স্মরণ
সেলিনা বাহার জামান—প্রাণ দিয়ে দ্বার খুলেছেন যিনি
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:২৮
সেলিনা বাহার জামানের ৬৪ বছরের মৃত্যুটা সকলের কাছে খুবই আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল তবুও মনে হয় তিনি মৃত্যুকে জয় করে হয়ে আছেন মৃত্যুঞ্জয়ী।
তার সাথে প্রথম পরিচয়ের দিনটি স্মরণ করতে গেলে আজো মনে পড়ে প্রখ্যাত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাক্ষর করা রবীন্দ্রনাথের সেই দুটি গানের লাইন। সেলিনা বাহার জামানের কালো বাঁধানো অটোগ্রাফ খাতায় তিনি লিখেছিলেন—
‘আমি হাত দিয়ে দ্বার খুলবো নাগো,
গান দিয়ে দ্বার খোলাবো।’
—কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় (১৪.১১.৮৬)
এই দুর্লভ অটোগ্রাফটি আমার দেখার সুযোগ হয়েছিলো ১৯৮৬ সালে নভেম্বর মাসের ১১ তারিখে ধানমন্ডি লেকের ধারে মিসেস নূরুন্নাহার আবেদিনের বাসার এক অনুষ্ঠানে। সেদিন সেলিনা আপা ৩০ বছর আগের সেই অটোগ্রাফ খাতাটি নিয়ে এসেছিলেন সেই অনুষ্ঠানে কনিকাদির আর একটি অটোগ্রাফ নেয়ার জন্য।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। পঞ্চাশের দশকে সকল প্রতিবন্ধকতা জয় করে তার অভিনয়, উপস্থাপনা, কবিতা আবৃত্তি, নৃত্যনাট্য পরিবেশনার বহু প্রশংসা শুনেছি সুধীজনের কাছে। সেলিনা বাহার জামান ১৯৪৯ সালে নৃত্যশিল্পী কেষ্ট পালের কাছে নাচ শিখেছিলেন। তার সাথে যুক্ত থেকে তিনি বহু নৃত্যানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। লোকনৃত্য, জিপসীনৃত্য ও শিকারী নৃত্য শেখেন তার কাছে। তখনকার মানসী (এখন নিশাত) সিনেমা হলে শিকারী নৃত্য পরিবেশন করে তিনি প্রশংসিত হন।
এক সময় তিনি শুরু করলেন কৃতীজনদের জীবনকর্ম নিয়ে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের কাজ। সরকারি কলেজের অংকের অধ্যাপক সেলিনা বাহার বহু বিখ্যাতজনের স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করে বিপুলভাবে নন্দিত হয়েছিলেন। বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া শিল্প, সাহিত্য, নারী আন্দোলন ও সাংবাদিকতায় নিবেদিত মানুষজনকে নিয়ে এই স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন। প্রয়াত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মন্ত্রী হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী ও প্রগতিশীল শিক্ষাবিদ আনোয়ারা বাহার চৌধুরীর মেয়ে এবং স্বনামখ্যাত শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী শামসুন্নাহার মাহমুদের ভাতিজী হিসেবে দেশবরেণ্য ব্যক্তিদের গভীরভাবে জানার দুর্লভ সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি শৈশব থেকেই। ফলে স্মারকগ্রন্থটি প্রকাশের কাজটি তিনি অনবদ্যভাবে করতে পেরেছিলেন। তার বাবা ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং সহচর। নজরুলের বহু দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি সেলিনা বাহারের সংগ্রহে ছিল। ১৯৯৪ সালে তাই তার সুযোগ্য সম্পাদনায় বের হয় ‘নজরুল পাণ্ডুলিপি’। নজরুল শতবার্ষিকীতে তার কাছে অতিযতনে সংরক্ষিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রায় সবগুলো সংখ্যার পুনঃমুদ্রণ করেছিলেন তিনি। নিজ ব্যয়ে একে একে বের করেছেন বহু ‘স্মারকগ্রন্থ’। এদের মধ্যে রয়েছে:জহুর হোসেন চৌধুরী, আনোয়ারা বাহার চৌধুরী, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, আবদুল ওয়াহাব, শামসুন্নাহার মাহমুদ, রোকেয়া সাখাওয়াত্ হোসেনসহ অনেকে। তার লিখিত বইয়ের মধ্যে ‘কয়েকছত্র প্রাণেরপত্র’ অনবদ্য। নেহাত্ই একগুচ্ছপত্র কিন্তু লেখকদের পরিচয় এবং সমকালীন চিত্রের ব্যবহার বইটিতে যেন প্রাণসঞ্চার করেছে। যার তুলনা মেলা ভার। সংবাদ সাময়িকীতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত স্মৃতিকথা ‘পথে চলে যেতে যেতে’ পঞ্চাশ-ষাট দশকের ঢাকার সাংস্কৃতিক জীবনেরই জলছবি। যা এই স্মৃতিকথাকে নতুন মাত্রা দান করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকা অবস্থায় এই বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজের সাংস্কৃতিক প্রবাহের নিখুঁত বর্ণনা আছে তার এই লেখায়।
সেলিনা বাহার মানুষ হিসেবে ছিলেন অতুলনীয়। তিনি সমাজকে, সমাজের মানুষকে দেখেছেন, জেনেছেন বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। তাই যেমন মানুষকে ভালবেসেছেন, তেমনি ভালবাসা পেয়েছেন। তার আকস্মিক চলে যাওয়ায় ইতিহাস প্রকাশের সেই গুরুত্বপূর্ণ ধারাটি বন্ধ হয়ে গেল, যার অভাব কাল সচেতন মানুষ অনুভব করবে প্রতিমুহূর্তে।
লেখক : সাংবাদিক ও নারী অধিকার কর্মী