নী ল ডু মু র
কিঙ্কর আহ্সান (লেখক ও ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর)
বলা হয়, প্রতিটি মহাকাব্যের পেছন জুড়ে থাকে আরেকটি মহাকাব্য। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর জগদ্বিখ্যাত উপন্যাস পদ্মা নদীর মাঝি’র ভিত্তি গড়তে বেছে নিয়েছিলেন সেখানকার মানুষের সাধারণ জীবন। হয়েছিলেন তাদের একজন। গুণী লেখকের বৈশিষ্ট্যই তা! এবার সেই একই বৈশিষ্ট্যের ধারক রূপে দেখা গেছে এ সময়ের পাঠক নন্দিত কথাসাহিত্যিক কিঙ্কর আহ্সানকে। নিজের সর্বশেষ রচনা নীলডুমুরকে মলাটবদ্ধ করতে গিয়ে তিনি ছুটেছেন এদেশ থেকে ওই দেশ। শুধু ছুটেই ক্ষান্ত হননি, নিজের প্রতি খেয়াল, আহার-নিদ্রা সবকিছুকে অগ্রাহ্য করেছেন; কেবল ঘটনার প্রকৃত ভাব, রস, আবেগের রসদ নিশ্চিত করতে। চরিত্রগুলোর মধ্যকার মেলবন্ধনকে আরও জোড়ালো করে ঘটনাপ্রবাহকে বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য অবস্থায় পাঠকের সামনে তুলে একদিন-দুইদিন নয়, একত্রিশ দিন তিনি উপন্যাসের চরিত্রের সন্ধানে নেমেছেন, তাদের পাশাপাশি থেকেছেন; ঘুরেছেন তাদের পেছনে। সময়-সুযোগ বুঝে কলম চালিয়েছেন নোটবুকে। 'বৃষ্টিতে হাঁটতে হাঁটতে আমি আসলে উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদটা লিখি। একটু থামি, সেখানে দাঁড়িয়ে খানিকটা লিখি। আবার হাঁটি, তারপর লেখার প্রয়োজনে আবার থামি', বলছিলেন কিঙ্কর আহ্সান।
উপন্যাসটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, লেখক গল্পটিকে নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখেননি। বরং সামাজিক বিভিন্ন উপাদান যোগ করে চরিত্রগুলোকে বৈচিত্র্যময় করেছেন। তাই, যে নীলডুমুর এর উদ্ভব হয়েছিল বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে নিয়ে তা একসময় পূর্ণতা পেয়েছে ভিনদেশ দার্জিলিংয়ের পথ-প্রান্তরে।
গল্পের নায়ক সেখানে লেখাপড়া করতে বাড়ি ছেড়েছেন। আগে থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাটি হিসেবে পরিচিত ওই অঞ্চল। গোর্খাদের বিদ্রোহী সংগঠন যেমন রয়েছে, পাশাপাশি আছে প্রগতিশীল সংগঠনও। কেন্দ্রীয় চরিত্র তাদের একটিতে জড়িয়ে গেছেন, ভিনদেশী এক পার্সি মেয়ের ভালোবাসাও একই সময় তার জীবনকে রঙিন করেছে। তবে সেই সম্পর্ক স্থায়ী হয়নি। পরবর্তীতে মেয়েটির ফিরে আসা। গল্পে নতুন মোড় যুক্ত হওয়া। এরকম নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও সরল, বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে উপন্যাসটি এগিয়েছে।
সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী সামাজিক উপন্যাস নীলডুমুর সংগ্রহ করা যাবে জ্ঞানকোষ থেকে। বইটির মুদ্রিত মূল্য ৪০০ টাকা।
স ফ ল ম ন্ত্র
রউফুল আলম (লেখক ও গবেষক)
