খাস জমিতে জবরদস্তি বন্ধ হউক

এই স্বাধীন দেশে জনমানুষের ভোগান্তির আর শেষ নাই। সর্বত্রই সাধারণ মানুষ এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে সমাজের খ্যাতিমান বা মোটামুটিভাবে লব্ধপ্রতিষ্ঠিত লোকজনও নানান হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হইতেছে। প্রতিদিনের পত্রিকার পৃষ্ঠায় নজর বুলাইলে ক্ষমতাবানদের হাতে নিরীহ, শান্তিপ্রিয় ও অসহায় মানুষের নির্যাতন-নিগ্রহ ইত্যাদির চিত্রই বেশি দেখিতে পাওয়া যায়। ইহার প্রতিকারের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরাও সমাজপতি কিংবা স্থানীয় বা জাতীয়ভাবে ক্ষমতাবানদের হাতের পুতুল হইয়া থাকাকেই কর্তব্যজ্ঞান করেন বিধায় অন্যায়-অবিচারের আর প্রতিকার হয় না। পত্রিকান্তরের খবরে প্রকাশ, ফেনীর সোনাগাজী চরাঞ্চলের খাস জমিতে আমন ধান লাগাইয়া মহাবিপাকে পড়িয়াছে হতভাগ্য দরিদ্র মানুষেরা। কেননা, এখন যখন সোনালী ফসলে চরাঞ্চলের চারিদিকে অপরূপ সমারোহ দেখা যাইতেছে ঠিক তখনই প্রভাবশালীদের ভাড়াটিয়া লাঠিয়ালদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ চাষীদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হইবার জোগাড়। সাগর বা নদীতে জাগিয়া ওঠা চর বন্দোবস্ত লইয়া গরীব মানুষেরা সেখানে আমন ফলায় আর ফি বছরই সেই ফসল জোরপূর্বক কাড়িয়া লইতে দুর্বৃত্তদের পদভারে প্রকম্পিত হয় সংশ্লিষ্ট এলাকা। ইহা কোন নূতন ঘটনা নহে। শত শত বৎসর ধরিয়াই আমাদের গ্রামাঞ্চলে কিংবা চরাঞ্চলে এই একই দৃশ্যের অবতারণা ঘটিতেছে। হতদরিদ্র মানুষ তাহাদের ফসলের ন্যায্য মূল্য দূরে থাকুক ফসলের নাগাল পর্যন্ত পায় না। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরটিতে বলা হইয়াছে যে, চলতি আমন মৌসুমের প্রারম্ভেই প্রভাবশালীদের লেলানো লাঠিয়াল বাহিনী সোনাগাজী উপজেলায় সাগর হইতে জাগিয়া ওঠা চরাঞ্চলের জমির ফসল কাটিয়া লইতে তৎপর। ইহাতে তাহাদের হামলায় ১২ জন দরিদ্র কৃষক আহতও হইয়াছে। উল্লেখ্য, এ ধরনের জাগিয়া ওঠা চর কিংবা খাসজমি ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণ করার কথা। প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী তাই করা হইয়া থাকে। কিন্তু সমাজের প্রতিপত্তিশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দরিদ্র চাষীদের উপর তাহাদের লাঠিয়ালদেরকে লেলাইয়া দিয়া জমির ফসল কাড়িয়া নেয়। বিগত ২০-৩০ বৎসর যাবৎ এইসব চর জাগিয়া উঠিয়াছিল এবং সেই মোতাবেক উহা দরিদ্রদের মাঝে বন্দোবস্তও দেওয়া হইয়াছিল। প্রতি বৎসর কৃষকেরা ঐ জমিতে আবাদ করিলেও অন্যায়ভাবে তাহাদের মুখের গ্রাস কাড়িয়া লইতেছে সমাজপতিরা। আরেকটি কথা, জাগিয়া উঠা চরের সহিত অন্যান্য জমির সীমানা চিহ্নিতকরণেরও কোন ব্যবস্থা নাই। ফলে জমির সীমানা লইয়াও সংঘর্ষ-বচসা লাগিয়াই থাকে। সত্য বটে, বাংলাদেশে এই চিত্র শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া চলিয়া আসিতেছে। কিন্তু এই জাতীয় অন্যায় যদি প্রতিকারহীনভাবে চলিতেই থাকে তাহা হইলে ন্যায়নীতি, আইন-কানুন, বিচার-আচার এইসব বিষয়তো সম্পূর্ণভাবে গৌণ হইয়া পড়ে। দেশের আইন-কানুনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখাইয়া দুর্বলের উপর সবলের এই অত্যাচার বন্ধ করিতেই তো রক্তাক্ত পথে দেশ স্বাধীন হইয়াছে। কিন্তু স্বাধীন দেশেও অবাধে 'জোর যার মুল্লুক তার' এই নীতি অনুসৃত হইতে থাকিলে দেশ পরিচালকদের সুনাম বা সম্মান বৃদ্ধি পায় না নিশ্চয়ই! চরাঞ্চলে জোতদারদের প্রভাবতো আছেই। উহার উপর নূতন উপসর্গ হিসাবে বেশ কয়েক দশক যাবৎ যোগ হইয়াছে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবাধীন চক্রের দুরভিসন্ধিমূলক তৎপরতা। ফলে দরিদ্র অসহায় মানুষদের ক্ষেত্রে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা নামিয়া আসিয়াছে। দেশের খাস জমিতে মৌসুমী ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষেরা জীবিকা নির্বাহ করুক এবং একইভাবে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখুক, ইহা যাহারা চায় না তাহারা জনগণের বন্ধু হইতে পারে না। সুতরাং সংশ্লিষ্ট মহলের উচিত অবিলম্বে ইহার প্রতিকারের উদ্যোগ নেওয়া, নচেৎ এইসব ঘটনার বিরুদ্ধে জনগণ একদিন ফুঁসিয়া উঠিলে বলদর্পীদের আম ও ছালা দুইটাই হাতছাড়া হইবার আশংকা থাকিয়া যাইবে নিশ্চয়ই!