১৯৫২ থেকে ২০২২ দীর্ঘ সময়ের পথচলার ধাপে ধাপে আমরা সমাজ বিনির্মাণের অনেক কথাই শুনেছি। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এই বিনির্মাণের দাবি যেমন উঠেছে বহুবার, তেমনি সরকারের তরফে এর পক্ষেই ব্যক্ত হয়েছে অঙ্গীকার। কিন্তু কার্যত তা কতটা সম্ভব হয়েছে—এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে বিদ্যমান বাস্তবতার মধ্যেই। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আর ২০২২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এই দুটি দিনের মধ্যে পার্থক্যও অনেক। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ইতিহাস সচেতন মানুষ মাত্রেরই জানা। আজ একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। ১৯৯৯ সালের ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয় এবং ২০০০ সাল থেকে বিশ্বের ১৯৩টি রাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হওয়ার বিষয়টি বাংলার বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার এটি একটি বড় ধাপ।
কিন্তু আমাদের প্রেক্ষাপটে যদি বিষয়টি বিশ্লেষণ করি, তাহলে প্রশ্ন জাগে আমরা এ ব্যাপারে কতটা কী করতে পেরেছি? আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বটে, কিন্তু সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি নেই কেন? যে গণতান্ত্রিক চেতনায় ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মতো জাতির বাঁক পরিবর্তনের মতো অধ্যায় সৃষ্টি করেছিল সেই ঘটনার কেন্দ্রে নিহিত গণতান্ত্রিক চেতনায় কেন আজও আমরা রাষ্ট্র ও সমাজে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারলাম না?
ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়, ঐ জাতীয়তাবাদী চেতনার যাত্রাপথ ধরে যে উন্মেষ ঘটে ষাটের দশকে এ সড়কপথেই ছয় দফা, ছাত্রদের ১১ দফা, ভাসানীর ১৪ দফার মাধ্যমে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে অর্জনের এই অনন্য অধ্যায়গুলো সামনে থাকা সত্ত্বেও বায়ান্ন ও একাত্তরের অঙ্গীকার সব ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত করা যায়নি। আমাদের উন্নয়ন-অগ্রগতি কম হয়নি। নানা সূচকে আমাদের অর্জন-সাফল্য দৃষ্টান্তযোগ্য হয়েও আছে। কিন্তু অন্য বিষয়গুলো উল্লেখ না করলেও তা তো বলতেই হবে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে আমরা বিজয় লাভ করলেও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনে সফলতার স্বাক্ষর আজও রাখতে পারিনি। এই গ্লানি তো আজও বয়ে বেড়ানোর কথা ছিল না। একমুখী শিক্ষাব্যবস্হা চালুর দাবিও পুরোনো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, তাও সম্ভব হয়নি।
ভাষা আন্দোলনের তাত্পর্য সুদূরপ্রসারী হয়েছিল। যার প্রভাব সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিস্তার লাভ করে। আধুনিকতায়, প্রগতিশীলতায়, রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটায় ভাষা আন্দোলন। সংস্কৃতির দিক থেকে ক্রমাগত চরিত্রের বদল হয়েছে। আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতা সামনের দিকে এগিয়েছে। এইগুলো বায়ান্নার ভাষা আন্দোলনের ফল। কিন্তু স্বাধীন দেশে শিল্প-সংস্কৃতি-শিক্ষা-রাজনীতি সেই আলোকে বিকশিত হয়নি, উপরন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা এই চেতনার বিপরীত কর্মকাণ্ড দেখেছি। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস লিখেছি আমি। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস আমার পক্ষে লেখা সম্ভব নয়। এটা কোনো ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ এর জন্য যে পরিমাণ অর্থশক্তি-জনশক্তি প্রয়োজন সেটা কোনো একজন ব্যক্তির পক্ষে জোগান দেওয়া দুরূহ। আমি আমার সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে যেটুকু পারি, দেশের জন্য কাজ করেছি। আমাদের সবার কর্তব্য বায়ান্ন ও একাত্তরের চেতনার আলোকে সমাজ বিনির্মাণের কাজে নিজ নিজ অবস্হান থেকে দায়িত্ব পালন করা।
সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনে আর সময় ক্ষেপণ প্রত্যাশিত নয়। আমরা স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পালন করেছি গত বছর। ৫০ বছর একটি জাতির জন্য কম সময় নয়। স্বীকার করি, এই ৫০ বছরে অনেক কাজ হয়েছে বিধায়ই রাষ্ট্রচিত্র অনেকটাই উজ্জ্বল হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এও মনে রাখা জরুরি, আমাদের করণীয় রয়ে গেছে আরো অনেক কিছু। প্রয়োজনীয় অনেক কাজ এখনো আমরা সম্পন্ন করতে পারিনি এই সত্যও এড়ানো যাবে না। মনে পড়ছে শহিদ দিবস সফল করার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের রাজনীতিমনস্ক ছাত্ররা কি অনন্য ভূমিকা পালন করেছিল। ২৩ ফেব্রুয়ারি সকালবেলা চিন্তাভাবনা হয় শহিদ মিনার নির্মাণের। সেই দিন রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত দুই জন রাজমিস্ত্রি নিয়ে কাজ করে সাড়ে ১০ ফুট লম্বা ছয় ফুট চওড়া শহিদ মিনার তৈরি করেছিলাম। এর নাম ছিল শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ। আমরা জোগালির কাজ করেছিলাম। হোসনে দালানের পিয়ারু সর্দার আমাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সম্প্রসারণ কাজে ঠিকাদার ছিলেন। তিনি ছিলেন খুব উদার মনের মানুষ। তার কাছ থেকে চাবি নিয়ে এসে সিমেন্টের গুদামের তালা খুলেছিলাম। আমি প্রায়ই রসিকতা করে বলি, আজকের মতো দিন হলে সিমেন্ট গুদামের তালা মোচড় দিয়ে ভেঙে ফেলা হতো কিংবা দরজা ভেঙে সিমেন্ট বের করা হতো। কিন্তু তখন আমরা শান্িতপূর্ণভাবে সবকিছু করেছি। যে চাবি এনে গুদাম খুলেছিলাম, দুদিন পর সেই চাবি ফেরতও দিয়েছিলাম। ২৪ ফেব্রুয়ারি ছিল রবিবার সরকারি ছুটির দিন। ২৪ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি সর্বস্তরের মানুষ বিশেষ করে পুরান ঢাকার মানুষজন শহিদ স্মৃতিস্তম্ভের দিকে জনস্রোত বইয়ে দিয়েছিল। ফুল টাকা পয়সা দিতে তারা স্বেচ্ছায় প্রচণ্ড আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। সেদিন এতটা আবেগ সৃষ্টি হয়েছিল যে এক ভদ্রমহিলা গলার হার খুলে দিয়েছিলেন শহিদ স্মৃতিস্তম্ভের পাদদেশে। স্কুলজীবন থেকেই যুক্ত ছিলাম ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে। তখনকার ছাত্ররাজনীতি আজকের মতো ছিল না। ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে ছাত্ররা তখন রাজনীতি করতেন। তখন ছাত্ররাজনীতি মানেই ছিল আদর্শের বড় জায়গা। স্কুল এবং কলেজ-জীবনের ধারাবাহিকতায় মেডিক্যাল কলেজে এসেও যুক্ত, নাকি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে। বলা দরকার প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির ঘাঁটি ছিল তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ। যখন ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয় তখন আমাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে যুক্ত করার জন্য সাংগঠকের দায়িত্ব পালন করতে হয়।
লেখক: ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্র গবেষক, কবি ও প্রাবন্ধি