ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রী ও প্রসূতিরোগ বিভাগের একটি ওয়ার্ডে কর্মরত অবস্থায় মনে জন্ম নেয়া তেমন এক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শুরু হয়েছিল ডা. ইশরাত আরা গণির দীর্ঘ যাত্রা, যা আজ তাকে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারপ্রান্তে।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির এমএসসি ইন রিপ্রোডাক্টিভ জেনেটিক্স প্রোগ্রামে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তার জানা মতে, ২০২৬ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রোগ্রামের উদ্বোধনী ব্যাচে তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি শিক্ষার্থী।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর স্বাস্থ্য খাতে কাজ শুরু করেন ডা. ইশরাত। কর্মজীবনের প্রথম দিকে গর্ভকালীন জটিলতা ‘সিভিয়ার প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া’ এ আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যু তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং প্রসূতিকালীন জটিলতা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। তার মনে প্রশ্ন জাগে, কেন কিছু নারী নির্দিষ্ট জটিলতার ঝুঁকিতে বেশি থাকেন? আর কীভাবে লক্ষণ-নির্ভর চিকিৎসার গণ্ডি পেরিয়ে রোগের মূল কারণগুলো আরও গভীরভাবে বোঝা সম্ভব?
এই ভাবনাই ধীরে ধীরে তার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) সহায়তায় পরিচালিত হেলথ, পপুলেশন অ্যান্ড নিউট্রিশন সেক্টর প্রোগ্রামের অধীনে জেলা যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (এসআরএইচআর) কর্মকর্তা হিসেবে তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
দেশের বিভিন্ন সীমিত-সুবিধার এলাকায় কাজ করতে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবার অগ্রগতির পাশাপাশি এর সীমাবদ্ধতাও তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি উপলব্ধি করেন, অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসা রোগের তাৎক্ষণিক জটিলতা সামাল দিতে পারলেও কেন সেই জটিলতা তৈরি হয়, তার কারণগুলো এখনো পুরোপুরি সঠিকভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না। বিশেষত জেনেটিক কারণ শনাক্তকরণ ও জেনেটিক পরীক্ষার ব্যবহার এখনো সীমিত। ফলে অনেক জটিলতার অন্তর্নিহিত কারণ অজানাই থেকে যায়।
প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে নিজের ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করতে ডা. ইশরাত যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরায় চিভনিং স্কলার হিসেবে ডিস্টিংকশন সহ মাস্টার অব পাবলিক হেলথ সম্পন্ন করেন।
এডিনবরায় অধ্যয়নকালে তার কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় প্রকৃত অগ্রগতি অর্জনের জন্য জনস্বাস্থ্য গবেষণা এবং জিনোমিক বিজ্ঞানের সমন্বয় অপরিহার্য। এই উপলব্ধিই তার আগ্রহকে আরও গভীরভাবে রিপ্রোডাক্টিভ জেনেটিক্সের দিকে নিয়ে যায় এবং তাকে পৌঁছে দেয় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএসসি ইন রিপ্রোডাক্টিভ জেনেটিক্স প্রোগ্রামে।
ডা. ইশরাতের কাছে এটি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বরং বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
তবে অক্সফোর্ডে ভর্তির সুযোগ পেলেও এখনো প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হয়নি। উচ্চশিক্ষার এই স্বপ্ন পূরণে তিনি সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উৎস থেকে আর্থিক সহায়তার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত হলে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরতে চান তিনি।
ডা. ইশরাতের লক্ষ্য, বাংলাদেশের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় জেনেটিক কাউন্সেলিং, উন্নত রেফারেল ব্যবস্থা এবং প্রমাণভিত্তিক স্বাস্থ্য-নীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখা। তার বিশ্বাস, প্রজনন জেনেটিক্সের সুসংগঠিত বিকাশের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও বিজ্ঞানভিত্তিক, প্রতিরোধমূলক ও সবার জন্য সহজলভ্য করা সম্ভব।

