডয়নের প্রস্তুতি
নাহিয়ান এখন অপেক্ষা করছেন কর্তৃপক্ষের সবুজ সংকেতের। ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাথে তিনি যোগাযোগ করেছেন। সাফল্যের হার বৃদ্ধিতে তৈরি করেছেন একাধিক রকেট৷ এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। সরকার থেকে চূড়ান্ত অনুমতি পেলেই রকেটটির পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন করা হবে। আর এতে সফলতা আসবে বলেও আশাবাদী তিনি।


ভবিষ্যত পরিকল্পনা
ধূমকেতুর সফল উড্ডয়ন নিশ্চিত হলেই তৈরি হবে নতুন ইতিহাস। নাহিয়ান রহমান বললেন, অনেক ভালো লাগছে। আশা করি আমরা সফল হব। সেই সাথে নিজের স্বপ্নের কথাও জানান দিলেন এই তরুণ। ভবিষ্যতে রকেটের পাশাপাশি স্যাটেলাইটের দিকেও ঝুঁকতে চান। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো স্যাটেলাইট নিজ দেশেই তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করেন এই তরুণ, আর তাতে তিনি হতে চান গৌরবের অংশীদার।