১৫৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৯ শতাংশ নারী শিক্ষক। এ পেশায় দিন দিন বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকের সংখ্যা বেশি। ১৯৭৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দেশের ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।
কমিশনের তথ্য মতে—সে সময় নারী শিক্ষক ছিলেন ৮ শতাংশ। আর বর্তমানে পুরুষ শিক্ষকদের চেয়ে ৭০ শতাংশ পিছিয়ে আছেন নারী শিক্ষকগণ। এক্ষেত্রে সমতা তৈরিতে দৃষ্টিভঙ্গি বদলের ওপর গুরুত্ব দেন বিজ্ঞজনরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের আসনে স্বাধীনতার আগে থেকে নারীরা থাকলেও ৫০ বছরে ৫০ শতাংশ জায়গা দখল করতে পারেননি তারা। এর কারণ হিসেবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, নারীর উচ্চশিক্ষা গ্রহণে পরিবেশ না থাকা, পারিবারিক দায়িত্বে নারীর অংশগ্রহণ বেশি ও শিক্ষক রাজনীতির কথা উল্লেখ করেন বিজ্ঞজন।
মঞ্জুরি কমিশনের ৪৭তম বার্ষিক প্রতিবেদন মতে—ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বাংলাদেশ এগ্রিকালচার বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৩ সালে মোট শিক্ষক ছিলেন ২ হাজার ৩১৭ জন। সে সময় নারী শিক্ষক ছিলেন ২০৩ জন অর্থাৎ ৮ শতাংশ। ৫০ বছরে এই হার বেড়েছে ২১ শতাংশ। বর্তমানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক ১৫ হাজার ৪২৬ জন। এর মধ্যে নারী ৪ হাজার ১২৩ জন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক ১৫ হাজার ২৬৭ জন। তার মধ্যে নারী ৪ হাজার ৯১৯ জন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শতবর্ষের আলোয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদনের তথ্যমতে—বর্তমানে ১ হাজার ৩২৩ জন শিক্ষকের মধ্যে নারী আছেন ৬৩৮ জন, অর্থাৎ প্রায় ৫০ শতাংশ। ২২টি বিভাগের প্রধান তিনটি ইনস্টিটিউটের দায়িত্বে আছেন নারী।
এ বিষয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর ১৫ বছর পরে প্রথম নারী শিক্ষক আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়টি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে আলাদা। এখানে নারীর কাজের পরিবেশ ভালো। তবে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতিতে এগিয়ে যাওয়া নির্দেশ করে না। ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক কম। এজন্য পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে দায়ী করেন প্রবীণ এই শিক্ষক। তিনি বলেন, চিরায়তভাবে সংসার-সন্তান প্রতিপালনের গুরুদায়িত্ব বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারীর কাঁধে। সব ভারসাম্য বজায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার জন্য যে জ্ঞানর্চচা ও গবেষণা করতে হয় তা নারীর পক্ষে করা সম্ভব হয় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পিএইচডি ডিগ্রি। দেশে মোট পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকের সংখ্যা ৫ হাজার ৬৫১। এর মধ্যে নারী মাত্র ৯৫০ জন, যেখানে পুরুষের সংখ্যা ৪ হাজার ৭০১। দেশের বাইরে পড়াশোনার ক্ষেত্রে সামাজিক পারিবারিক বাধা কাজ করে বলে মত দেন বিজ্ঞজন। অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে নারী শিক্ষার অগ্রগতি হলেও উচ্চপর্যায় তা কমতে থাকে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারী-পুরুষের অনুপাত ৪০ ও ৬০ শতাংশ। এই বৈষম্যটা মেধাবী নারীর ক্ষেত্রে ৩০ ও ৭০ শতাংশ।
ড. সাদেকা হালিম বলেন, শিক্ষকতায় নারীদের কোটা নেই। মেধাবী নারীরা শিক্ষক হলেও এখানে শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি পুরুষের হাতে বলে পুরোপুরি পরিচ্ছন্ন বলা যায় না। শিক্ষক হতে লবিং করতে হয়। নারীকে দলীয়ভাবে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। অনেক মেধাবী নারীর জন্য তা করা সম্ভব হয় না। বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বুয়েট) ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়। বুয়েটে এখন নারী শিক্ষকের সংখ্যা ১৪০ জন। যাদের মধ্যে ২৮ জন অধ্যাপক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় তিনটি অনুষদের ডিন পদে এবং ১১টি বিভাগে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নারী শিক্ষকগণ।
দেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় এযাবৎ নারী ভিসি পায়। তার মধ্যে এখন দায়িত্বে আছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. শিরীন আক্তার। ড. শিরীন আখতার ইত্তেফাককে বলেন, একজন নারীর ভিসির দায়িত্ব পালনে চ্যালেঞ্জ অনেক। তিনি জানান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সমিতির সভাপতি নারীসহ দুই জন প্রভোস্ট, একজন প্রক্টোর, ১৫ জন আবাসিক শিক্ষক, ১২ জন বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন নারী। তার মতে—নারীবান্ধব নেতৃত্বই নারীর সুযোগ তৈরি করে।