রা জ নী তি
রাজপথ অবরোধ থেকে সংঘাত-সংঘর্ষের আশঙ্কা
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৩৮
পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী আজ ভোর ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দেশের সকল সড়কপথ ও রাজপথে অবস্থান নেবেন ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা। ইতোমধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সকল প্রকার যানবাহন রাস্তায় বের না করতে দেশবাসীকে আহবান জানিয়েছেন। বিএনপির অপর নেতা সাদেক হোসেন খোকাও একই কথা বলেছেন। বিএনপি নেতৃবৃন্দের কথা অনুযায়ী কেউ গাড়ি বা যানবাহন বের না করলে আজ সারাদেশে এক ধরনের হরতাল পালিত হতে যাচ্ছে- যেখানে সড়ক ও জনপথে ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের সিদ্ধান্ত ছাড়া অন্য কিছু কার্যকর থাকবে না। আজ তা হলে কেউ অফিস-আদালত বা কর্মস্থলে দুপুর ২টার আগে যাওয়ার জন্য বের হতে পারবে না। আজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষার কী হবে তাও কেউ বলতে পারছে না। দুপুর ২টার পর অবরোধ তুলে নেয়া হলে কর্মস্থলে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কারো থাকবে কিনা জানি না। তবে দিনটি এমনই এক অনিশ্চিয়তার বার্তা দিয়ে যাচ্ছে।
পত্র-পত্রিকায় আজকের রাজপথ দখলে রাখার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি ১৮ দল তথা বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে নেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাতে মনে হচ্ছে জোটের নেতাকর্মীরা রাস্তাