[ রা জ নী তি ]

উপমহাদেশের রাজনীতি ও তরুণ নেতৃত্ব

রাজনীতিতে শেষকথা বলে কিছু নেই। তারপরও বিভিন্ন জরিপ ও সূত্র ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার পালাবদলের আভাস দেওয়া হচ্ছে। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে এতদঞ্চলে চলবে নির্বাচনী মৌসুম। সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলে নেতৃত্বেরও পরিবর্তন হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই পরিবর্তনের দোলাচলে নতুন কোন চমক আছে কি? বলা হচ্ছে, দুর্নীতি ও নানা কেলেঙ্কারির বোঝা মাথায় নিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদান্তে ভারতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোটের ভরাডুবি হবে। ইতোমধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় ইউপিএ জোট হোঁচট খেয়েছে। সেক্ষেত্রে এনডিএ নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ক্ষমতার মসনদে আসতে পারে এবং জনপ্রিয়তার কারণে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতে পারেন। এমতাবস্থায় অলৌকিক কোন ঘটনা না ঘটলে গান্ধি পরিবারের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী রাহুল গান্ধিকে আরেকটা টার্ম অপেক্ষা করতে হবে। ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী রাহুল গান্ধী এখন দলীয় ফোরামে কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত। এজন্য আগামী ১৪ ডিসেম্বর দিল্লীতে ডাকা হয়েছে রাজনৈতিক সম্মেলন। অন্যদিকে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের প্রধান ও সাবেক ক্রিকেট তারকা ইমরান খান পাকিস্তানের নেতৃত্বে আসতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী তার জনপ্রিয়তাও এখন তুঙ্গে। নরেন্দ্র মোদি বা ইমরান খানের আবির্ভাবে ভারত ও পাকিস্তানে বিখ্যাত ও নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক পরিবারগুলি কি হুমকির মুখে পড়বে? বাংলাদেশই বা কোনপথে হাঁটবে তা পর্যালোচনার দাবি রাখে। তবে রাহুল গান্ধির ন্যায় তুলনামূলক তরুণ ও নতুন নেতৃত্ব এলে উপমহাদেশের রাজনীতিতে গুণগত কোন পরিবর্তন আসলেও আসতে পারে। খোলনলচে বদলের কথা বলা হয়তো সংগত হবে না। কেননা, এসব নামি পরিবারের সদস্যরা কেউ বিপ্লবী নন। তবে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বহুলাংশে বদলে যেতে পারে। বিশ্বঅর্থনীতির ন্যায় বিশ্বক্ষমতাও এখন গোটা এশিয়াকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এই প্রেক্ষিতে দক্ষিণ এশিয়াসহ ভারতীয় উপমহাদেশে অনেক অবিসংবাদিত নেতার জন্মের অপেক্ষায় আছি আমরা। আমাদের উপমহাদেশের রাজনীতিতে কয়েকটি পরিবারের ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। একে আমরা বামপন্থিদের ন্যায় পরিবারতন্ত্র বলতে চাই না। কেননা এসব পরিবারের সদস্যরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করে সরাসরি জনগণের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আরোহণ করেন। প্রায়শ বলা হয়, আমরা দুই নেত্রীর ( শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া) কাছে জিম্মি। কিন্তু জিম্মি অবস্থা আমরা দেশবাসী নিজেরাই সৃষ্টি করেছি নির্বাচনের সময় তাদের পক্ষে ভোটের বাক্স ভরে দিয়ে। এটা হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ বা জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামল নয়। ঐতিহ্যগত পরিবারের সদস্যরা নির্বাচিত হয়েই ক্ষমতায় আসছেন। প্রকৃতপক্ষে দুর্নীতির এত অপবাদ দেওয়ার পরও তৃণমূলের মানুষ বঙ্গবন্ধু, জিয়া, গান্ধী বা ভুট্টো বলতে অন্ধ। তাদের পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সাধারণত যারা এসব ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারগুলির বিপক্ষে গলাবাজি করেন, ভোটে দাঁড়ালে তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হবার আশংকাই সর্বাধিক। বাংলাদেশের প্রথিতযশা আইনজীবী ড. কামাল হোসেন কিংবা ক্লিন ইমেজের অধিকারী ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীও এর থেকে বেরিয়ে বিশেষ ফায়দা লাভ করতে পারেননি। গণতান্ত্রিক দৃষ্টিতে আমরা বলতে পারি, যতদিন সাধারণ জনগণ তাদের প্রতি সমর্থন জুগিয়ে যাবেন, ততদিন উপমহাদেশে এই সব পরিবারের কোন নড়চড় হবে না। পার্টির নিয়মিত কাউন্সিলের মাধ্যমে সঠিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বৈধতা অর্জন করলে তাতে দোষের কিছু নেই বা থাকতে পারে না। প্লেটো ‘দার্শনিক রাজা’ (Philosopher King) তত্ত্বে বলেছেন যে, দার্শনিক রাজা নির্ণীত হবেন জন্মের ভিত্তিতে (There are some who are naturally fitted to be philosophers and to rule. The Republic, Book-V, New York, 1942) আবার সক্রেটিস বলেছেন, They only shall rule who know . অর্থাত্ তারাই শাসন করবেন যারা শাসন করতে জানেন। সুতরাং রাজনৈতিক পারিবারের সন্তানরা শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত ও অভিজ্ঞ হবেন এটাই স্বাভাবিক। প্রথমে পাকিস্তানের কথাই ধরা যাক। ‘পাকিস্তানের রাজনীতিতে নাম লেখাতে যাচ্ছেন ফাতিমা ভুট্টো’, গত সোমবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়েছে এই বিশেষ খবরটি। এর মাধ্যমে পাকিস্তানের রাজনীতিতে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ফাতিমা ভুট্টো সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর ভাতিজি। তার বাবা মুর্তজা ভুট্টো। আর সত্মা গিনওয়া ভুট্টো পাকিস্তান পিপলস পার্টির ভগ্নাংশ পাকিস্তান পিপলস পার্টি- শহীদ ভুট্টো (পিপিপি-এসবি)’র প্রধান। বলাবাহুল্য, এই দলেই ফাতিমা ভুট্টো নাম লিখাতে যাচ্ছেন। ৩০ বছর বয়সী এই নারীর চেহারায় বেনজির ভুট্টোর অনেক সাদৃশ্য আছে। মূলত আগামী বছরের মে মাসে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হবে সাধারণ নির্বাচন। আর নির্বাচনকে সামনে রেখেই এ ধরনের সমীকরণ চলছে। এর কিছুদিন আগে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টোর ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হন। নির্বাচনকে সামনে রেখে তারও প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশারফের আমলে রাওয়ালপিণ্ডিতে জনসভা শেষে সভাস্থল ত্যাগের সময় বেনজীর ভুট্টোকে প্রকাশ্যভাবে গুলি করে ও আত্মঘাতী বোমা হামলায় হত্যা করা হয়। তারপর পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন বিলাওয়াল। তখন তার বয়স ছিল সবেমাত্র ১৯। এই অল্প বয়সে পারমাণবিক শক্তিধর একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলের হাল ধরার ঘটনা নিঃসন্দেহে খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। যদিও এ পর্যন্ত পার্টির সকল ধকল পিতা ও পাকিস্তানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারিই সামলে নিচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে, এটাই হচ্ছে এতদঞ্চলের রাজনীতির বাস্তবতা। তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরাও তাকে নেতা হিসেবে সানন্দে মেনে নিয়েছেন। লন্ডনে লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ততার কারণে তিনি রাজনীতিতে সময় দিতে পারছেন না। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণায় সশরীরে তার উপস্থিতি না থাকলে কি চলে? ভুট্টো পরিবারের উপস্থিতি ছাড়া নির্বাচনে পিপিপি ভাল করতে পারবে না। তাই শুধু বিলাওয়ালই নয়, বেনজীর ভুট্টোর অপর দুই সন্তান বখতওয়ার (২২) ও আসিফাকেও (১৯) নির্বাচনী প্রচারণায় দেখা যেতে পারে। তাদের এখন প্রশিক্ষণের পর্ব চলছে। ত্যাগী নেতারা তাদেরকে পিপিপির ভবিষ্যত্ নেতা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। ঠিক যেভাবে মোগল সম্রাট আকবরকে গড়ে তুলেছিলেন উপদেষ্টা বৈরাম খাঁ। ১৫৫৬ সালে পিতা সম্রাট হুমায়ুনের মৃত্যুর সময় আকবরের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। কিন্তু রাহুল গান্ধির ন্যায় বিলাওয়ালের জন্যও কোন সুখবর নেই। জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় ব্যর্থ, অপশাসন, দুর্নীতি, নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক দুরবস্থা প্রভৃতি কারণে পিপিপির দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এরই মধ্যে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর আশীর্বাদপুষ্ট বিচার বিভাগের সাথে টানাপোড়েনে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়েছে সৈয়দ ইউসুফ রাজা গিলানিকে। জারদারির বিরুদ্ধে মামলা পুনরুজ্জীবিত করতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফও আছেন চাপের মুখে। এ অবস্থায় দেশের প্রধান নির্বাহী হতে বিলাওয়ালকে আরো একটি বা দুটি টার্ম অপেক্ষা করতেই