শিক্ষা ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দানকারী দেশগুলি প্রসঙ্গে
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ১৬:১২
বিভিন্ন মানদন্ড ব্যবহার করিয়া পৃথিবীর মধ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রে সেরা ২০টি দেশের নাম প্রকাশ করিয়াছেন আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান শিক্ষা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান পিয়ারসন। শিক্ষা ক্ষেত্রে সেরা প্রসঙ্গটি আসিলে অবচেতনে আমাদিগের মন ইউরোপ-আমেরিকার দিকে ধাবিত হইলেও বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র প্রদর্শন করিতেছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে শিক্ষা ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানটি পাইয়াছে ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের দেশ ফিনল্যান্ড। কিন্তু ইহার পরের চারটি দেশই, ইউরোপ-আমেরিকা নয়, তালিকাতে ঢুকিয়াছে এশিয়া হইতে। এই দেশগুলি হইতেছে দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, জাপান ও সিঙ্গাপুর। একবিংশ শতাব্দী এশিয়া মহাদেশের হইবে মর্মে যেই সমস্ত কথাবার্তা চালু আছে পিয়ারসনের তালিকাটিতে যেন তাহারই প্রতিফলন দেখা যাইতেছে। গণিত, বিজ্ঞান ও সাক্ষরতার সাফল্যসহ আরও কয়েকটি প্রাসঙ্গিক বিষয়ে গত পাঁচ বৎসরের সাফল্যের হার নিরীক্ষার ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি রচিত হইয়াছে। ইহাছাড়াও ২০০৬ হইতে ২০১০ সাল সময়কালে গ্র্যাজুয়েশনের হার কেমন তাহাও বিবেচনার মধ্যে লওয়া হইয়াছে। তালিকার শীর্ষ দশের অন্য দেশগুলি হইতেছে যথাক্রমে যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড ও কানাডা।
প্রসঙ্গত, এই প্রশ্ন মনে আসিতে পারে আমরা কোথায় অবস্থান করিতেছি? উত্তর সহজেই অনুমেয়। যেই কুড়িটি দেশের নাম ছাপা হইয়াছে বাংলাদেশ উহার মধ্যে নাই। আসলে থাকিবার কথাও নহে। শিক্ষা ক্ষেত্রে, সুনির্দিষ্টভাবে সাধারণ শিক্ষাতে বিশ্ব পর্যায়ে উঠিয়া আসিবার জন্য আমরা অর্থবহ কিছু করিতেছি কি? পিয়ারসন সফল দেশগুলির সাফল্যের পিছনে তিনটি কারণকে সবিশেষ গুরুত্বের সহিত চিহ্নিত করিয়াছে। ইহার মধ্যে সর্বাগ্রে রহিয়াছে শিক্ষকের উচ্চ মর্যাদা। শীর্ষস্থানীয় দেশগুলি প্রত্যেকেই শিক্ষকদের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা যথাযথভাবে নিশ্চিত করিয়াছে। আমাদের রাষ্ট্র কি করিয়াছে? মুষ্টিমেয় ব্যতিক্রম বাদ দিলে সকল পর্যায়ের শিক্ষকদিগের বিশেষত আর্থিক অবস্থা খুব একটা সুবিধার নহে। নিজের মত করিয়া ভদ্রস্থ একটি জীবন যাপনের চিন্তাতে সর্বক্ষণ চিন্তিত হইয়া থাকা শিক্ষককুল বিশ্ব পর্যায়ে লড়িবার শক্তি পাইবেন কোথা হইতে?
পিয়ারসন দ্বিতীয়ত আনিয়াছে সমাজে শিক্ষাবান্ধব সংস্কৃতির প্রসঙ্গ। এই ক্ষেত্রে কিন্তু আমাদিগের আশাবাদী হইবার কারণ রহিয়াছে। নিতান্ত কূপমণ্ডূক না হইলে হতদরিদ্র মানুষজনও এখন সন্তানকে বিদ্যালয়ে প্রেরণে আগ্রহী হইয়া উঠিতেছে, যদিও দারিদ্রের বিষম কশাঘাতে দরিদ্র ঘরের শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থা হইতে ঝরিয়া পড়া বন্ধ হইতেছে না। রাষ্ট্র কিছু করিতেছে না তাহা বলা যাইবে না; কিন্তু বিশ্ব পর্যায়ে পেঁৗছিবার জন্য ইহা যে কিছুই নহে তাহা বুঝিবার জন্য পন্ডিত হইবার প্রয়োজন হয় না। সর্বাপেক্ষা লাভজনক খাত, অর্থাৎ শিক্ষাখাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব না দিয়া নানাবিধ অনুৎপাদনশীল ও অপ্রয়োজনীয় খাতে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় বিপুল অঙ্কের ব্যয় রাষ্ট্র কেন করিয়া চলিয়াছে তাহা গভীরভাবে ভাবিবার বিষয় বটে।
আশা করা অনুচিত হইবে যে, আগামীকল্য হইতে যথাযথ বিনিয়োগ হইলে পরশু দিন হইতে শিক্ষাখাতে ফল ফলিতে শুরু করিবে! এক্ষেত্রে সময় লাগিবে এবং সময় লাগাটাই স্বাভাবিক। আসল কথা হইতেছে আমরা যত তাড়াতাড়ি গুরুত্ব বুঝিতে পারিব তত তাড়াতাড়ি আমরা শিক্ষাখাতের সুফল পাইতে শুরু করিব। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশ শিক্ষার গুরুত্ব সত্যিকার অর্থে বুঝিতে শুরু করিয়া যথাযথ মাত্রাতে বিনিয়োগ করিতে শুরু করিয়াছে। আমাদের প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা ইহা অনেকদিন পূর্বেই বুঝিয়াছে। ভারত ইদানীং এই খাতে জোর-বিনিয়োগ শুরু করিয়াছে। এমনকি পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষণীয়। বাংলাদেশে এখন অবধি সাধারণ শিক্ষাখাতে বিনিয়োগের জোর-হাওয়া লক্ষ্য করা যাইতেছে না। যত তাড়াতাড়ি এই খাতের পালে বাতাস লাগানো যাইবে ততই বাংলাদেশের উন্নতির স্বপ্ন বাস্তবায়িত হইবার সম্ভাবনা দ্রুততর হইতে থাকিবে।