প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দীন আহমদ বলিয়াছেন যে, তাহারা কাহারও এজেন্ডা বাস্তবায়ন করিতে আসেন নাই। কাজের মধ্য দিয়াই তাহারা প্রমাণ করিয়া দিতে চাহেন যে, বর্তমান কমিশন কতটা স্বচ্ছ ও দক্ষ । গত মঙ্গলবার বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিনিধি দলের সাথে সংলাপকালে তিনি এই বার্তা প্রদান করেন । মাননীয় সিইসির এহেন দৃঢ়তাপূর্ণ উচ্চারণ বাহবা পাইবার মত নিঃসন্দেহে। করিতে না পারিলেও বলিতে পারা; সেও কম কিসে ! তারপরেও ‘কিন্তু’ থাকিয়া যায়, সামনে চলিয়া আসে কিছু অনুপেক্ষণীয় প্রশ্ন। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। ইহার এজেন্ডা তো একটাই; সর্বতো অর্থে নিরপেক্ষ ও সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা। এই লক্ষ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল পক্ষের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করিবার দায়িত্বও নির্বাচন কমিশনের। ইহার বাহিরে গিয়া নির্বাচন কমিশনের অন্য কাহারও ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা এজেন্ডা বাস্তবায়নের কথা আসে কি করিয়া! তাহারপরেও কথা উঠে। আর কথা যখন উঠিয়াছে, এমনকি খোদ সিইসিকেও যখন ঘটা করিয়া এই কথাটি বলিতে শোনা যায়, তখন ভাবিতে দোষ কী ‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়।’ নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়া দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হইবার পর হইতে এই পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হইয়াছে পাঁচটি সাধারণ নির্বাচন। ইহার মধ্যে এমন একটি ইলেকশনও হয় নাই, যাহার স্বচ্ছতা লইয়া কমবেশি প্রশ্ন উঠে নাই। নির্বাচন কমিশন, বিশেষত সিইসির নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হইয়াছে বারেবারে। সেনা সমর্থিত জরুরি অবস্থার সরকারের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশন ১৩০টি সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্বিন্যাস করিয়া ঢাকায় আসনসংখ্যা বাড়াইয়া দেয়। আগের ১৩টির স্থলে ২০টি করা হয়। বোধগম্য কারণেই ইহার ফলে রাজধানীর বাহিরে আসন কমিয়া যায়। উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে দেখা দেয় বৈষম্য। পুনর্বিন্যস্ত নির্বাচনী এলাকাসমূহের জনসাধারণকেও পড়িতে হইয়াছে বিড়ম্বনাকর পরিস্থিতির মধ্যে। এই বিষয়ে দৈনিক ইত্তেফাকে ইতিপূর্বে একাধিক রিপোর্ট প্রকাশিত হইয়াছে। এইদিকে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে অনু্ষ্ঠিত সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সেই পুনর্বিন্যস্ত সংসদীয় এলাকা বহাল না রাখিবার পক্ষে মত দিয়াছে। পক্ষান্তরে সেই ব্যবস্থায় লাভবান হইয়াছেন বলিয়া মনে করেন যাহারা, তাহারা স্পষ্ট করিয়াই জানাইয়া দিয়াছেন যে, তাহারা জরুরি অবস্থায় করা পুনর্বিন্যাস বহাল রাখিবার পক্ষপাতী। এই অবস্থায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশন কি করিবেন, কোন দিকে যাইবেন, তাহা দেখিবার বিষয়ই বটে! তবে দেশবাসীর যে অভিজ্ঞতা; তাহাতে নির্বাচন কমিশন তাহার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে কুণ্ঠাবোধ করিবে না, এমনটি বিশ্বাস করা সহজ নয়্। সিইসি ও তাঁহার সহকর্মীদের অনেকেই আসিয়াছেন জনপ্রশাসন হইতে। প্রশাসনের কর্মকর্তা হিসাবে তিনি বা তাঁহারা দক্ষ ও মেধাবী বলিয়া ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে বৈকি! কিন্তু ইহাও অসত্য নয় যে, তাহারা সঙ্গে লইয়া আসিয়াছেন ব্যুরোক্র্যাটিক মানসিকতা। যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাহারা নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করিতে অভ্যস্ত। তদুপরি নেকনজর আকর্ষণের প্রবণতা তাহাদের অনেকের মধ্যেই প্রবল। এই বাস্তবতায় আমাদের সিইসি কাহারও এজেন্ডা বাস্তবায়ন করিতে আসেন নাই বলিয়া আশ্বস্ত করিলেও, কার্যে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বাস নাই।