অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যে প্রয়োজন
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ১৬:১২
উন্নয়ন কিন্তু ধীরলয়ে হলেও এগিয়ে চলেছে। বিভিন্ন চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে দেশের ব্যষ্টিক এবং সামষ্টিক উন্নয়নের অনুঘটকগুলো সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে। রাজনৈতিক পরিবেশও কখনো উত্তাল ছিল, কখনো শান্ত ছিল। লক্ষণীয় হচ্ছে, যখনই দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তাল ছিল, তখন কিন্তু রাষ্ট্রের উন্নয়ন হয়নি। বঙ্গবন্ধুর আমলে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির ভাবধারা থেকে মিশ্র অর্থনীতির সূচনা হয়। এই মিশ্র অর্থনীতি মোটামুটিভাবে নব্বইয়ের দশকের সূচনা পূর্ববর্তী পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। তারপরই এলো মুক্তবাজার অর্থনীতির হাওয়া।
যে বাংলাদেশের সূচনালগ্নে জীবনযাত্রার মান ছিল অত্যন্ত স্বল্প তা কিন্তু ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়েছে। উন্নয়ন মূলত:ঢাকা কেন্দ্রিক হলেও তার সুফল ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চল পর্যন্ত। মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো যেমন-অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং শিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। নিরক্ষরতা দূরীকরণ কর্মসূচির ক্ষেত্রে বেশ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। খাদ্যঘাটতিও অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। বাসস্থানের সুযোগ-সুবিধা ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়েছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলে আগের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক সুযোগ-সুবিধার জোয়ার নিয়ে এসেছে। গ্রামীণ অঞ্চলে চিকিৎসা 'নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল', অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে মানব উন্নয়ন সূচক পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, শিশু জন্মকালীন মায়ের মৃত্যুর হার অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। সুস্থ শিশুর জন্মহার বেড়েছে, সুপেয় পানির ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়েছে। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলে হ্রাস পেয়েছে। নারীশিক্ষার অগ্রগতি হয়েছে। উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে। তবে নিম্নবিত্তের ক্ষেত্রে পরিবার পরিকল্পনার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। কর্মসংস্থানের সুযোগও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। গ্রামীণ এলাকায় সচ্ছলতা ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়েছে।
সামগ্রিক অর্থে আশির দশকে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। জনসংখ্যা অনুপাতে সে সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা সন্তোষজনক হলেও বর্তমানে কিন্তু অপ্রতুল হয়ে পড়ছে। এদিকে রেলপথ এবং নৌপথ অবশ্য ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। বর্তমান সরকার রেলপথ উন্নয়নের জন্যে দীর্ঘদিন পর নজর দিলেও তা কতখানি সাফল্য পাবে ভবিতব্যই জানেন। রেলপথের জন্যে যে ধরনের অবকাঠামো দরকার তা বিনির্মাণে প্রচুর পরিমাণে অর্থব্যয়ের প্রয়োজন। বর্তমানে রেলের দায়িত্বে যিনি আছেন তার কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রশ্নই থেকে যায়। পাশাপাশি দাতাগোষ্ঠী রেলপথের সম্প্রসারণ এবং আধুনিকায়নের জন্যে