কেবল পেশাদারিত্বের প্রতি গুরুত্বারোপের আহ্বান
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ১৬:১২
আমাদের চিকিৎসকগণ প্রত্যক্ষভাবে মানবতার সেবায় নিয়োজিত। এই পেশা কোনোভাবেই অন্যান্য পেশার মতো নয়। সুতরাং এটাই কাঙ্ক্ষিত যে, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনকে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদ, মতপার্থক্যের সংগঠনে পরিণত না করে পুরাপুরি পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুযোগ বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এ বিষয়ে কোনোপ্রকার ব্যতিক্রমধর্মিতা বা শৈথিল্য প্রদর্শন পেশার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর পরিপন্থী হবে। তা হবে সর্বতোভাবে অনৈতিক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত।
আমরা চাই, বিএমএকে এমন একটি সংগঠনে পরিণত করা হোক যেখানে অবৈধ, অনুচিত সুযোগ-সুবিধে আদায় বা লাভের সামান্যতম ব্যবস্থা না থাকে। অথচ এর মাধ্যমে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসেলের অনেক লজ্জাকর নজির অনেকের জানা আছে। দলীয় প্রভাব বিস্তার করে পদোন্নতি, ভালো জায়গায় পোস্টিং, বিদেশে প্রশিক্ষণ ইত্যাদি তো সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি বলতে গেলে ওপেন সিক্রেট।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) এবং বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে ডক্টর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সমর্থকগণ বৈধ-অবৈধ, উচিত-অনুচিত সুযোগ গ্রহণ, সুবিধে আদায়ের সার্বক্ষণিক প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন। এর ফলে যোগ্য ব্যক্তিরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং প্রায় ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে অনুপযুক্ত ব্যক্তিরা তাদের কাঁধে চেপে বসেন। ফলে সবখানে একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ-পারিপাশ্বর্িকতার সৃষ্টি হয়।
অথচ পেশাজীবী চিকিৎসকদের একমাত্র সংগঠন হিসেবে বিএমএ'র অনেক কাজ অপরিহার্য দায়িত্ব। প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, বিভিন্ন ক্ষেত্রে টেকনিশিয়ান নিয়োগ, চিকিৎসকদের আবশ্যকীয় প্রশিক্ষণ, প্রয়োজন মোতাবেক ওষুধের সরবরাহ, রোগীদের সেবার মান বৃদ্ধি ইত্যাদি ব্যাপারে এই সংগঠন প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করতে পারে। এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বস্তুত, বিএমএ যথাযথঃ ভূমিকা পালন করলে সরকারি চিকিৎসালয়ে বরাদ্দকৃত ওষুধ চুরি, রোগীদের খাদ্য নিয়ে দুর্নীতি, অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারির দায়িত্বে অবহেলা, চিকিৎসাধীন রোগীদের প্রতি অনুচিত আচরণ ইত্যাদি কোনোটাই সম্ভব নয়। কাজেই এই সংগঠন আমাদের চিকিৎসা প্রশাসনে একটা যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু তা না করে এই সংগঠনকে প্রশ্নবিদ্ধ কাজে, সংকীর্ণ স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা দুর্ভাগ্যজনক। এটা মোটেও সমীচীন নয়।
বিএমএ পেশাজীবী চিকিৎসকদের একমাত্র জাতীয় সংগঠন। সকলপ্রকার রাজনৈতিক সংকীর্ণতা, অনুচিত চাপ, দুর্নীতি, প্রলোভন ইত্যাদিকে সর্বশক্তি দিয়ে মোকাবেলা করে এর ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে হবে। ওরকম অবস্থায় আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার যথাসম্ভব মানোন্নয়ন হবে এবং সাথে সাথে ব্যাপক অর্থে উপকৃত হবেন চিকিৎসকগণ।
