শোক সন্তাপ এবং নিরন্তর ব্যর্থ বিলাপ
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ১৬:১৯
ক. "এই যে আকাশ দিগন্ত মাঠ/ স্বপ্ন সবুজ মাটি/ নীরবে মৃত্যু গেড়েছে এখানে ঘাঁটি।" কবির এ উচ্চারিত মৃত্যু আশুলিয়ার 'বাধ্যতামূলক মৃত্যুর' স্মরণে নয়, অথবা চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে ফ্লাইওভারের "ইচ্ছাকৃত মৃত্যুর' স্মরণে নয়। এ কবিতা বাংলাদেশের আবহমান প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্ভোগ স্মরণে। 'মারি ও মরক মনন্তর' স্মরণে। ঘন ঘন বন্যার আঘাতে জর্জরিত মানুষের জন্য আহাজারী করেছেন কবি। কিন্তু আজকে যে মৃত্যু বাংলাদেশের আকাশ বাতাস ভারী করে তুলেছে_ তা কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়। বরং মানবসৃষ্ট কৃত্রিম মৃত্যু। আমাদের রাজনীতির যে বাণিজ্যিকরণ এবং দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে তারই প্রমাণ এই মানবিক বিপর্যয়।
খ. প্রথম ঘটনা: সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশন গার্মেন্টস-এ আগুনে নিহতের সংখ্যা ১২৪ জনে দাঁড়িয়েছে। স্মরণকালের মর্মান্তিক এ ঘটনা কোন প্রাকৃতিক বড় বন্যা বা ভূমিকম্পজনিত কারণে নয়। দৃশ্যত মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, শনিবার (২৪ নভেম্বর ১২) সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে ঐ কারখানার নিচতলার সুতার গোডাউনে আকস্মিক অগি্নকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। প্রথমত, কারখানার লোকজন নিজেরাই আগুন নেভাবার চেষ্টা করেন। আধা ঘণ্টা পরে ফায়ার ব্রিগেডকে খবর দেয়া হয়। তখন উচ্চদাহ্য সুতার আগুন ভয়ালরূপ ধারণ করে। কারখানার কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক পর্যায় বের হতে বাধা দেয়। তারা কলাপসিবল গেট বন্ধ করে কোন শ্রমিককে নিচে নামতে দেয়নি। যখন তারা গেট খোলে তখন বের হওয়া দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।
এতো গেল তাৎক্ষণিক দুর্ভাগ্যজনক মানবিক ব্যবস্থাপনা/স্থায়ী বা কাঠামোগত ত্রুটি- আরও মারাত্মক। নির্মাণ কাজের কোন অনুমোদনই ছিল না। আপতকালীন জরুরি নির্গমন পথ ছিল না। গ্রাউন্ড ফ্লোর খালি থাকার বিধান থাকলেও সুতাভর্তি ছিল। অগি্ননির্বাপন ব্যবস্থাপনা থাকলেও ব্যবহার বিধি কারো জানা ছিল না। কারখানার আশ-পাশে পুকুর-ডোবা-জলাশয় ছিল না, যেখান থেকে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায়।
গ. দ্বিতীয় ঘটনা: একই দিন সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে নির্মাণাধীন একটি ফ্লাইওভারের গার্ডার ভেঙে বহু লোক হতাহত হয়। মৃতের সংখ্যা ১৭। তখন ঐ ফ্লাইওভারের নিচে অনেক মানুষ হাট-বাজার করছিল। ঐ সব ব্যস্ত মানুষের উপর আকস্মিকভাবেই নিপতিত হয় ভারী ও দীর্ঘ পাথর খণ্ডের মত গার্ডার। ঘটনাস্থলেই ৮ জনের লাশ দৃশ্যমান হয়। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ১০৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ শুরু করে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে। বিডিএর মাস্টার প্লানে এ ধরনের ফ্লাইওভারের প্রস্তাবনা না থাকলেও সরকারের একটি অতি উৎসাহী মহলের ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির কারণে এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। এখানে এর আগেও দুটো দুর্ঘটনা ঘটে। বিগত ২৯ জুন একটি গার্ডার ভেঙে পড়ে এক শ্রমিক আহত হয়। এরপর বিগত ২১ নভেম্বর ফ্লাইওভারের পাত পড়ে প্রাইভেট কার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুটো ঘটনাই ধামাচাপা দেয়া হয় রাজনৈতিক কারণে।
