জনসংখ্যা উন্নয়নে অংশীদারিত্ব ও দক্ষিণ দক্ষিণ সহযোগিতা
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:০৩
জনসংখ্যা ও উন্নয়নে অংশীদারিত্ব শীর্ষক ২৫ সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের বহুতল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন গত ১২ নভেম্বর ২০১২ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী । ঢাকার আগারগাঁওতে ৬৪ ডেসিমেল জমি বাংলাদেশ সরকার প্রায় এক কোটি পঁয়ত্রিশ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ক্রয় করে জনসংখ্যা ও উন্নয়নে অংশীদারিত্ব শীর্ষক দক্ষিণ দক্ষিণ সহযোগিতামূলক সংস্থার বরাবরে বরাদ্দ করেন। তদুপরি বাংলাদেশ সরকার এ আন্তর্জাতিক সংস্থার বরাবরে প্রতিবছর প্রায় ২০,০০০ আমেরিকান ডলার অনুদান করে আসছে। প্রায় ১৬ বছর পর এ সংস্থাটি তাদের বরাবরে প্রতিশ্রুত স্থান লাভের প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে।জনসংখ্যা ও উন্নয়নে অংশীদারিত্ব শীর্ষক এ সংস্থা বাংলাদেশে অবস্থিত আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা কেন্দ্র এবং এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় পল্লী উন্নয়ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের অনুরূপ একটি সংস্থা, যা প্রকারান্তরে বাংলাদেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশের গৌরবময় স্বীকৃতি। এ তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কেন্দ্রীয় কার্যালয় বাংলাদেশে অবস্থানের অর্থ হচ্ছে স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও পল্লী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম অনুঘটক এবং পথ নির্দেশক হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে, যা তৃতীয় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থানকে সৌরভে গৌরবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে।
বাংলাদেশকে কিভাবে দক্ষিণ দক্ষিণ সহযোগিতার অন্যতম দৃষ্টান্ত, জনসংখ্যা ও উন্নয়নে অংশীদারিত্ব শীর্ষক একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে তার কিছুটা প্রেক্ষাপট আলোচনা করার প্রয়োজন আছে। ১৯৯৪ সালে কায়রোতে জনসংখ্যা ও উন্নয়ন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সন্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ বিশ্ব সন্মেলনে জনসংখ্যা বিষয়ে ক্রমবর্ধমান সচেতনতা, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক অগ্রগতি, পরিবেশ সংরক্ষণ, উত্পাদন ও আচরণের পরিবর্তন সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা হয়। এ সকল ক্ষেত্রে দক্ষিণ গোলার্ধের দেশসমূহের মধ্যে অধিকতর সহযোগিতাকে কায়রো ঘোষণায় গুরুত্ব দিয়ে ১৭৯টি দেশ অনুস্বাক্ষর করে । তবে ১৯৯৩ সালে অক্টোবর মাসে ইটালির বেলাজিও শহরে দক্ষিণ দক্ষিণ সহযোগিতার একটি রূপরেখা প্রণীত হয়েছিল, যাতে উল্লেখ করা হয় যে, বেশকিছু উন্নয়নশীল দেশ জনসংখ্যা নীতি প্রণয়ন এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নে দর্শনীয় অবদান রেখেছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশও তাদের মধ্যে অন্যতম একটি দেশ। এ সকল দেশের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়, নিবিড় সহযোগিতা এবং কৌশলগত পদ্ধতির আদান-প্রদানের মাধ্যমে জনসংখ্যা ও উন্নয়ন বিষয়ক অধিক্ষেত্রসমূহে বিশেষত মহিলাদের ক্ষমতায়নে, প্রজনন স্বাস্থ্যের উন্নতি বিধানে, পরিবারের ভূমিকা বৃদ্ধিতে, শিক্ষার অধিকার আদায়ে, শরণার্থী ও অভিবাসনকারীদের অধিকার এবং আদিবাসীদের প্রতি অবহেলা প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করা হয়। তারই ফলশ্রুতি হচ্ছে জনসংখ্যা ও উন্নয়নে অংশীদারিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের অভীষ্ট লক্ষ্য ও গৃহীত কার্যক্রমের রূপরেখা।
এক পর্যায়ে স্থির হয় যে, এ প্রতিষ্ঠানের একটি প্রধান কার্যালয় থাকবে। ইন্দোনেশিয়া, তানজানিয়া, তিউনেশিয়া এবং বাংলাদেশ এর জন্য প্রার্থিতা হিসাবে আলোচনায় আসে এবং তদানীন্তন স্বাস্থ্য সচিব মরহুম সৈয়দ শামীম আহসান তার উদ্যোক্তা। রকফেলার ফাউন্ডেশন স্থান নির্বাচনের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং ১৯৯৫ সালের মাঝামাঝি সময় বাংলাদেশে একটি প্রতিনিধিদল আসেন, যার প্রধান ছিলেন কেনিয়ার প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত এমবাসেডর বুলুট, রকফেলার ফাউন্ডেশনের মিসেস সারা সেইমসহ আরো দুইজন। আমি তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংখ্যা অধিশাখার উপ-সচিব। আমার দায়িত্ব ছিল প্রতিদলকে কয়েকটি স্থান দেখানো এবং জনসংখ্যা বিষয়ক সকল তথ্য প্রদান করে বাংলাদেশের সাফল্য ও অগ্রগতিকে প্রতিষ্ঠিত করা। মহাখালীস্থ আন্তর্জাতিক উদরাময় কেন্দ্রের নিকটস্থ জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটসহ কয়েকটি স্থান তাদের দেখানো হয় এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত সকল আই ই সি প্রচারপত্র, বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতির প্রকাশনাসমূহ ইত্যাদি প্রায় এক বস্তা আমি তাদের সামনে হাজির করি। পরিশেষে এ প্রতিনিধিদলের সাথে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জনাব চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের সভা হয়। উক্ত সভায় তদানীন্তন স্বাস্থ্য সচিব মরহুম সৈয়দ আহমদ অত্যন্ত জোরালোভাবে বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে সমর্থন করে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। যাবার দিন হোটেল সোনারগাঁও-এর লবিতে মিসেস সারা সেইম আমাকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, কয়েকটি দেশ দেখলাম, তবে তোমাদের আগ্রহ ও নিবিড় সহযোগিতা এবং আতিথেয়তা দেখে আমরা সত্যিই মুগ্ধ।
তারপর ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হঠাত্ একদিন সচিব সৈয়দ আহমদ সাহেব আমাকে বিকাল ৫টায় ফোন করে বললেন আমি যেন দ্রুত তার কক্ষে যাই। আমি ভাবলাম আজ রাত ১০টা বাজবে বাসায় যেতে। বাসায় কিছু অতিথি আছে, একবারে সর্বনাশ। কিন্তু সচিবের নির্দেশ অবশ্যই পালনীয়। তদুপরি সচিব হলেন মন্ত্রণালয়ের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং প্রিন্সিপাল একাউন্টিং অফিসার। কক্ষে ঢুকতেই তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন মন্ত্রী মহোদয় আমাকে আজ কিছু বলেছেন কিনা। আমি আকাশ থেকে পড়লাম। ভাবলাম বোধ হয় কোন ভুল করে ফেলেছি, মুখ শুকিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর একটি চিঠি আমার হাতে দিয়ে বললেন, দেখ কি করতে হবে। তাতে দেখলাম জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের বাংলাদেশ প্রতিনিধি নিউইয়র্কে ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫ জনসংখ্যা ও উন্নয়ন সহযোগিতার প্রধান কার্যালয় সম্পর্কে অনুষ্ঠিতব্য সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি প্রেরণের জন্য অনুরোধ করেছেন এবং ঐ চিঠির উপর মন্ত্রী মহোদয় আমার নাম ও পদবী ভালোভাবে লিখে আমাকে মনোনয়ন করা হলো বলে সচিবকে চিঠিটি দিয়েছেন । এ জাতীয় নির্দেশ সাধারণভাবে বিরল ঘটনা।
সচিব সৈয়দ আহমেদ ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টবাদী মানুষ । তিনি বললেন, আমার ইচ্ছা ছিল যুগ্ম সচিব অথবা অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ে কাউকে পাঠানো। কিন্তু অনেক ভেবে দেখলাম কেউ পারবে না, তাদের কাছে তথ্য-উপাত্ত নেই, আবার এ বিষয়ে কথাও বলতে পারবে না। অবশেষে মন্ত্রীর সিদ্ধান্ত সঠিক বলে তোমাকে ডাকলাম। কিভাবে যাবে, কোথায় যাবে, সব ইউ এন এফ পি-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ডেকে দৈনিক ভাতাসহ আগামীদিনেই পরিষ্কার করে নিবে। বিজনেস ক্লাসের টিকেট ছাড়া তুমি যাবে না। দুইদিনের মধ্যেই তোমার বক্তব্যসহ সব কাগজপত্র আমাকে দেখাবে। আগামীদিন সকালে মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তার কোন বিশেষ উপদেশ আছে কিনা জেনে নিবে ।
