তোলা হলো আরাফাতের দেহাবশেষ

পরীক্ষার আগেই যেসব প্রশ্ন

ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বেশ কয়েক মাস আগেই। কী-ভাবে মৃত্যু হয়েছিল ফিলিস্তিনের এই অবিসংবাদিত নেতার। আট বছর পরও মৃত্যুর ‘প্রকৃত কারণ’ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। ক্যান্সার, লিভার সিরোসিস, এইডস—মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বাদ দেয়া হয়নি কোনো কিছুই। এবার সেই রহস্য ভেদ করতে চলেছে ফরেন্সিক অনুসন্ধান। ২০০৪ সালে প্যারিসের এক সামরিক হাসপাতালে মারা যান ফিলিস্তিনি লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাত। তখন থেকেই তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে কানাঘুষা শুরু হয়। সে সময়ে মরদেহের ময়নাতদন্তে বাধ সেধেছিলেন স্ত্রী সুহা। আট বছর পর তার অনুমতি মেলায় মৃত্যুর কারণ খুঁজতে অবশেষে সমাধি থেকে তোলা হলো আরাফাতের দেহাবশেষ। ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক এলাকার ফিলিস্তিনীয়দের অধিকারে থাকা রামাল্লা—হঠাত্ অসুস্থ হয়ে চিকিত্সার জন্য প্যারিস পাড়ি দেয়ার আগে এখানেই কেটেছিল ইয়াসির আরাফাতের জীবনের শেষ কয়েকটি দিন। সামরিক হাসপাতালে মারা যাওয়ার পর পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রামাল্লার মুকাতাতেই সমাহিত হন তিনি। তার পর কংক্রিট দিয়ে সমাধিস্থল ‘সিল’ করে দেয়া হয়। কঠোর নিরাপত্তার ঘেরাটোপে গত সপ্তাহে যখন বের করে আনা হচ্ছিল দেহাবশেষের অংশ তখন সেখানে হাজির ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ও রাশিয়ার তিন দল বিশেষজ্ঞ। এ ছাড়া ছিলেন ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের ফিলিস্তিন সরকারের আইনমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ফিলিস্তিন অথরিটি এবং ফাতাহ গোষ্ঠীর কয়েক জন প্রতিনিধি। আরাফাতের স্ত্রী সুহা বা তার কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত থাকার অনুমতি পাননি। ফিলিস্তিনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে—দেহাবশেষ বের করে আনার পর একটি মসজিদে তা বিশেষজ্ঞদের হাতে তুলে দেয়া হয়। বাকি দেহাবশেষ ফের পূর্ণ মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। পুরো সময়ে সংবাদমাধ্যমের কোনো প্রতিনিধি যাতে ত্রিসীমানায় আসতে না পারেন, সে দিকে বিশেষ নজর রাখা হয়েছিল। সাংবাদিকদের ‘নিরাপদ’ দূরত্বে রাখার চেষ্টা করলেও সংবাদ মাধ্যমের উদ্যোগেই ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যু নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছিল ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ। ২০০৫ সালে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর হাতে আসে আরাফাতের মেডিক্যাল রিপোর্টের একটি কপি। তাতে বলা হয়েছিল—অজ্ঞাত কোনো সংক্রমণের কারণে ৭৫ বছরের এই বিপ্লবী নায়কের দেহে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হতে শুরু করেছিল, তাতেই তার মৃত্যু হয়। যত প্রশ্ন তেজস্ক্রিয় পোলোনিয়াম-২১০ পৃথিবীতে বেশ দুষ্প্রাপ্য। তবে, মৃত্যুকালে ইয়াসের আরাফতের ব্যবহার্য সামগ্রীর মধ্যে এই রাসায়নিক যথেষ্ট পরিমাণেই মিলেছে। জামা-কাপড়, মাথার আলোয়ান, অন্তর্বাস, এমনকি টুথব্রাশেও পাওয়া গেছে বিষাক্ত তেজস্ক্রিয় পোলোনিয়াম-২১০। প্যারিসের এক সামরিক হাসপাতালে মারা যান আরাফাত। কিন্তু তার মৃত্যুর পিছনে কোনো অস্বাভাবিকতা থাকতে পারে এমন সন্দেহ তখন করা হয়নি কেন? কেনই-বা ময়নাতদন্তের জন্য জোর দেননি