প্রবাসী হয়েছেন, ভালো একটা অবস্থান তৈরি করেছেন সেখানে—এরকম মানুষের সংখ্যা কম নয় এ পৃথিবীতে। খোদ বাংলাদেশেই সংখ্যাটি অনেকবেশি। কিন্তু দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কিছু করবার তাড়না ক’জনেরই-বা আছে। রউফুল আলম এমন একজন, যিনি এই সোজা-সরল নিয়মের ধার ধারেননি। সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখেন শিক্ষা গবেষণায় সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশের। তাই তো তিনি লিখছেন, কাজ করছেন, একের পর এক উদ্যোগ নিয়ে। এভাবে একটি দেশ যেভাবে দাঁড়ায়, বাংলাদেশের স্বপ্নচোখ দিয়ে তিনি যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেই পথে এবার যুক্ত হয়েছে আরেকটি বারুদ, সফল মন্ত্র তার নাম। বইটিতে লেখক মূলত তরুণ কিশোরদের মৌলিক কিছু সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন। তাদেরকে আশাব্যঞ্জক বাক্য শুনিয়েছেন, দিকনির্দেশনা ও উৎসাহ-অনুপ্রেরণার মাধ্যমে উদ্বুদ্ধও করেছেন।
একজন রউফুল আলম বিশ্বাস করেন, জীবন মানেই সম্ভাবনায় ভরপুর। এই সম্ভাবনা ঝরে পড়ে সঠিক পরিবেশ, পদক্ষেপ ও দিকনির্দেশনার অভাবে। অতীতে যা হওয়ার হয়েছে, ভবিষ্যতে আর কোন প্রাণ যাতে এই অচলাবস্থার ফাঁদে বন্দি না হয়, রউফুল আলম তা নিশ্চিত করতে চান। তাই তিনি এসেছেন সাফল্যের মন্ত্র নিয়ে। এতে মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বিশ্বের সফল মানুষদেরকে। এরপর কীভাবে তারা সফল, কী মন্ত্র জঁপে তারা আজ এই পর্যায়ে তা বলার চেষ্টা করেছেন। যে মন্ত্রকে তিনি মহৌষধ বিবেচনায় সামনে এনেছেন তা যেন গলাধঃকরণে সমস্যা না হয়, সেজন্য সাবলীল ভাষার পরতে পরতে মনিষীদের বিভিন্ন উক্তি যুক্ত করে একে সহজসাধ্য করে তুলেছেন। পাশাপাশি পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখার সব ব্যবস্থাও এতে রয়েছে। ছোট ছোট গল্পের মাধ্যমে দশ লাইনের কথা দুই লাইনে বলে সময়োপযোগী একটি বই হিসেবে একে দাঁড় করিয়েছেন। লেখকের দাবি, নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস থাকলে, তিন ঘণ্টার বেশি লাগবে না বইটি শেষ করতে।
সফলতার মন্ত্র সমৃদ্ধ সফল মন্ত্র বইটি আদর্শ হয়ে উঠতে পারে যেকোনো তরুণ কিশোরের জন্য। বইটি পাওয়া যাবে জ্ঞানকোষ প্রকাশনীর স্টলে।
অ ন্য ম ন স্ক
জুনায়েদ ইভান (কণ্ঠশিল্পী ও লেখক)
তামাক পাতা, সে আমারে, ধুলাবালি, সতেরো পৃষ্ঠা, উড়ে যাওয়া পাখির চোখে—গান দিয়ে তিনি লম্বাসময় ধরে বুঁদ করে রেখেছেন বাংলার তরুণ-যুবাদের। মঞ্চের জাদুঘর, সুরের মূর্ছনায় চারপাশে আলোড়ন জাগানো জুনায়েদ ইভান আবির্ভূত হয়েছেন নতুন রূপে। মাইক্রোফোনের স্থলে তার হাতে এখন নতুন অস্ত্র, কাগজ-কলম। গতবছর ‘শেষ’ উপন্যাসের মাধ্যমে এর সূচনা, এবার তাতে যুক্ত হয়েছে সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার ‘অন্যমনস্ক’। বইটি ৭টি ছোট ছোট গল্পে বিভক্ত। যেখানে জুনায়েদ ইভান সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে গল্প বলে গেছেন; চরিত্রের