আমি হাসিমুখে বের হলাম; কিন্তু ভয়ে বুক কেঁপে উঠলো। যদি নিউইয়র্কের ঐ সভায় যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে কমিটির সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের পক্ষে আনতে না পারি, তবে দেশের ক্ষতি করবো এবং আমার উপর মন্ত্রী-সচিবের আস্থা চিরতরে বিলোপ হবে। তাই চ্যালেঞ্চকে গ্রহণ করে উপস্থিত হলাম ১৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫ নিউইয়র্কে রকফেলার ফাউন্ডেশন ভবনে। মিসেস সারা সেইম আমাকে দেখেই চিনতে পারলেন এবং বসতে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাকে বললেন কমিটির সামনে যেতে। কমিটির প্রধান ইন্দোনেশিয়ার ড. হারিয়ানো, অন্য সদস্য জিম্বাবুইয়ের প্রাক্তন মন্ত্রী তিমোথি স্টাম্প এবং অপর একজন মন্ত্রী। শুরু হলো প্রশ্ন, জনসংখ্যা খাতে বাংলাদেশের অবদান, ভবিষ্যত্ কর্মসূচি, পিপিডি-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার জন্য অফিস গৃহ প্রদান, সরকারের অনুদান, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি। প্রায় দুই ঘণ্টা আলোচনা । বক্তব্য উপস্থাপনে কোথাও আমি বিচলিত বা বিব্রতবোধ করিনি। পরিশেষে যখন বললাম পিপিডির কর্মকর্তাগণ শুধু যে কূটনৈতিক সুযোগ-সুবিধা পাবেন তাই নয়, বাংলাদেশি মানুষের আতিথিয়েতা অবশ্যই তাদের মুগ্ধ করতে সক্ষম হবে। ড. হারিয়ানো হাসলেন এবং বললেন, এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই, আমার অভিজ্ঞতা আছে। আমি ছাড়া পেয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি, মিসেস সারা সেইমকে কিছু জিজ্ঞাসা করবো বলে। এমন সময় দেখি প্রাক্তন মন্ত্রী তিমোথি স্টাম্প বেরিয়ে এসেছেন। আমাকে হাত মিলিয়ে বললেন, চমত্কার হয়েছে আপনার প্রশ্নোত্তর, উপস্থাপনা । আপনার ই -মেইল নাম্বার আমাকে দিয়ে যাবেন। সত্যি বলছি, ই- মেইল নাম্বার কি আমি বুঝতেই পারিনি। পরদিন ইউএনএফপি-এর প্রধান কার্যালয়ে দেখা করলাম মি. জ্যোতি সিং- এর সাথে। তিনি মিসেস সারা সেইমের সাথে কথা বলে আমাকে বললেন, এ কেন্দ্র বাংলাদেশে হবে। মহানন্দে পরদিন সোজা জেএফকে বিমানবন্দরে হাজির হলাম। উঠলাম ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বিমানে সঠিক সময়ে। উপরে উঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘোষণা হলো আমাদের বিমানে আগুন ধরেছে। নামিয়ে দিল সকলকে জেএফকে বিমানবন্ন্দরে। আমি বিজনেস লাউঞ্জে অপেক্ষা করছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘোষণা হলো বিজনেস ক্লাস ও প্রথম শ্রেণির যাত্রীদের লন্ডনে কানেকটিং ফ্লাইট ধরার জন্য কনকর্ড বিমানে যেতে হবে। দ্রুত গিয়ে উঠলাম কনকর্ডে। শব্দের ছেয়ে দ্রুতগামী বিমানে। দেশে ফিরে সচিব ও মন্ত্রী মহোদয়কে সব জানালাম। তারা সব কিছু শুনে খুশী হলেন। কিছুদিন পরই আমি যুগ্ম সচিব হয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে বদলি হয়ে যাই।
বর্তমানে জনসংখ্যা উন্নয়নে অংশীদারিত্ব শীর্ষক এ সংস্থার সদস্য দেশের সংখ্যা ১০ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২৫-এ উন্নীত হয়েছে। কাজের পরিধির বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশের দায়িত্ব হবে সংগঠনের বিকাশে এবং তার সকল কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা প্রদান করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে বিকশিত করতে সহযোগিতা করা। এমন একটি প্রাপ্তির মর্যাদা যেন অক্ষুণ্ন থাকে।
লেখক :সাবেক সচিব।