বিবেকবর্জিত পেশাদারিত্ব এবং প্রশ্নবিদ্ধ মর্যাদা
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:২৬
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাশাসক এবং তাদের এদেশীয় সহযোগিদের নির্মমতা বিশ্ব মানবতার মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। ইতিহাসের ক্যানভাসে সে বর্বরতা আজো তপ্ত-তাজা-অমলিন। সে দগদগে ক্ষত সারিয়ে আজো এ জাতি আত্মমর্যাদায় আসীন হতে পেরেছে কিনা সেটি একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে আছে। অথচ এরই মধ্যে সমাজের বিভিন্ন স্তরে নানানভাবে আমরাই আমাদের মর্যাদাকে অভিনব কায়দায় প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছি। আমাদের ব্যাংকিং জগতে ঘটে যাওয়া সামপ্রতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রতি দৃষ্টিপাত করছি। একটি “হলমার্ক” ঘটনা অস্থিতিশীল করে তুলেছে গোটা ব্যাংকিং জগেক। ব্যাংকিং পেশার মর্যাদাকে করে তুলেছে প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যাংকিং পেশায় নিয়োজিত সকল ব্যাংকারের পেশাদারিত্বে কালিমা লেপন করে ব্যাংকিং পেশার মর্যাদাকে করেছে দলিত।
আর তাই অনাস্থা আর অবিশ্বাসের দোলায় দুলছে বাংলাদেশের সমগ্র ব্যাংকিং ব্যবস্থা। সমাজের মর্যাদাশীল হাতেগোনা ক’টি পেশার মধ্যে ব্যাংকিং অন্যতম। সমাজের সবচাইতে আস্থাশীল অংশের অংশীদারিত্ব করে এই ব্যাংকিং পেশার মানুষগুলো। শুনেছি এক সময় একজন ব্যাংকারের ভিজিটিং কার্ড এ যুগের ক্রেডিট কার্ডের মর্যাদা পেতো। এই যাবতীয় অবক্ষয়ের যুগেও শোনা যায় মেয়ের বর হিসেবে, বাড়ির ভাড়াটিয়া হিসেবে, প্রতিবেশী হিসেবে, এমনকি ক্লাব-সমিতির সদস্য হিসেবেও ব্যাংকার হলো অগ্রগণ্য- তার বিশ্বাসযোগ্যতা, সততা, বিনম্র ব্যবহার, রুচিবোধ, শৃঙ্খলাবোধ সর্বোপরি আপাদমস্তক পেশাদারিত্বের জন্য। হায়! আজ সব বুঝি লুপ্ত হতে বসেছে। আপনি যদি ব্যাংকার হয়ে থাকেন হয়তো এতক্ষণে ভাবছেন যে, একটি “হলমার্ক” ঘটনা ও একজন বা কতিপয় ব্যাংকারকে দিয়ে আমি সমগ্র ব্যাংকিং ও ব্যাংকারদের চিত্রায়িত করছি। না, নিশ্চয়ই নয়। অবশ্যই সোনালী ব্যাংক রূপসী বাংলার ব্যাংকিং গোটা দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার চেহারা নয়। নিশ্চয়ই ঐ শাখার ব্যবস্থাপক এবং এ ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ মানেই গোটা ব্যাংকিং পেশায় নিয়োজিত মানুষগুলো নয়। বরং একথা আস্থার সঙ্গে বলার যথেষ্ট যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে যে, এখনো যথার্থ পেশাদারী ব্যাংকারের সংখ্যাই অনেক বেশি। এখনো এমন ব্যাংকারের সংখ্যাই ঢের বেশি যারা তাদের পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে আগলে রাখে, নিরবচ্ছিন্নভাবে উদ্যোক্তা যোগান দিয়ে অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখে।
কিন্তু একটু নির্মোহচিত্তে ভেবে দেখুন- ঐ ক’জনও তো আমাদেরই কেউ না কেউ। ফলে সমসাময়িক সমাজে ব্যাংকার হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে একটু হলেও কি কষ্ট বা কুণ্ঠাবোধ হয় না? নিশ্চয়ই হয়। একজন ব্যাংকারের সামাজিক মর্যাদা, তার পেশাদারিত্ব কি আজ প্রশ্নবিদ্ধ নয়? কেউ কেউ হয়তো বলবেন- দুর্নীতি তো হচ্ছে সবখানেই, ব্যাংকিং খাতের এই দুর্নীতি নিয়ে হৈ চৈটা একটু বেশি। প্রিয় পাঠক, খুবই সত্যি কথা। কিন্তু দেখুন, দুর্নীতি মানেই দুর্নীতি- সে ছোট কিংবা বড় যা-ই হোক না কেন। তারচেয়ে বড় কথা হলো, ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি-জালিয়াতি খুব দ্রুত সবাইকে নাড়া দেয়। কারণ, সমাজ ও অর্থনীতিতে এর প্রতিক্রিয়া সর্বব্যাপী এবং সর্বগ্রাসী।
ভাবতে অবাক লাগে, একজন পেশাদার ব্যাংকারের পক্ষে এটি কি আদৌ সম্ভব? এমন অপরিণামদর্শী লোভ তথা উচ্চাভিলাষ কি কখনো কোন পেশাদার ব্যাংকারকে পরাজিত করতে পারে? অবশ্যই না। কোন পেশাদার ব্যাংকার কি তার মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে পেশাদারিত্বকে পণ্যের মতো বিকিয়ে দিতে পারে? অসম্ভব। তাহলে কিভাবে “হলমার্ক” কিংবা অপরাপর ঘটনার মঞ্চায়ন হলো? হলো এ কারণেই যে, আসলে আমাদের পেশাদারিত্বে ঘূন ধরেছে। আমাদের আত্মমর্যাদাবোধে পচন ধরেছে। আমাদের নৈতিক মূল্যবোধে স্খলন দেখা দিয়েছে। নইলে, একজন পেশাদার মানুষ কতটা নিচে নিজেকে নামিয়ে আনতে পারে? কতটা অন্ধত্ববরণ না করলে অর্থের প্রয়োজনের সীমারেখা টানতে ভুলে যায় একজন মানুষ।
আসলে এ ধরনের বিবেকবর্জিত দক্ষতা কোন অর্থেই পেশাদারিত্ব হতে পারে না। সুতরাং একজন ব্যক্তি বা কতিপয় ব্যক্তি বিশেষের বিবেকবর্জিত অপেশাদার কর্মকাণ্ডের গ্লানিময় দায় সমগ্র ব্যাংকার সমাজ বয়ে বেড়াবে- এটা হতে পারে না। অতএব, ঘুরে দাঁড়াতে হবে। সকল কুণ্ঠাবোধ ঝেড়ে ফেলে ঋজু ভঙ্গিতে এ পেশায় নিয়োজিত সকলকে নিজেদের অস্তিত্বের ঘোষণা দিতে হবে। আমানতকারী, ব্যবসায়ী তথা ব্যাংক এবং ব্যাংকিংয়ের সাথে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে আস্থায় আনতে হবে- সবার মধ্যে বিশ্বাস জাগাতে হবে যে, সোনালী ব্যাংক- রূপসী বাংলা, হলমার্ক কিংবা সামপ্রতিক সময়ের এ ঘটনাগুলো কেবলই কিছু বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা মাত্র- দেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক চিত্র নয়। আর সেজন্য দরকার ব্যাংকিং পেশায় নিয়োজিত সকল পেশাজীবীর দৃঢ় মনোবল।
লেখক :ব্যাংকার