পর্যাপ্ত ফান্ড দিতে তেমন আগ্রহী নয়। এদিকে নৌপথের উন্নয়নের জন্যে যে ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়েছিল তা বরাবরই উপেক্ষিত থেকে গেছে। নৌপথের মধ্যে অনেক পথই বন্ধ হয়ে গেছে। নৌপথের উন্নয়নে ব্যাপক অর্থ ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা দরকার। বর্তমান সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করলেও বাস্তবতা হচ্ছে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ হিমাগারে রয়েছে। এদিকে গোমতী এবং মেঘনা সেতুর অবস্থা তথৈবচ। মূল সমস্যা হচ্ছে গোমতী এবং মেঘনা সেতুর ক্ষেত্রে পাইলিং কম করা হয়েছে। বিকল্প গোমতী এবং মেঘনা সেতু তৈরির উদ্যোগ এবং বিদেশে দাতা গোষ্ঠীর কাছে প্রকল্পে অর্থায়নের জন্যে সাহায্য চাওয়া প্রয়োজন-নচেৎ ঢাকার সাথে চট্টগ্রামের যোগাযোগ সমস্যা বেড়ে যাবে। তবে এটি ঠিক যে, আশির দশকে গৃহীত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পণ্য সরবরাহ ও চাহিদার ক্ষেত্র পূরণে সুবিধা হয়েছে -ডিস্ট্রিবিউশানারী চ্যানেল ভাল হয়েছে। সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট (ঝঁঢ়ঢ়ষু ঈযধরহ গধহধমবসবহঃ) সুন্দরভাবে কাজ করছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই বিদেশে অর্থ উপার্জনের জন্যে প্রবাসে মানুষ যেতে আরম্ভ করে। আশি, নব্বই, একবিংশ শতকে প্রচুর পরিমাণে মানুষ কর্মসংস্থানের জন্যে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের চেয়ে বেসরকারি উদ্যোগ একটি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে যোগাযোগের মাধ্যমেও অফিসিয়াল রেকর্ডের দেড়গুণ লোক বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য কোন সরকারের আমলেই বিদেশস্থ বাংলাদেশি দূতাবাসগুলো তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব ঠিকমত পালন করেননি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এখন নতুন করে লোক পাঠাতে সমস্যা হচ্ছে। আবার নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গের মত কেউ কেউ বিদেশে আমাদের দেশ থেকে যাতে শ্রমশক্তি যেতে না পারে সে জন্যে মিথ্যে অপপ্রচার করে থাকেন। এদেশে এখন বৈদেশিক রিজার্ভের রেকর্ড নিয়ে গর্ব করা হয় অথচ প্রবাসে যে সমস্ত বাংলাদেশি থাকেন তাদের দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্তরা যথাযথভাবে তা করেন না। বিদেশস্থ দূতাবাসসমূহের নজিরবিহীন অব্যবস্থাপনা বিভিন্ন সরকার বরদাশত করেছেন। ফলে এদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন বাড়লেও আগামী ছয় মাসের মধ্যে আবার সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়ে গেছে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্যে এডহক ভিত্তিতে গৃহীত বিভিন্ন নীতিমালা দেশের কৃষি উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে। তবে উচ্চ ফলনশীল বীজের উদ্ভাবন এবং কৃষি চাষের জমি অনুযায়ী লাগসই প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে। সামগ্রিক অর্থে কৃষকেরা অবহেলিত হলেও নিজ উদ্যোগেই কৃষি খাতের উন্নয়নের নিরলস হাতিয়ার হিসাবে কাজ করেছেন। মস্নান মূক কৃষকেরাই এই দেশের মূল চালিকা শক্তি। তাদের হাত দিয়ে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। কৃষকেরা সংঘবদ্ধ হলে তাদের পণ্যের ন্যায্য দাম প্রাপ্তিতে যেমন সুবিধা হতো তেমনি মধ্যস্বত্ব ভোগীদের দৌরাত্ম্য বহুলাংশে হ্রাস পেত। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে নিম্নমধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণী মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় বেসামাল হয়ে পড়েছিল।
