বিকল্প খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগই কাজের পরিবেশের উন্নতি ঘটাইবে
প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:০৮
তাজরীন ফ্যাশন্স এর দুর্ঘটনার পর অনেক প্রাণহানির প্রেক্ষিতে সবাই কেমন যেন একটু নড়িয়া-চড়িয়া বসিয়াছে গার্মেন্টস কারখানার কাজের পরিবেশ নিয়া, দুর্ঘটনা রোধে গৃহীত পদক্ষেপগুলির অসারতা নিয়া, সর্বোপরি বিদেশি ক্রেতা কর্তৃক আরোপিত কম্প্লায়েন্স নিয়া। কিন্তু আমরা জানি বা অনুমান করিতে পারি কেন মালিকপক্ষ আরোপিত বিধি-নিষেধ মানিতে চাহেন না। তাহার কারণ কমপ্লায়েন্স-এর সহিত অতিরিক্ত খরচ জড়িত। অতএব, যাহাদের এই খরচ বহন করিতে হইবে তাহারা তাহাুু করিতে চাহিবেন না। ইহাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সরকারের করণীয় রহিয়াছে। তাহা হইল চাপ প্রয়োগ করিয়া মালিক পক্ষকে আরোপিত বিধি-নিষেধ মানিতে বাধ্য করা। সমস্যা হইল ইহা করিতে হইলে মালিক পক্ষ শক্তিশালী বলিয়া সরকার প্রবল বাধার সম্মুখীন হইবে। অন্যদিকে, শ্রমিকদের এই কারখানাগুলিতে কাজ করা ছাড়া তেমন বিকল্প নাই। অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগে মালিকরা ক্ষেপিয়া গেলে শ্রমিকরা বেকায়দায় পড়িবে সেই চিন্তায় সরকারকে বিধি-নিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে নমনীয় থাকিতে হইবে। তাহাছাড়া, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই খাত অতিরিক্ত চাপে পড়ুক কম্প্লায়েন্স এর কারণে তাহাও সরকার চাহেন না। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে এই খাতে শৃঙ্খলা আনিতে গেলে আমাদের শ্রমিকদের জন্য আরও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করিতে হইবে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য অন্যান্য খাত হইতে রফতানি উত্সাহিত করিতে হইবে। এককথায় বলিলে আমাদেরকে বিভিন্ন খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করিতে হইবে।
পর্যাপ্ত বিনিয়োগ আমাদেরকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করিবে। আমাদের শ্রমিকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করিবে। শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হইলে তাহাদের কাজের পরিবেশ ভাল করিতে বাধ্য হইবে মালিকপক্ষ। আজকে যাহারা কাজ করিতেছে গার্মেন্টস খাতে, তাহাদের অনেকেই কাজ করিত বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে। ঐ কাজের চেয়ে পোশাক কারখানার কাজ অধিকতর সুবিধা দেয় বলিয়া এখন কাজের লোক পাওয়া যায় না। ফলে কাজের লোক পাইতে হইলে আরও বেশি সুযোগ-সুবিধা দিতে হয়। মোটকথা, আমাদের শ্রমিকদের জন্য আরও বেশি করিয়া ভালো কাজ সৃষ্টি করিতে হইবে। সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংক তাহার এক প্রকাশিত পুস্তকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়াছে এই আরও বেশি ভালো কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর।
আমরা সবাই কমবেশি বুঝি যে, বিভিন্ন কারণে আমাদের অনেক বিনিয়োগের প্রয়োজন। তবুও বিনিয়োগ হচ্ছে না চাহিদার তুলনায়। বিনিয়োগ যে অনেক কম হইতেছে প্রয়োজনের তুলনায় তাহা কিন্তু এফবিসিসিআই প্রধানও বলিয়াছেন কয়েকদিন আগে। যদিওবা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হইতেছে বলিয়া দাবি করিয়াছেন। তবে বিনিয়োগ কম হইতেছে এই কথা সত্য। তাহার কারণ বিনিয়োগের জন্য অর্থায়নের ঘাটতি। অবকাঠামোর ঘাটতি। অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান হইতে সময় লাগিবে। কিন্তু অর্থায়নের ঘাটতি কাঙ্ক্ষিত নয়। এই ঘাটতির পেছনের মূল কারণ সঞ্চয়ের ঘাটতি। বৈদেশিক বিনিয়োগের ঘাটতি। সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ কখনোই খুব বেশি ছিল না, আমাদের সামগ্রিক বিনিয়োগের পরিমাণের তুলনায়। ফলে এইদিক থেকে আশানুরূপ সাড়া না পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কেবল কোটি মানুষের সঞ্চয় হইতে বিনিয়োগের অর্থায়নে সমস্যা হওয়ার কারণ কয়েকটি। প্রথমত, জিডিপির শতাংশের সঞ্চয়ের পরিমাণ কম। অন্যদিকে, এই সঞ্চয় সঞ্চালিত হইয়া বিনিয়োগকারীদের কাছে যাইতেছে না আশানুরূপভাবে আর্থিক খাতের অস্থিরতার জন্য। তারপর আর্থিক খাত হইতে প্রচুর পরিমাণে ধার করিয়াছে সরকার নিজে। এই ফাঁদ হইতে বাহির হইতে হইলে সরকারকে ব্যাংকিং খাত হইতে ধার করার বিকল্প খুঁজিতে হইবে। আর্থিক খাতের অস্থিরতা দূর করিতে হইবে। সঞ্চয় উত্সাহিত করার জন্য নানাবিধ স্কীম হাতে নিতে হইবে। সঞ্চয়কে বিনিয়োগে সঞ্চালিত করিয়া ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহত্ শিল্পের বিভিন্ন খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করিতে হইবে। এইসব ব্যবস্থা নিতে পারিলে প্রবৃদ্ধি বাড়িবে, দেশের উন্নয়ন হইবে, হইবে কর্মজীবী মানুষের উন্নয়ন।