কোপ-১৮ এবং প্রত্যাশাসমূহ

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় (বিশেষত গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্রা কমানোয়) বিশ্বের বিভিন্ন দেশ গত শতক থেকেই সচেষ্ট হয়ে ওঠে এবং সেই প্রচেষ্টা নব্বই দশকে একটি গাঠনিক রূপ রাভ করে কিওটো প্রটোকল সহ জলবায়ু পরির্বতন মোকাবেলায় বিভিন্ন চুক্তি সমূহের অগ্রগতি, করনীয়, এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী উন্নত দেশ সমূহের জন্য কিছু দায়ভার আরোপ করাসহ আরও কিছু উদ্দেশ্য নিয়ে সম্মেলনটি শুরু হবে। সম্মেলনটি ঘিরে আমাদের মত উন্নয়শীল দেশ পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে ভুক্তভোগী দেশসমূহ, পরিবেশবাদী এবং সংগঠনসহ সবার মনেই কিছু আশা সেই সাথে কিছু আশঙ্কাও দানা বেঁধেছে। সম্মেলনটি কি আসলেই পরিবেশ রক্ষায় উন্নত দেশসমূহকে উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশসমূহের সাথে সঠিক সহযোগিতার প্রকৃত আশ্বাসে নিয়ে আসতে পারবে নাকি, এটিও হবে তাদের পরিবেশ রক্ষায় লোক দেখানো এবং মূলত শুধুই একটি সম্মেলন? সাধারণভাবে বলতে গেলে, এই ধরনের সম্মেলনের ফলাফল কতুটুকু উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশসমূহের আসল প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে হয় সে বিষয়ে কিছু মতানৈক্য থেকেই যায়। উন্নত দেশসমূহ যেখানে আধুনিক জীবনের সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে চলেছে সেখানে তার মাশুল দিচ্ছে আমাদের মত উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশসমূহ। ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন, প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার, গ্রিন হাউজ গ্যাসের নির্গমনের হারের ক্রমবৃদ্ধি ইত্যাদি স্বল্পোন্নত ও অনুন্নত দেশসমূহকে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার এক বিশাল চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়েছে, অথচ এর জন্য তাদের দায় শিল্পোন্নত দেশসমূহের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। আবার, পরিবেশ বিপর্যয়ের ভয়াবহ ফলাফল মোকাবেলায় স্বল্পোন্নত ও অনুন্নত দেশগুলোর ক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অন্যদিকে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় শিল্পোন্নত দেশসমূহের অনেক ভালো ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় ক্ষমতা সবই রয়েছে। শিল্পোন্নত দেশসমূহ একদিকে যেমন নিজেদের চাহিদার ক্ষেত্রে ছাড় দিতে প্রস্তুত নয় তেমনি তারা পরিবেশ রক্ষায় স্বল্পোন্নত ও অনুন্নত দেশসমূহের চাপকেও অস্বীকার করতে পারছে না। তাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের একটি ভাল প্রতিমূর্তি রক্ষা করার জন্য এই ধরনের সম্মেলনে হাজির হয়, যা কিছু প্রতিশ্রুতি আর আগামী সম্মেলন-এর রূপরেখা দিয়ে শেষ হয়। তাই দোহা সম্মেলন থেকেও খুব বেশিকিছু আশা করা মনে হয় ঠিক হবে না। চীন, ভারত, ব্রাজিলের মত দেশসমূহ একদিকে যেমন গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের মাত্রা সকলের প্রত্যাশা অনুযায়ী কমাতে ব্যর্থ। অন্যদিকে পোল্যান্ডসহ আরও কিছু দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এর পরিকল্পনা অর্জনে অসহযোগিতা করছে। আবার একই সাথে বেশকিছু উন্নত দেশ কিউটো প্রোটকল-এর ধারাসমূহ প্রকৃত অর্থে মেনে চলছে না। যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ আরও কিছু শিল্পোন্নত দেশেও কার্বনসহ গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের মাত্রা কমানোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিমাণ বৃদ্ধি ইত্যাদি আমাদেরকে কিছুটা হলেও আশু দোহা সম্মেলনের সফলতার বিষয়ে আশাবাদী করে তোলে। কাতার হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন-এর প্রথম মধ্য-প্রাচ্যের আয়োজক দেশ। সাধারণত দুই বছর আগে থেকেই নির্ধারিত হয়, পরবর্তী সম্মেলন কোথায় হবে, কিন্তু কাতারের বেলায় তা হয়েছে এক বছর আগে। কাতার-এ সম্মেলনটি হওয়ায়, মধ্যপ্রাচ্যে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে ভাবার। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ কার্বনসহ সকল গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের একটা অন্যতম বৃহত্ এলাকা। কী ধরনের ফলাফল আসবে সে বিষয়ে পরিবেশবাদীদের অনেক মতভেদ থাকতে পারে, তবে সাধারণভাবে দোহা সম্মেলন থেকে আশা করা হয়— ১। কিওটো-২ এর আলোচনাগুলোর একটা চূড়ান্ত রূপ। ২। কিওটো প্রোটকল ও বালি কর্ম পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন। ৩। ডারবান সম্মেলন-এর সিদ্ধান্তসমূহের উপর ভিত্তি করে আগামী তিন বছরের জন্য একটি সুসংগঠিত কার্য পদ্ধতি প্রণয়ন, যা ২০১৫ সালের মধ্যে দেশগুলোকে একটা নতুন শর্তের আওতায় নিয়ে আসবে। ৪। পূর্ব প্রত্যাশা অনুযায়ী ২০২০ সাল পর্যন্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস এর নিচে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসমূহের পুনর্মূল্যায়ন, পরিবর্ধন, সংযোজন ও তা বাস্তবায়ন। ৫। উন্নত দেশসমূহের অঙ্গীকারকৃত জলবায়ু তহবিল গঠনে শুধু আন্তরিকতা-ই নয়, তার বাস্তবায়ন। ৬। গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের মাত্রা কমানোয় এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সম্ভাব্য সকল ধরনের সহযোগিতার ব্যাপারে দেশসমূহের একটি চূড়ান্ত মতৈক্য। কতখানি ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত এই সম্মেলন থেকে গৃহীত হবে বা পৃথিবীকে আগামী দিনের জন্য কতটুকু বাসযোগ্য করার অঙ্গীকার আসবে তা এখন দেখার অপেক্ষায়। লেখক :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিভাগের ছাত্র