তবে দেশের সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিবেশ যে-কোন সময়েই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এদেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, যে যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনই প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিকরণ করে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করতে দিয়েছে। অনেক ধরনের অপরাধ করেও অপরাধীরা অনায়াসে পার পেয়ে যাচ্ছে। সম্মানিতকে অসম্মান করে কোন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না। পেশাদারিত্বকে কোন সময়েই যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আইন-শংখলা বাহিনীকে আক্রমণ করেও অনেকে পার পেয়ে যাচ্ছে আবার আক্রমণ না করেও দোষী সাব্যস্ত হচ্ছে। যখন যে দল ক্ষমতায় থেকেছে তারা এমন অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি করেছে যে, পেশাদার ও দক্ষ কর্মকর্তারা সম্মানের সাথে কাজ করতে পারেন না। ফলে অন্য দলের লোকেরাও পেশাদার ও দক্ষদের অবহেলা করার সাহস পাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন দলের হামলা-পাল্টা হামলার যে সচিত্র প্রতিবেদন চোখে পড়ছে তাতে দুঃখ লাগে। যারা হামলা করছে, তারা একবারও ভাবে না তাদের জন্যে দেশের কত ক্ষতি হচ্ছে? অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হতে পারত আরো অধিকতর হারে বেগবান। গত একচলি্লশ বছরের অর্থনীতির সালতামামি করলে দেখা যায় যে, যখনই রাজনৈতিক সংঘাতময় ও বৈরী পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে তখনই অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। কেননা এই পরিস্থিতিতে শিল্প উদ্যোক্তারা কখনোই উৎসাহী হবেন না। নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্ট দেখে এক ধরনের সহিংসতার সৃষ্টি হচ্ছে। এ ধরনের হীন সংঘাতে শেষ পর্যন্ত কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশের সৃষ্টি হচ্ছে।
বাংলাদেশের সাফল্য শিল্পখাতে অর্জিত হচ্ছে। শিল্প খাতের এই প্রবৃদ্ধি যদিও বেসরকারি উদ্যোগেই মূলত: হয়েছে তবে এক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে সংঘাতমুক্ত পরিবেশ। গত দু'যুগে মোট জাতীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হার গড়ে ৫.৫% এর উপরে। এই অধিক অর্জনের মূল কারণ হচ্ছে শান্তি-স্থিতিশীলতা বজায় থাকা। দেশি উদ্যোক্তারাও কখনো অস্থিতিশীল পরিবেশে বিনিয়োগে উৎসাহী হবেন না।
দুর্নীতি আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বভুক্ত দেশের জন্যে মারাত্মক সমস্যা স্বরূপ। তবে আমাদের দেশে দুর্নীতি শীর্ষ থেকে নিম্ন পর্যায়ে পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। এই অব্যবস্থাপনা থেকে মুক্তির জন্যে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় ছিল। কেবল দুর্নীতিমুক্ত থাকার কথা বললেই হবে না। বরং কথা ও কাজের সাথে মিল ঘটাতে হবে। নৈতিকতা সমাজ থেকে নির্বাসিত প্রায়। ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতা ত্যাগ নয়, ক্ষমতা অধিগ্রহণই শেষ কথা। ফলে সামাজিক যে ভারসাম্য তা বিনষ্ট হচ্ছে। দুঃখ লাগে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে অর্জন তা হয়ত আরো বৃদ্ধি পেত। একই সাথে ভয় হয়, সম্ভাব্য সংঘাত রাষ্ট্রযন্ত্রকে বিকল করে দিতে পারে। সচরাচর ক্ষমতার মদমত্তে এক দল যখন হিংস্র থাকে অন্যদল ক্ষমতার ধান্দায় কোন ধরনের বাছবিচার না করে সংঘাতের দিকে নিজেদের ঠেলে দিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সহনশীলতা, স্থিতিশীলতা, ঔদার্য নষ্ট হবে। যে কোন উপায়ে দলীয় সাইনবোর্ডের প্রশ্রয়ে দিনকে