পার্বত্য শান্তি চুক্তি
প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১২, ২১:১৬
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি লইয়া মাঝে-মধ্যেই তাপ-উত্তাপ ও অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ পরিলক্ষিত হইতেছে। অথচ, পনেরো বত্সর আগে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হইয়াছিল দেশের পার্বত্যাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অধিকারসমূহ সমুন্নত করিতে এবং তাহাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যকে সামনে রাখিয়া। ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হইলে সেখানকার দীর্ঘদিনের সশস্ত্র লড়াই বা সহিংসতার পূর্ণ পরিবেশ অবসানের ব্যাপারে দেশবাসীর মনে আশার আলো জ্বলিয়া উঠিয়াছিল। এই শান্তি চুক্তিটি দেশে-বিদেশে প্রশংসাও অর্জন করে তখন। কিন্তু চুক্তির ৭৮টি ধারা সম্পূর্ণভাবে অদ্যাবধি বাস্তবায়িত না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে জন-অসন্তোষ ও উত্তেজনা বিদ্যমান রহিয়াছে। পার্বত্য অঞ্চলের আদি বাসিন্দারা তাহাদের সার্বিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম গড়িয়া তুলিলে উহার প্রতিবিধানার্থ সেখানে সেনা মোতায়েন ও সেনা অভিযান চালানো হইয়াছিল। কিন্তু উভয় পক্ষের মধ্যকার এই মুখোমুখি ও সহিংস অবস্থান পরিস্থিতিকে অধিক জটিলই করিয়া তুলিয়াছিল কেবল। এমতাবস্থায় পার্বত্য তিন জেলার অর্থাত্ দেশের প্রায় এক দশমাংশ অঞ্চলের বাসিন্দাদের অধিকারসমূহের প্রতি স্বীকৃতি প্রদানপূর্বক সেই সময়কার আওয়ামী লীগ সরকার যেই শান্তি চুক্তিটি স্বাক্ষর করিয়াছিল উহা সর্বতোভাবে বাস্তবায়িত হইলে ঐ অঞ্চলের অসন্তোষ ও হিংসা হানাহানির অবসান ঘটিতো ইহা সকলেই বোঝেন। কিন্তু সুদীর্ঘ দেড় যুগেও উপজাতি অধ্যুষিত পার্বত্যাঞ্চলের জনগণের অনেক দাবি ও অধিকার আজও প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। এই ব্যাপারে যেই টাস্কফোর্স গঠিত হইয়াছে তাহারাও আশানুরূপ কোন কর্তব্যকর্ম সম্পন্ন করিতে পারিয়াছেন এমন নজির নাই।
সংঘর্ষ, হানাহানি বা কোনপ্রকার হিংসাশ্রয়ী পথ কখনই কোন সমাধান রূপে বিবেচিত হইতে পারে না। যে কোন বিরোধ, বাদ-বিসংবাদ বা মতানৈক্য দূর করিতে আলোচনার কোন বিকল্প নাই। বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে আন্তরিকতা এবং সহমর্মিতাবোধ সৃষ্টিপূর্বক খোলা মনে আলোচনায় বসিলে সংকটের সমাধান সহজতর হইবে বৈ কি। এই শান্তি চুক্তিকে পার্বত্য অঞ্চলবাসীরা তাহাদের অধিকার রক্ষার চুক্তি হিসাবে বিবেচনা করে, ইহা ঐ জনগোষ্ঠীর জীবনবৈচিত্র্য, ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, নিজস্ব রীতি-নীতি রক্ষাসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ঐতিহাসিক সনদ। সরকারের পক্ষ হইতে ঐ চুক্তি বাস্তবায়নে অনেকদূর অগ্রসর হওয়ার কথা দাবি করা হইলেও পাহাড়ীদের এই ব্যাপারে রহিয়াছে ভিন্নমত। তাহাদের মতে, বসত, চাষাবাদ, শিক্ষা সুবিধা, ভোটার তালিকাভুক্তিসহ বিভিন্ন ব্যাপারে তাহারা অনেকাংশেই অধিকার বঞ্চিত হইয়া রহিয়াছেন।
এদিকে পার্বত্য জনসংহতি পরিষদের নেতা সন্তু লারমা সম্প্রতি যেই কথাটি বলিয়াছেন, এই ক্ষেত্রে তাহা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলিয়াছেন, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়িত না হইলে আগামীতে সেখানে অস্থিরতা ও উত্তেজনা বৃদ্ধিই পাইবে কেবল। আমরাও তাহার এই কথার সহিত একমত। মানুষকে বা কোন জনগোষ্ঠীকে অধিকার বঞ্চিত রাখিয়া যেনোতেনো প্রকারে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা সাফল্যের মুখ দেখিতে পারে না। সুতরাং কালক্ষেপণ না করিয়া পরিস্থিতির গুরুত্ব হূদয়ঙ্গম পূর্বক সেখানকার নানাবিধ সংকটের সমাধানে আন্তরিক উদ্যোগ লইতে হইবে। অযথা বিলম্ব বা অসহিষ্ণুতা কিংবা পাহাড়ীদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ সংকটকে অধিক জটিলই করিয়া তুলিবে। এমতাবস্থায় সংশ্লিষ্ট সকলের কর্তব্য হইবে ধৈর্য ধরিয়া এবং প্রকৃত সংকট চিহ্নিত করিয়া সদিচ্ছা লইয়া উহার সমাধানে ব্রতী হওয়া।