১৯৭১
মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানজনক
অবস্থান চাই
প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৪৫
মুক্তিযুদ্ধ আমরা করেছি একটি স্বাধীন সার্বভৌম অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের জন্য; কিন্তু জাতীয় স্বাধীনতা রাষ্ট্রীয় সাফল্যই হচ্ছে বিশাল অর্জন। এ বিশাল অর্জনের জন্য নেতৃত্ব দিতে জাতীয় জীবনে যেমন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতার দরকার হয়, তেমনি আদর্শবান ও একজন দেশপ্রেমিক জীবন উত্সর্গকারী জাতীয় নেতা অপরিহার্য হয়ে উঠে পৃথিবীর যতগুলো দেশ স্বাধীন হয়েছে তাদের প্রত্যেকের জন্যই। যেমন- লেনিন, আব্রাহম লিংকন, মাও সে তুং, মহাত্মা গান্ধী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ফিদেল ক্যাস্ট্রো, ড. সুকর্ণ, হোচিমিন, আলেন্দে, ক্যান্ট, মার্টিন লুথার কিং, বাগস হোগেল, কোঁথে, মিল, কার্লমার্কস, গৌকি, চে গুয়েভার, এঞ্জেল্স প্রমুখ। তারা পৃথিবীতে প্রত্যেকেই নিজ নিজ দেশের জন্য, জাতির জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়েও আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে দেশ ও জাতির চিন্তা করেছেন, দেশ ও জাতির কল্যাণ করেছেন। আর তখনই কেবল তিনি জাতীয় নেতাতে পরিণত হয়েছেন। জুলিয়াস সিজারের বিশ্বাস ছিল যে, যুদ্ধে অবশ্যই জেতা সম্ভব। তিনি তার সেনাদের নিয়ে গল প্রণালী পার হয়ে ইংল্যান্ডে পৌঁছে তার সেনাদের জাহাজ থেকে তীরে অবতরণ করান। অতঃপর সমস্ত জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেন। সৈন্যদল দেখলো, যেসব জাহাজে তারা এসেছিল সবই আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে গেল। তিনি বোঝালেন এখান থেকে আর ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। অবশ্যই যুদ্ধে জিততে হবে, অথবা মরতে হবে। কিন্তু মরণের চেয়ে যুদ্ধে জেতা শ্রেয়। সে যুদ্ধে তার সেনাদের জয় হয়েছিল। ঠিক তেমনি বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ৭ মার্চ ১৯৭১-এর ভাষণে বলেই ফেললেন—আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই শত্রুর মোকাবিল করতে হবে।
১৯৭১ সালে সেই মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আজকের দিনে চাঁদপুরমুক্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধে চাঁদপুরের যেমন হাজার হাজার জাতীয় বীর মুক্তিযোদ্ধার জন্মভূমি, তেমনি আবার কিছু অসভ্য পাকিস্তানিদের দালাল হিসেবে অগ্নিসংযোগ, হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, রাহাজানিতে ব্যস্ত ছিল। অনেক বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও মেঘনাপাড়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতীয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি মেজর জেনারেল আবদুর রহিমের সেনাবাহিনীকে হিট এন্ড রান পলিসির মাধ্যমে সর্বদা ব্যস্ত রেখেছিল। এমনকি সম্মুখযুদ্ধ হয়েছে ৩৮-৩৯টির মতো। যে সমস্ত গ্রামে-স্থানে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছি যেসব স্থানের এবং গ্রামের নামানুযায়ী আমি মাত্র কয়েকটি যুদ্ধের নাম উল্লেখ করছি।
১. চাষী আলীর যুদ্ধ, ২. পাইকপাড়ার যুদ্ধ, ৩. কালির বাজারের যুদ্ধ, ৪. গল্লাক বাজারের যুদ্ধ, ৫. রূপসার যুদ্ধ, ৬. রঘুনাথপুর বাজারের যুদ্ধ, ৭. লাকমারার যুদ্ধ, ৮. বলাখালের যুদ্ধ, ৯. মহাময়া বাজারের পূর্ব দিকের জমজমিয়া ব্রিজ ডেমোলেশন এন্ড ফায়ারের যুদ্ধ, ১০. কালিয়াতলার যুদ্ধ, ১১. পানিয়ালার যুদ্ধ, ১২. উঘারিয়ার যুদ্ধ, ১৩. সূচীপাড়ার যুদ্ধ, ১৪. ঠাকুর বাজারের যুদ্ধ, ১৫. নরিংপুরের যুদ্ধ, ১৬. গন্ধবপুরের যুদ্ধ, ১৭. বাবুরহাটের যুদ্ধ, ১৮. গোয়ালমারীর যুদ্ধ, ১৯. ঘোগার যুদ্ধ, ২০. ফুলচোয়ার যুদ্ধ, ২১. নাগদার যুদ্ধ, ২২. চেঙ্গাচরের যুদ্ধ, ২৩. কচুয়া থানা আক্রমণের যুদ্ধ, ২৪. মহনপুরের যুদ্ধ, ২৫. গজারিয়া মতলবের মাঝামাঝি মধ্য নদীতে যুদ্ধ, ২৬. চরাচ্ছরের যুদ্ধ, ২৭. মেহের স্টেশনের যুদ্ধ, ২৮. মেহারকালীবাড়ীর যুদ্ধ, ২৯. পুরানবাজারের যুদ্ধ, ৩০. অবশেষে ত্রিমুখী আক্রমণে চাঁদপুরের যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পতন ঘটে ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর। রাতভর যুদ্ধ চলে অগ্রাভিজানের ভিত্তিতে। অবশেষে ভোর ৫টায় অর্থাত্ ৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে চাঁদপুর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীমুক্ত হয়।
এখানে একটি কথা অবশ্যই উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমাদের চাঁদপুরের মেঘনাপাড়ের বাঙালি পুরুষদের পাশাপাশি মা-বোনেরা, মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। এছাড়াও পাকিস্তান হানাদার বাহিনী এখানে হাজার হাজার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, সম্পদ লুটপাট করেছে, এমনকি হাজার হাজার নারী ধর্ষণ করেছে এবং প্রায় ৭০-৮০ হাজার মানুষ হত্যা করেছে। এর জন্য দায়ী যেমনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, তেমনি বাঙালি রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির লোকেরা।
অদূরদর্শিতার কারণে গত ৪০ বছরেও চাঁদপুরে মুক্তিযুদ্ধ করা কোন মুক্তিযোদ্ধা আজও জাতীয় সংসদ সদস্য হননি। চাঁদপুরে মুক্তিযুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধারা কেউ ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদ সদস্য এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কেন্দ্রীয় নেতা হবেন কিনা জানি না। সকল রাজনৈতিক দল থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বহিষ্কার চাই, জাতীয় সংসদে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোনয়ন চাই, জাতীয় রাজনীতিতে এবং জেলার রাজনীতিতে মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মানজনক অবস্থান চাই। চাঁদপুরসহ সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণ চাই। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমরা সকল মুক্তিযোদ্ধাই মহান মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের অবদানকে আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। আমাদের নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার আহবান জানাচ্ছি।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর
কমান্ডার্স ফোরামের নেতা