রাত, সত্যকে মিথ্যেতে রূপান্তর অর্থনীতির জন্যে যেমন ক্ষতিকারক তেমনি রাষ্ট্রযন্ত্রে ভুল সিগন্যাল দেয়। অসৎ মনমানসিকতা সুন্দরকে আড়াল করে দেয়, হিংস শ্বাপদের কাছে সৎ ও নিষ্ঠাবানদের আত্মাহুতির মত অবস্থা হয়, বেঁচে থেকেও মৃত্যুর ফানুস ওড়ে। এখন শীর্ষস্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীসহ অনেককেই ক্যাডার রাখতে হচ্ছে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্যে। অথচ আমরা যারা সাধারণ জনতা তারা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় আছি। নিয়ম হওয়া উচিত ছিল সন্ত্রাসী- চাঁদাবাজির কোন দল নেই, পরিচয় একটি। বাস্তবতা হচ্ছে এটি তাত্তি্বক কথা, প্রহসন মাত্র।
এদেশের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্প খাতের অবদান অনেক। পোশাক শিল্প খাতটি গত ত্রিশ বছরের অধিককাল ধরে এদেশের মূল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। পোশাক শিল্পখাতকে কেন্দ্র করে এদেশের নারী শ্রমিকদের উত্থান। তারা নারী ক্ষমতায়ন সৃষ্টির ক্ষেত্রে নীরব বিপ্লব তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এই খাতের উন্নয়নের সিংহভাগ কৃতিত্ব বেসরকারি উদ্যোক্তাদের। পোশাক শিল্প খাতকে যথাযথ প্রণোদনা দেয়া গেলে এবং এই খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আনা গেলে দেশের প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পাবে। তবে বৈদেশিক বিনিয়োগ আনার প্রধান দু'টো শর্ত হচ্ছে রাজনৈতিক সংঘাতমুক্ত পরিবেশ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন। রাজনৈতিক সংঘাতমুক্ত পরিবেশ না হলে বিদেশি বিনিয়োগ দূরে থাক, দেশি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহী হবেন না। অন্যায়ে সহযোগী না হলে দল বেঁধে আজ যারা অপমান করছেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় তারা ভুল করে থাকেন।
বাংলাদেশের পেছনে ফেরার কোন অবকাশ নেই। অর্থনীতিকে সুন্দরভাবে চলতে দিতে হলে অবশ্যই একটি যথাযথ গণতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় এগিয়ে নিতে হবে। গত একচলি্লশ বছরে বাংলাদেশের অর্জন অনেক। কিন্তু এতে আত্মপ্রসাদের কোন সুযোগ নেই। মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে এখনো আমরা উন্নীত হতে পারিনি। মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে উন্নীত হওয়া যেমন জরুরি হয়ে পড়েছে তেমনি সবার জন্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়েছে। মানবাধিকার বিভিন্ন পর্যায়ে লংঘিত হচ্ছে। কেবল সরকারি বা রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে নয় বরং জোর যার মুল্লুক তার পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। দেশের অবস্থা হয়েছে সূক্ষ্ম তরবারীর উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মত। বর্তমানে যে হারে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে তা যদি এখনই স্তিমিত না করা যায় তবে দাবানলের মত প্রজ্বলিত হতে পারে। কালিমালিপ্ত হতে পারে আমাদের অর্থনীতির অগ্রযাত্রার পথ। তবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উচ্চ ঋণের সুদের হার সমস্যার সৃষ্টি করছে। এ সুদের হার হ্রাস করা দরকার।