উপর কোনো প্রকার বাড়তি হস্তক্ষেপ কিংবা মুন্সিয়ানা না দেখিয়ে। তিনি মনে করেন গল্পগুলোকে গল্পের মতো সোজা-সরল পথে যেতে দিতে হবে। এর রাশ তখন পর্যন্ত টানা যাবে না, যতক্ষণ পদচ্যুতি না ঘটছে। মজার বিষয় হলো, এসব গল্পের প্রতিটিই তার সামনে ঘটেছে। তিনি সেই গল্পগুলোকে পর্যবেক্ষণ করেছেন, আশপাশের প্রভাব থেকে আলাদা করেছেন এবং সর্বশেষ সেগুলোকে কাগজে বন্দি করার সাহস দেখিয়েছেন। তবে সেই পথটিও সহজ ছিল না। কথায় কথায় জানালেন, খুব তাড়াহুড়ো করে তিনি লিখতে পারেন না। অনেক চিন্তাভাবনার পর কয়েক লাইন লিখেন, সেটিও মনমতো না হলে কেটেকুটে একেবারে গোড়া থেকে শুরু করেন। এভাবে দীর্ঘ একটা সময়, শ্রম ও অধ্যবসায়কে পুঁজি করে বই লিখেন তিনি। যে কারণে এবারের বইটি লিখতেও ছয়মাস সময় লেগেছে তার।
মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রমের নানান স্তরের কর্মকান্ডে পরিপূর্ণ এই বইটি এসেছে অধ্যয়ন প্রকাশনীর ব্যানারে। বইটির মুদ্রিত মূল্য ৩৩৫ টাকা।
আ ফা রী ত ২
সামিয়া খান প্রিয়া (নতুন লেখক)
সামিয়া খান প্রিয়া এই সময়ের একজন তরুণ লেখিকা। বইয়ের প্রতি ভালোলাগা শৈশবকাল থেকে। জহির রায়হানের অমর সৃষ্টি 'হাজার বছর ধরে' পড়ে পেয়েছিলেন অনুপ্রেরণা। তখন থেকেই ইচ্ছা লেখালেখির সাথে যুক্ত থাকার। অবশেষে ২০২১-এ এসে সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয় তার। সে বছর 'আফারীত' ও 'এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না' নামে দুটি বই যুক্ত হয় তার নামের সাথে। সেই থেকে শুরু। যার ধারাবাহিকতায় তিনি এবারও হাজির হয়েছেন নতুন একটি বই নিয়ে। নাম আফারীত ২। আফারীতেরই দ্বিতীয় অংশ এটি। এই আফারীত আসলে 'ইফ্রীত্ব' এর বহুবচন। যা দ্বারা জিন জাতিকে বুঝায়। সেখান থেকেই বইয়ের গল্পগুলো তরতর করে এগিয়েছে জিন সমাজকে কেন্দ্র করে।
সাধারণত জিন সমাজকে নিয়ে লেখা ফ্যান্টাসি বা অতিপ্রাকৃত ঘরানার বই খুব একটা নেই এদেশে। তাই পাঠকদেরকে ভিন্ন কিছুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে লেখিকার এই উদ্যোগ। গা ছমছমে ব্যাপার হলো, বইটি লিখতে গিয়ে লেখিকা এতটাই কল্পনার জগতে মগ্ন থাকতেন যে, মাঝে মাঝে অশরীরি কিছুর উপস্থিতি চারপাশে অনুভব করতেন। একই সময়ে গল্পের চরিত্রগুলোর সাথে সখ্যতা তৈরি হয় তার। চরিত্রগুলো যখন হেসেছে লেখিকাও তখন উৎফুল্ল হয়েছেন, চরিত্রগুলো ডুকরে কাঁদলে, লেখিকা অনুরূপভাবে বিষন্নতায় ভুগেছেন। এই গল্পের কারিগর সবার আগে একটি বিষয় নিশ্চিত করতে চেয়েছেন, সেটি হলো কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলো যেন কোনোমতেই পার্শ্বীয় চরিত্রগুলোকে ছাড়িয়ে যেতে না পারে।
এক্ষেত্রে লেখিকা কতটুকু সফল বা ব্যর্থ হলেন তা বিচারের দায়িত্ব কেবল পাঠকের। ১৬০ পৃষ্ঠার আবরণে সাজানো গ্রন্থটির মুদ্রিত মূল্য ৪০০ টাকা। বইটি পাওয়া যাবে তাম্রলিপি-তে।