চিকিত্সকরা? ২০০৪ সালের অক্টোবরে আরাফাত ভর্তি হন এখানে। এক মাসের মাথায় হঠাত্ করে শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়—মারা যান তিনি। এ ঘটনায় কেন সন্দিগ্ধ হননি চিকিত্সকরা? কী কারণে আরাফাতের মৃত্যুর পর এত তাড়াতাড়ি তার ব্যবহার করা জিনিসপত্র বা দেহনিঃসৃত পদার্থ নষ্ট করা হলো? অথচ ফ্রান্সের নিয়ম অনুযায়ী—সেগুলো অন্তত ১০ বছর রেখে দেয়ার কথা। এ ছাড়া আরও একাধিক প্রশ্ন উঠছে, যা বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে ফিলিস্তিন অথরিটির কর্তাদের। বিষ প্রয়োগের জন্য মোসাদের সদস্যরা আরাফাতের কাছে গেলেন কী-ভাবে? তবে কি ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের মধ্যেই ছড়িয়ে রয়েছে মোসাদ? আরাফাতের মৃত্যুর পর সবচেয়ে উপকৃত হয়েছিলেন হামাসের সদস্যরা। দুই বছরের মধ্যেই গাজা থেকে উত্খাত হয়ে গেছে আরাফাত অনুগামী ফাতাহ গোষ্ঠী। ইসরায়েল-বিরোধিতার কারণে হামাস-ফাতাহ বৈঠকও হয়েছে একাধিকবার। তাই সন্দেহের বাইরে থাকবেন না মুহাম্মদ আল-জাহার, খালেদ মেশেল বা আল দেইফের মতো হামাস কর্তাদের সঙ্গে মাহমুদ আব্বাসের মতো আরাফাতের ছায়াসঙ্গীও। মৃত্যুরহস্যের নেপথ্যে মধ্যপ্রাচ্যের একটি সংবাদসংস্থা দাবি করেছিল—নিছক বয়স-জনিত অসুস্থতা নয়, এই নেতার মৃত্যু হয়েছে বিষপ্রয়োগে। প্রায় বছর খানেক তদন্ত চালিয়ে তারা নাকি খুঁজে পেয়েছে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য। মারা যাওয়ার কয়েক দিন আগে থেকে আরাফাতের ব্যবহার করা পোশাক, টুথব্রাশ, মাথার বিখ্যাত সেই চেক-কাটা কাফিয়েহ এবং চিরুনি পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল সুইজারল্যান্ডের গবেষণাগারে। আরাফাতের ছেড়ে যাওয়া সব কটি জিনিস থেকেই পাওয়া গেছে কিছু পরিমাণে তেজস্ক্রিয় পোলোনিয়াম-২১০। অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য এই তেজস্ক্রিয় রাসায়নিক সম্পর্কে এখনো ভালো করে কিছু জানা যায় না। তবে, খাবারের সঙ্গে উপযুক্ত পরিমাণে পোলোনিয়াম-২১০ মিশিয়ে দিলে এর ফল মারাত্মক হয় বলে জানিয়েছেন চিকিত্সকরা। কয়েক বছর আগে রাশিয়ার সাবেক গুপ্তচর আলেকজান্ডার লিভিেনঙ্কো পোলোনিয়াম বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে কেজিবির এই সাবেক সদস্য অভিযোগ করেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে। বলেন—চায়ের সঙ্গে অত্যন্ত গোপনে নাকি তাকে পোলোনিয়াম-২১০ খাওয়ানো হয়েছিল। লিভিেনঙ্কোর ঘটনা ২০০৬ সালের। এর দুই বছর আগে মারা গেছেন আরাফাত। তাই আরাফাতের মৃত্যুকে ‘স্বাভাবিক’ বলে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু সংবাদসংস্থার তদন্তের পর ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ একাংশ সাবেক নেতার মৃত্যুকে ‘খুন’ বলে চিহ্নিত করেন। অভিযোগ ওঠে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। ১৯৮৮ সালে ইসরায়েলের বৈধতা মেনে নিলেও আরাফাত কোনো দিনই তাদের বন্ধু ছিলেন না। মৃত্যুর কয়েক বছর আগেও রামাল্লায় নিজের বাড়িতে ইসরায়েলের হাতে গৃহবন্দি হয়েছিলেন তিনি। ইসরায়েলের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের ‘টার্গেট লিস্ট’-এ বহু দিন ধরেই ছিল আরাফাতের নাম। তাই, পিএলও কর্তার খুনি হিসেবে সন্দেহ তালিকায় প্রথমেই আসে মোসাদের নাম। যদিও ইসরায়েল এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। তিন দেশের বিশেষজ্ঞরা আলাদাভাবে পরীক্ষা করে কী ফল পাবেন তার ওপরেই অনেকটা নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি পরিস্থিতি।