হবে। এদিকে বাংলাদেশের বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঈদ-উল-আজহার পর যখন ভারত সফর করেন, তখন ভারতে কংগ্রেসের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে কেন্দ্রে মন্ত্রিসভায় রদবদল করা হয়। আসন্ন বিধানসভা ও পরের লোকসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এই রদবদলের আগে সোনিয়া গান্ধি রাহুল গান্ধিকে কোন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে চমকে দেবেন বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু নানা বিবেচনায় তাকে কোন দায়িত্ব দেয়া হয়নি। তবে মন্ত্রিসভার রদবদলের ক্ষেত্রে রাহুলের চাওয়া-পাওয়াকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তার পছন্দের ইয়ং বিগ্রেড বিভিন্ন দায়িত্ব পেয়েছেন। তাদের মধ্যে সচিন পাইলট (জন্ম-১৯৭৭) ও মিলিন্দ মুরলী দেওরা (জন্ম-১৯৭৬) অন্যতম। আগেই বলা হয়েছে, কংগ্রেস যখন আবার ক্ষমতায় আসবে, তখন রাহুল গান্ধিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে রাহুল গান্ধির পাশাপাশি রাজনীতিতে বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধির ভবিষ্যত্ও উজ্জ্বল। তার চেহারার সাথে দাদি ইন্দিরা গান্ধির হুবহু মিল আছে, যা সাধারণ জনগণের মাঝে আলাদা আবেদন তৈরি করছে। কংগ্রেসের প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপিতেও আছেন গান্ধি পরিবারের তরুণ নেতা বরুন গান্ধি। কিছুদিন আগে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বড় পুত্র তারেক রহমান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘দুর্নীতি দুর্নীতি দুর্নীতি বলে কিছু মানুষ চিত্কার করে, কিন্তু বাস্তবে তারেক রহমান অত্যন্ত সত্ভাবে জীবন যাপন করেছে। সততার সঙ্গে চলেছে। তার তেমন কোন সম্পদ নেই’ (ইত্তেফাক, ২১ নভেম্বর ২০১২)। নিজপুত্র সম্পর্কে হঠাত্ সততার এই সার্টিফিকেট কেন দেওয়া হল? ২০০৭ সালের ৭ মার্চ তত্কালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তারেক রহমানকে গ্রেফতার করে। অতঃপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণের শর্তে গ্রেফতারকৃত বেগম জিয়াকে মুক্তি দেয়া হয়। একই সঙ্গে তার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকে মুক্তি দিয়ে উন্নত চিকিত্সার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়। সাধারণত চিকিত্সা নিতে এত বছর লাগার কথা নয়। আসলে এটা হল রাজনৈতিক নির্বাসন। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদের শেষপ্রান্তে ও জনপ্রিয়তা নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যে খালেদা জিয়া সম্প্রতি দুই আঞ্চলিক শক্তি চীন ও ভারত সফর করেছেন। উভয় দেশে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে। এরপরই তারেক রহমানের ৪৮তম জন্মদিন সারাদেশে বেশ ঘটা করে পালন করেছে বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলি। এতে বোঝা যায়, আগামীর রাজনীতিতে তারেক রহমানের ভূমিকা জোরদার হবে। তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৪ সালের ২০ নভেম্বর। তিনি ১৯৯৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগদান করেন। গত চার দলীয় জোট সরকারের আমলে অর্থনৈতিক উন্নয়নে তার বগুড়া মডেল আন্তর্জাকিতভাবে খ্যাতি অর্জন করে। এবার জন্মদিন পালনের সময় বিএনপির কোন কোন সিনিয়র নেতা তারেক রহমানকে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিভিন্ন বক্তৃতা ও বিবৃতিতে। এমনিতেই তিনি বর্তমানে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান। অর্থাত্ দলে বেগম জিয়ার পরই তার অবস্থান। ২০০৯ সালে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে অনুপস্থিত থেকেও তিনি সর্বসম্মতিক্রমে এ পদ লাভ করেন। এই প্রেক্ষিতে বেগম জিয়ার নিজপুত্রের প্রশংসায় সরকারি দল নড়েচড়ে বসে। তার প্রমাণ হল, বেগম জিয়ার দুই ছেলের মামলাগুলি পুনরুজ্জীবিত করা। এরপরই দুদক কোকোর পাচারকৃত অর্থ সিঙ্গাপুর থেকে আনার দাবি করে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ব্যাপক প্রভাব জেনেই প্রতিপক্ষকের পয়লা টার্গেট হয় এই পরিবার। এখানে ওয়ান ইলেভেনের সাথে রাজনৈতিক অপকৌশলের কোন পার্থক্য নেই। এখানে রাষ্ট্রের কোন পদে দায়িত্ব পালন না করেও দুর্নীতির অপবাদ দেওয়া যায় বিস্ময়করভাবে। অথচ যার সাইন-স্বাক্ষরে