দেশের একজন নাগরিক হিসাবে প্রত্যাশা করব, জনগণের মনের ভাষা নিশ্চয়ই আমাদের চেয়ে রাজনীতিবিদেরা ভাল বুঝবেন। আগুন নিয়ে খেলা না করে বরং আপনারা জনকল্যাণের জন্যে যেভাবে ত্যাগ-তিতিক্ষা করার মন-মানসিকতার কথা বলে থাকেন, তা বাস্তবায়ন হলে ভাল হয়। সবার ঊধর্ে্ব এ দেশ, এ দেশের জনগণ। কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের কাছে রাষ্ট্রের উন্নয়ন স্থবির হয়ে যেতে পারে না। ঘোলা জলে মাছ শিকার যাদের উদ্দেশ্য, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ভর করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠানই যাদের মুখ্য উদ্দেশ্য তাদের মন-মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। যে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়েছিল এক বুক রক্তের বিনিময়ে সেদেশের অর্জন মিথ্যে হতে পারে না। অর্থনীতির ইতিহাসে দেখা যায় অনেক রাষ্ট্রই মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি উচ্চ হারে নিয়ে পরে নিচে পড়ে যায়। আমাদের দেশে গত দু' দশকে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এক্ষণে এটি আরো উপরের দিকে নিয়ে যাওয়া দরকার ট্রিক্যাল ডাউন এফেক্ট নয়- বরং সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলা বাঞ্ছনীয়। প্রকৃত ঋণগ্রহীতারা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং এনজিও থেকে তাদের চাহিদা অনুসারে ঋণ পায় সে ব্যবস্থা থাকা উচিত। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতিময়তা আনতে হলে, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ পড়ে তুলতে হবে। জনকল্যাণে বিষয়টি মাথায় থাকলে সহিংসতা যেমন রোধ করা যায় তেমনি সমাজকল্যাণের বিষয়টি চলে আসে। নিজ নিজ অধিকারবোধ থেকে কর্তব্য সৃষ্টি হয়। দল চালাতে গিয়ে অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় দিলে শেষ পর্যন্ত তা জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়। সরকারি হোক, বিরোধী দলই হোক যখন যে দল অন্যায় করেছে তারা জনগণের সাথে সংশ্রবহীন হয়ে পড়েছে। পেশীশক্তির জয় সাময়িক। যে কোন ধরনের অন্যায়-আচরণ, আইন-শৃংখলা বাহিনীর উপর আক্রমণ, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি সবই দূর করা বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়েছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে উঠবে অসাম্প্রদায়িক চেতনার সাথে; শৃংখলামুক্ত অথচ শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে। দুভার্গ্য যে, কষ্ট করে যারা বিদেশ থেকে অর্থ প্রেরণ করেন তাদের কথা কখনো রাষ্ট্রযন্ত্র সচরাচর ভাবেন না। অথচ চলতি অর্থ বৎসরে প্রবাসীরা চৌদ্দ বিলিয়ন ডলার দেশে প্রেরণ করবে। আরাম-আয়েশে জীবন যাপনে যারা অভ্যস্ত তারা লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে দুর্বৃত্তায়নের চরম বিকাশ ঘটায়। পত্রিকান্তরের রিপোর্টে যে ধরনের সচিত্র আক্রমণের বিবরণ দেখা যায় তাতে কষ্ট লাগে, মায়া লাগে আইন-শৃংখলা বাহিনীর জন্যে। একই সাথে শংকা জাগে, আমরা যারা সাধারণ মানুষ তাদের জানমালের নিরাপত্তা কোথায়? এমন করে চলতে থাকলে দেশ যে নাইজেরিয়া কিংবা সুদান বা সোমালিয়াতে রূপান্তরিত হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়?
বাংলাদেশের সকল বাসিন্দা অর্থনৈতিক সুফল পাক এই প্রত্যাশা করছি। ক্ষুদ্র নৃতাত্তি্বক গোষ্ঠী (অবশ্যই পাহাড়ীরা প্রকৃত ইতিহাস অনুসারে আদিবাসী নয়) এবং বাঙালি সবাই যেন শান্তিপূর্ণভাবে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারে সেজন্যে ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়নের প্রয়াস গ্রহণ করতে হবে। এদেশের আম-জনতার প্রত্যাশা খুব স্বল্প আর সেটি পূরণ করতে দল মত নির্বিশেষে সকল রাজনীতিবিদ সহনশীলতার পরিচয় দিবেন বলে বিশ্বাস করি। আমাদের দেশের সকল দলেরই তা করা উচিত।
++লেখক :ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়্যাল ইকোনমিস্ট। বিভাগীয় প্রধান, ব্যবসা বিভাগ, প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
ই-মেইল:চরঢ়ঁষনফ@মসধরষ.পড়স