ঘ. তৃতীয় ঘটনা: অপরদিকে আশুলিয়ার ডোবনিয়ার লিমিটেড নামের একটি কারখানায় আগুন লাগায় এক মহিলা শ্রমিক। অনেক ব্যক্তিগত ক্ষোভের প্রতিশোধ নিতে সুমি নামের শ্রমিক এ কাজ করে। তাকে এ কাজের জন্য ২০ হাজার টাকা দেয়া হয় বলে সে কোর্টে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। গার্মেন্টসের গোপন ক্যামেরায় এ ঘটনা ধরা পড়ে। আগুন লাগানোর পরপরই গার্মেন্টসে কর্মরত ফায়ার ফাইটাররা দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ইতিমধ্যে যা ক্ষয়-ক্ষতি ঘটে তার পরিমাণ ২০ লাখ টাকা।
ঙ. চতুর্থ ঘটনা: গত সোমবার (২৬ নভেম্বর ১২) সকালে রাজধানীর দক্ষিণ খানের মোল্লারটেকের অফনান কমপ্লেঙ্রে দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত সোয়ান গার্মেন্টসের গোডাউন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট ২ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে সোয়ান গার্মেন্টসের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। তবে কোন প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
চ. ইতিপূর্বের ঘটনাবলী: তাজরীন ফ্যাশনের অগি্নকাণ্ড ছিল বিগত ২১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বিয়োগান্তক ঘটনা। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গার্মেন্টসে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। বিজিএমই-এর তথ্য অনুযায়ী ১৯৯০ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ২১৪টি অগি্নকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বছরওয়ারী মৃত্যুর হিসাব নিম্নরূপ:
১৯৯০-২৩, ১৯৯৫-১৪, ১৯৯৬-১২, ১৯৯৭-৪১, ১৯৯৮-১, ১৯৯৯-২, ২০০০-১২, ২০০১-২১, ২০০৪-৭, ২০০৫-২২, ২০০৬-৬৭, ২০১০-৫১।
নিকট অতীতে ২০১০ সালে ১৯টি অগি্নকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পুড়ে মারা যায় ৫১ জন। এ সময় গরীব এন্ড গরীব গার্মেন্টসে-২১ জন, ম্যাট্রিঙ্ সোয়েটারে একজন এবং হামীম গ্রুপের ২৯ জন মারা যায়। ২০১১ সালে ১৮টি অগি্নকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ইউরোপ টেঙ্রে দু'জন আগুনে পুড়ে মারা যায়।
ছ. ইতিহাসের শিক্ষাই হচ্ছে: ইতিহাস থেকে কেউ শেখে না। উপরোক্ত ঘটনাক্রম এবং নিকট অতীতের কথা তুলে ধরার মাধ্যমে এটাই বোঝাতে চাচ্ছি যে ঐ সব দুর্ঘটনা এবং মৃত্যু থেকে আমাদের সরকার, আমাদের গার্মেন্টস মালিকরা এবং আমাদের শ্রমিকরা কোন শিক্ষাই গ্রহণ করেননি। সরকারের স্পষ্টত আইন আছে। প্রয়োগ নেই। মালিকদের টাকা কামানোর খায়েশ সীমাহীন কিন্তু জীবন ও পরিবেশ রক্ষায় অতীব কৃপণ।
কৃপণতার সাথে যুক্ত হয়েছে পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং অভিজ্ঞতা। শ্রমিকরা 'কোম্পানীকা মাল দরিয়ামে ঢাল' নীতিতে বিশ্বাসী। স্থানীয় জনসাধারণ সুযোগ পেলেই লুটপাটের প্রতিযোগিতায় নামে। তাজমীরী গ্রুপের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও যারা লুটপাটের মাল খোঁজে তারা কি মানুষ? বিগত বছরগুলোতে বিশ্বব্যাপী মন্দার কারণে পাশ্চাত্যে অসন্তোষ-অস্থিরতা বেড়েছে। আর আমাদের দেশের লোকদের নীতি-নৈতিকতা হিমাঙ্কে পৌঁছেছে।
জ. বড় ধরনের সর্বনাশের ইঙ্গিতবহ: বলতে গেলে গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের রক্তপ্রবাহ। বিগত দু'দশক ধরে এটি আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান সহায়। আমাদের বিপুল জনগোষ্ঠী এ শিল্পের উপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্প আমাদের নারী জগতে রীতিমত বিপ্লব ঘটিয়েছে। আমাদের সরকার এবং শিল্পপতিদের চেষ্টায় বলা হচ্ছে বহির্বিশ্বে এখাতে চীনের পরেই আমাদের স্থান। সুতরাং আমাদের এ প্রাণপ্রবাহকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের অস্তিত্বের জন্যই অপরিহার্য। একই সপ্তাহে যেসব অগি্নকাণ্ড তথা নেতিবাচক ঘটনাবলীর প্রকোপ আমরা লক্ষ্য করলাম তা এ শিল্পের জন্য অশনিসঙ্কেত বহন করে। পাশ্চাত্য এমনিতেই আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের পরিবেশ, মজুরি এবং শিশু শ্রমিক ইত্যাদি বিষয়ে অসন্তুষ্ট, তার উপর এ ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীন দুর্ঘটনা তাদেরকে নেতিবাচক সিগনাল দেবে। আমাদের প্রতিবেশী দেশসমূহ ওত পেতে বসে আছে আমাদের অর্জনকে বর্জন করার জন্য। আমাদের যে কোন বিচ্যুতি এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আশু ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইতিমধ্যেই খবর এসেছে তাজরীন গার্মেন্টসের গ্রাহক ওয়ালমার্ট তাদের অর্ডার ক্যানসেল করেছে। এ খবর অমানবিক এবং আশু বিপদের ইঙ্গিতবহ।
ঝ. অগি্নকাণ্ডের রাজনীতিকরণ: আমাদের পাট লোপাট হয়েছে রাজনীতিবিদদের দায়িত্বহীনতার কারণে। এখন যদি গার্মেন্টস শিল্পও লোপাট হয় তাহলে রাজনীতিবিদদের কারণেই। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার এতটুকু সুযোগ হেলায় হারাতে চান না আমাদের রাজনীতিবিদরা। পাকিস্তান আমলে পাতলা খান লেনে পটকা ফুটলেও সিআইএ অথবা কেজিবিকে দায়ী করতেন রাজনীতিবিদরা। নিজেদের চেহারা আয়নায় দেখতে চাইতেন না। তেমনি আজও তারা আত্ম জিজ্ঞাসা বা আত্ম সমালোচনায় রাজী নন। দ্বৈত বৈশ্বিক ধারণার অবসানে এখন তারা নিজেরা নিজেরাই দ্বন্দ্ব-কলহে ব্যস্ত। প্রধানমন্ত্রী বললেন: পুলিশের উপর হামলার পরে এখন গার্মেন্টসে হামলা হচ্ছে। প্রবীণ নেতা তোফায়েল বললেন, "এটার মধ্যে রাজনীতি আছে।" এই মন্তব্যের জন্য তিনি চীনের প্রতি ইঙ্গিত করেন। মন্ত্রী আফসারুল আমীন বলেন: যুদ্ধাপরাধীদের রায়ের সময় যখন ঘনিয়ে আসছে তখন এ ধরনের নাশকতামূলক ঘটনা ঘটছে। এসব বক্তৃতা বিবৃতির মাধ্যমে তারা কি বোঝাতে চাচ্ছেন? তারা সরকারে আছেন। দেশের সকল দায়-দায়িত্ব তাদের। তারা যে রাজনৈতিক শক্তির প্রতি ইঙ্গিত করছেন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের আগেই যদি তারা তার প্রমাণ ধারণ করেন তা অবশ্যই জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত এবং তাদের কঠোর শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা করা উচিত।
ঞ. উপসংহার: আমরা দুটো ঘটনা বিশ্লেষণ করছি। একটি আশুলিয়ার। আর একটি চট্টগ্রামের। দুটোই বিরাট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। তাজরীন ফ্যাশন কোটি কোটি টাকার। আর বহদ্দারহাটের বিষয়টি ১০৭ কোটি টাকার মাত্র। যেহেতু রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন এবং বাণিজ্যিকীকরণ ঘটেছে সেহেতু বরাবরের মত এবারও দেখা যাবে, গঠিত কমিটিগুলোর রিপোর্ট কখনই প্রকাশিত হবে না। প্রকাশিত হলে শেয়ার মার্কেট অথবা ব্যাংক লুটপাটকারীদের সেই পরিচিত চেহারাই বেড়িয়ে আসবে। সিভিল সোসাইটির কেউ কেউ জুডিসিয়াল ইনকোয়ারির কথা বলেছেন। তাও কি কখনও প্রকাশিত হয়েছে? আমি বরং রাশেদ খান মেননের সাথে একমত: "আগের ঘটনাগুলোতে গার্মেন্টস মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার কারণেই এই মৃত্যুর মিছিল থামছে না। তাই সংসদে শুধু শোক প্রস্তাব নিলেই চলবে না, নিহতদের পরিবারকে যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, আহতদের সুচিকিৎসা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।" অবশেষে আবারও কবির ভাষায় বলি: 'এখানে মৃত্যু হানা দেয় বার বার' কেননা 'লোকচক্ষুর অন্তরালে এখানে জমেছে অন্ধকার।' আসুন আমরা সকলে সে অন্ধকার দূর করি।
লেখক :অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়