দুর্নীতি হয় তিনিই তো প্রধানত এজন্য দায়ী হওয়ার কথা। তাই কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকে না বলেই মামলাগুলি হয় অত্যন্ত ঠুনকো ও নিম্নমানের। মামলার গতিমতি ও প্রকৃতি বিচার-বিশ্লেষণ করলেও তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। মূলত পরিবারকে হেয় করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করাই তার মূল উদ্দেশ্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তনয় সজীব ওয়াজেদ জয়ের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। একটি বিরোধী দলীয় পত্রিকা তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে ইস্যু তৈরি করলে শেষপর্যন্ত ঐ পত্রিকার সম্পাদককে (ভারপ্রাপ্ত) গ্রেফতার করা হয়। যখনই রাজনীতিতে তারেক রহমান কিংবা সজীব ওয়াজেদ জয়ের জোরালো ভূমিকা গ্রহণের কথা শোনা যায়, তখনই দুরভিসন্ধিমূলক ও নোংরা রাজনীতির অপপ্রয়াস চলে। আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে জয়েরও জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে তিনি আমেরিকায় অবস্থান করছেন। নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিঞার পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং ও পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে উচ্চ ডিগ্রি লাভকারী। তার জন্ম ২৭ জুলাই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ২০০৭ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ২৫০ জন ইয়ং গ্লোবাল লিডারের তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত করে। বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগ সভাপতির উপদেষ্টা এবং আইটি প্রফেশনাল হিসেবে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে তার সুচিন্তিত পরামর্শ কাজ করছে বলে জানা যায়। জয়ের পাশাপাশি শেখ হাসিনা তনয়া সায়মা ওয়াজেদ পুতুলেরও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। পুতল যেন বাংলাদেশের প্রিয়াঙ্কা গান্ধি। তিনি পেশায় একজন ফিজিসিয়ান। ইতোমধ্যে অটেসটিক শিশুদের নিয়ে কাজ করে আন্তর্জাতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং পেশাগতভাবেই তিনি অগ্রসর হচ্ছেন। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হন আমাদের দুই সম্মানিত নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। তারা স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে প্রয়াত স্বামী ও পিতার ইমেজকে কাজে লাগিয়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। তাদের শাসনামলে মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসরণ করায় অর্থনীতি এগিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক উন্নয়ন সেভাবে হয়নি বললেই চলে। বিশেষত ক্ষমতার পালাবদল বারবার কন্টকাকীর্ণ হয়েছে। এতে বেড়েছে রক্তপাত, অবিশ্বাস, সন্দেহ, অনাস্থা ও জনগণের নিরাপত্তার অভাব। বর্তমানেও আমরা এরকম এক ক্রান্তিলগ্নে উপনীত হয়েছি। অথচ শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতার হস্তান্তর গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত। কিন্তু দুই নেত্রী এক্ষেত্রে আমাদেরকে কোন আশার বাণী শোনাতে পারছেন না। বরং রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপ নগ্নভাবে বাড়ছে। ২০০৫ সালের ১১ ডিসেম্বর মানবজমিন আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তারেক রহমান বলেন, ‘স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের জন্য পরিচালিত দুই দুটি যুদ্ধে বিজয় অর্জন করলেও বাংলাদেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনীতির ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে, সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না’। এই আত্মোপলদ্ধি যদি সঠিক হয়, তাহলে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের তরুণ নেতৃত্ব থেকে আমরা ভাল কিছু আশা করতেই পারি। দুই বেগমের জায়গায় দুই মিস্টারের বাংলাদেশ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন সাধন করে তাও অনেকের দেখার ও আগ্রহের বিষয়। অনুরূপভাবে উপমহাদেশেও এ ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনই কাম্য। লেখক : সাংবাদিক e-mail : faijulislam81@gmail.com