[ রা জ নী তি ]

রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত

দ্বন্দ্ব রাজনীতিতে স্বাভাবিক বিষয়। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশে, প্রত্যেক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এই দ্বন্দ্বের কমবেশি উপস্থিতি রয়েছে। বস্তুত, দ্বন্দ্ব ছাড়া রাজনীতি একটি অনাকর্ষণীয়, নির্জীব বিষয়ে পরিণত হয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মতামত প্রকাশের এবং সংগঠনের অধিকার স্বীকৃতি দেয়া হয় বলে বহুমাত্রিক দ্বন্দ্বের উপস্থিতি অন্য যে কোন রাজনৈতিক ব্যবস্থার চেয়ে এই ব্যবস্থায় বেশি। বাংলাদেশের চলমান গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে প্রধান দু’টি দল আওয়ামী লীগ এবং বি.এন.পি’র মধ্যে যে দ্বন্দ্ব চলছে, তা এর ব্যতিক্রম কিছু নয়। এ প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমীর গবেষক ড. জালাল আহমেদ তাঁর পিএইচ.ডি. সন্দর্ভে (Democracy in Bangladesh: Conflicting Issues and Conflict Resolution ২০১২) যথার্থই বলেছেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, বিরোধিতার জন্য বিরোধিতার সংস্কৃতি, রাজনীতিতে সহযোগিতা এবং সমঝোতা-এর সংস্কৃতির চেয়ে বেশি। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব একদিকে যেমন রাজনীতির স্বাভাবিক বিষয়, অন্যদিকে এই দ্বন্দ্ব যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে এর জন্য জাতিকে দিতে হয় চরম রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মূল্য। যা আমরা নিকট অতীতে বিশেষ করে ১৯৯৪-৯৫ এবং ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে যে আন্দোলন হয়, সেখানে প্রত্যক্ষ করেছি। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তখনই দীর্ঘায়িত হয়, যখন এ সংকটে ভেতর থেকে কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠী এসে যোগ দেয়। এই গোষ্ঠী সবসময়ই চায়, সংকট দীর্ঘায়িত হোক, এতে করে আখেরে তারাই লাভবান হবেন। তাই রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সমাধান গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। এই লেখায় আমি চেষ্টা করবো আমাদের দেশে চলমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফলে সম্ভাব্য ক্ষতির একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ দাঁড় করাবার। এটি আমাদের রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরির জন্য অত্যাবশ্যক। দ্বিতীয় কিস্তি লেখায় আমি এই দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে আসার কী কী উপায় আমাদের সামনে রয়েছে তার একটি নৈর্ব্যক্তিক বিশ্লেষণ দেয়ার চেষ্টা করবো। শেষ পর্যায়ে সমাধানের বিষয়ে আমি আমার মতামত তুলে ধরবো। দেশে চলমান রাজনৈতিক সংকট অব্যাহত থাকলে, বিশেষ করে এই সংকট যথাসময়ে সমাধানের চেষ্টা না করলে এর নেতিবাচক প্রভাব দেশের রাজনীতি-অর্থনীতির উপর পড়তে বাধ্য। ১৯৯৪-১৯৯৫ সালে তত্কালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ অন্য দলগুলোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি যথাসময়ে না মানার ফলে বিরোধী দল কর্তৃক আহূত হরতাল/অসহযোগ আন্দোলনের ফলে আমাদের জাতীয় জীবন থেকে নষ্ট হয়ে যায় অনেক মূল্যবান শ্রমঘন্টা। অর্থনৈতিক মূল্যমানে যা ছিল অপূরণীয় ক্ষতি। ১৯৯৫ সালের প্রথম ৯ মাসে বিরোধী দল কর্তৃক ৪৪টি হরতাল (৬-৯৬ ঘন্টাব্যাপী) ডাকা হয়। এমনকি ১৯৯৫ এর নভেম্বর মাসে একটানা ৬ দিন হরতাল ডাকা হয়। বিরোধী দলের সাথে যথাসময়ে বিরোধ সমাধানের চেষ্টা না করে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বি.এন.পি. একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠান করে। ফলশ্রুতিতে রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। নির্বাচন বয়কটকে সামনে রেখে নির্বাচনের দিন বিরোধী দল হরতাল ডাকে। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় ১৯৯৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কমপক্ষে ১৭০টি নিরীহ প্রাণ ঝরে যায় এবং ৯০১৯ জন বিভিন্ন সংঘর্ষে আহত হয়। এই নিরীহ প্রাণগুলো ঝরে যাওয়ায় অনেক পরিবার অর্থনৈতিক-সামাজিক সংকটের মুখে পতিত হয়। তাদের দুঃসময়ে ক্ষমতাসীনদের দৃষ্টির অন্তরালেই থেকে যায়। দু’একজন নিহত ব্যক্তির পরিবার সরকারি আনুকূল্য পেলেও অধিকাংশের জীবন হয়ে উঠে দুর্বিসহ। কারণ, যে মানুষটি মারা গেলেন তিনিই হয়তো ছিলেন সেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। কর্মক্ষম মানুষ মরে গেলে পরিবারে যেমন বিপর্যয় নেমে আসে, তেমনি দেশ হারায় তার কর্মক্ষম নাগরিককে। রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে হরতাল মানুষের আর্থ-সামাজিক জীবনধারায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। হরতালের সময়ে গাড়ী চলাচল ব্যাহত হলে দেশের রপ্তানি কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। আর যথাসময়ে রপ্তানি করতে না পারলে আমাদের দেশ থেকে যে-সকল দেশ পণ্য আমদানি করে, তাদের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। আর আস্থা হচ্ছে আন্তঃরাষ্ট্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। আজকের এই প্রতিযোগিতামূলক দুনিয়ায় আমাদের নিজেদের কারণে ১ দিনের জন্য রপ্তানি বন্ধ থাকা অর্থনীতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। হরতালের সংস্কৃতি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য হয় যন্ত্রণাদায়ক। স্বাভাবিক দিনগুলোর চেয়ে হরতালের দিনে কারও কারও আয়-রোজগার বন্ধ থাকে। হরতালের ফলে বাজারগুলোতে কাঁচামাল আসতে পারে না। ফলে কাঁচামালের দাম যায় অনেক বেড়ে। বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে গেলে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। ফলে নিম্ন এবং মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষগুলোর দৈনন্দিন বাজার খরচের উপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। হরতালের সময়ে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্ররা আসতে পারে না বলে, ঐ দিন স্কুল-কলেজও একরকম বন্ধ থাকে। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি অফিসগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য একেবারে থাকে না, নষ্ট হয় মূল্যবান কর্ম ঘন্টা। রাজনৈতিক সংকট দীর্ঘায়িত হলে, আমাদের রাজনীতিবিদরা সমঝোতার রাজনীতিতে উদ্যোগী না হলে, সে অবস্থায় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপ ঘটে। ২০০৫-০৬ সালে আমরা দেখেছি বিদেশি রাষ্ট্রদূতগণ যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতগণ আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট সমাধানে নানারকম পরামর্শ দিয়েছে। এবারেও বিদেশি দূতাবাসের হস্তক্ষেপ লক্ষণীয়। বহিঃশক্তির দূতিয়ালির বিষয়ে কখনও কখনও আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নমনীয়তা তাদের দেশপ্রেমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত যেদিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় সেই অধিষ্ঠিত হবে—এ রকমের একটি বিষয় অনেক রাজনীতিবিদের কাছেই এখন একটি বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক সংকট সমাধানের গ্রহণযোগ্য পথ হচ্ছে আলোচনা। আর সহিংস পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য হয় তখন যখন আলোচনার সকল দুয়ার বন্ধ হয়ে যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে কেন্দ্র করে ১৯৯৪ সালে স্যার নিনিয়ান স্টিফানের মধ্যস্থতা ব্যর্থ হয়, তদানীন্তন সরকারি দল বি.এন.পি. এবং বিরোধী দল আওয়ামী লীগের ‘বিচার মানি কিন্তু তালগাছটা আমার’—এ মানসিকতার কারণে নিনিয়ান স্টিফান হাল ছেড়ে দিয়ে স্বদেশে ফিরে যান। একইভাবে ২০০৫ সালে বি.এন.পি.-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংলাপ ব্যর্থ হয় একই মানসিকতার কারণে। এই ব্যর্থতাগুলো আমাদেরকে কী শিক্ষা দেয়? আমাদের রাজনীতিবিদরা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন ঠিকই, কিন্তু তারা গণতান্ত্রিক আচরণে এখনও অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেননি। চলমান সংকটেও যদি তারা একই রকম ব্যর্থতার পরিচয় দেন, জনগণ কী তাদের রাজনীতিবিদদের প্রতি আস্থা বজায় রাখতে সক্ষম হবে। রাজনীতিবিদদের সক্ষমতা নিয়ে তারা কী সন্দিহান হবে না? এ বিষয়গুলো কী আমাদের রাজনীতিবিদরা বিবেচনায় নিচ্ছেন? এ প্রশ্ন এখন আমার মত অনেকেরই মনে জেগেছে। সবশেষে যে কথাটি বলতে চাই তা হলো যথাসময়ে সমঝোতার মাধ্যমে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সমাধান না হলে অবশেষে তা একতরফা সমাধানের পথেই এগোয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে ১৯৯৪-১৯৯৫ সালে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, বি.এন.পি. এককভাবে সে সংকটের সমাধান করেছিল। ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করেই তা করতে হয়েছিল। সংসদ গঠনের জন্য ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি একতরফা নির্বাচনও করতে হয়েছিল। আর দ্রুততার সাথে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো সংবিধানে সন্নিবেশ করা হয়, তা পরবর্তীতে নানা-বিতর্কের জন্ম দেয়। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামো বিচার বিভাগকে রাজনীতিকিকরণের পথ তৈরি করে দেয়। ২০০৭-২০০৮ সালের সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই কাঠামোর বৈধতাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই ১৯৯৬ সালে একতরফাভাবে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল—এটি সুচিন্তিত ছিল না। এর ইতিবাচক-নেতিবাচক দিকগুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লে¬ষণ না করেই এটি করা হয়েছিল। যার ফলে আমরা দেখি ২০০৭-২০০৮ সালে দেশে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টিতে এই ব্যবস্থা ভূমিকা রাখে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে একদিকে বিরোধী দল বি.এন.পি. অনড়, অন্যদিকে এই ব্যবস্থা ফিরিয়ে না আনার ব্যাপারে আওয়ামী লীগও অনমনীয়। এই অবস্থান থেকে অনুমান করা যায় সামনের দিনগুলোতে হরতাল হবে, বাড়বে সহিংসতা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্রমশই দুর্বল হবে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিক গতি হবে শ্লথ। তাই আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব যত দ্রুত এই সংকট সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন ততই জাতির জন্য মঙ্গল। এখনই তা করার শ্রেষ্ঠ সময়।  লেখক :সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়