বিএমএ চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত আমাদের সকলের প্রাণের সংগঠন। এই সংগঠন চিকিৎসক সমাজ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি প্রতিটি জাতীয় ইস্যুতে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে আমাদের চিকিৎসকগণ গৌরবিত ভূমিকা রাখে। প্রাসঙ্গিকভাবে আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি ডাঃ ফজলে রাবি্ব, কর্নেল ডাঃ জিয়া, ডাঃ আলিম চৌধুরী, ডাঃ শামসুদ্দিনসহ ৬৯ জন কৃতী চিকিৎসককে যারা একাত্তরে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হন। আরো স্মরণ করি শহীদ ডাঃ শামসুল আলম খান মিলনকে যিনি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে প্রাণ উৎসর্গ করে আমাদের চিরঋণী করে গেছেন। আমরা তাদের ভুলিনি।
চিকিৎসকদের এই আত্মত্যাগের আমরা গর্বিত উত্তরাধিকার। কিন্তু অভিযোগ আছে, গত জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে ভিন্ন মতাবলম্বী অনেক চিকিৎসককে শারীরিক, প্রশাসনিক ও মানসিক নির্যাতন করা হলেও বর্তমান বিএমএ তাতে পুরাপুরি নীরব থেকেছে। আরো অভিযোগ রয়েছে যে, এই সংগঠন সরকারের লেজুড়বৃত্তি করে ট্রান্সফার, পোস্টিং এবং টেন্ডারবাজির এজেন্সিতে পরিণত হয়েছে। সব অভিযোগ হয় তো সত্যি নয়। তবু উল্লেখিত সব অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
সঠিক স্বাস্থ্যনীতি ও স্বাস্থ্যখাতে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা নীতি বর্তমান সময়ের দাবি। একজন ডাক্তার চাকরির শুরুতে সহকারী সার্জন হিসেবে যোগদান করেন। অবসরের সময়ও সহকারী সার্জনই থেকে যাচ্ছেন। কেননা, স্বাস্থ্য ক্যাডারে উচ্চপদে যাওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত এবং উচ্চপদে যেতে হলে উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সরকারি কর্মকমিশন কর্তৃক মূল্যায়নের ও অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। অন্যান্য সরকারি ক্যাডারের উচ্চপদে যাওয়ার পদ্ধতি ও সুযোগ এতোখানি সংকীর্ণ নয়। স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে সরকারকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে যে চিকিৎসকেরা কর্মরত,তাদের পারিশ্রমিক ও আনুতোষিক প্রদানের ব্যাপারে আরও আন্তরিক হতে হবে। এছাড়া নার্স, ধাত্রী, মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট, ফার্মাসিস্টসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যাও চিকিৎসকদের সংখ্যার আনুপাতিক হারে বাড়াতে হবে। কেননা চিকিৎসক শুধু চিকিৎসা দেন, সার্বিক সেবা ব্যবস্থাপনা কিন্তু তাদের ওপরই নির্ভরশীল। এদের সংখ্যাল্পতা স্বাস্থ্যসেবার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। বিএমএকে এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
আজ ঊনত্রিশে নভেম্বর বিএমএ নির্বাচন। আমার প্রত্যাশা এই যে, কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সম্মানিত ভোটারগণ সৎ, নিষ্ঠাবান ও যোগ্য প্রার্থীদের সমর্থন দিয়ে এই জাতীয় সংগঠনটিকে প্রকৃত অর্থে জনকল্যাণমূলক করে গড়ে তোলার কাজে ভূমিকা রাখবেন। চিকিৎসা সেবাকে আরো অনেক বিস্তৃত করতে হবে। সে জন্য গড়ে তুলতে হবে আরো বেশ কয়েকটি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। আমাদের আরো অনেক চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান প্রয়োজন। সে লক্ষ্য অর্জনে বিএমএকে একটি অত্যন্ত কার্যকর, শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত করতে হবে। ঊনত্রিশে নভেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে আমাদের সে সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
++লেখক :হূদরোগ বিশেষজ্ঞ
ইমেইল: ফৎ.ৎবুধঁষ২০০৯@মসধরষ.পড়স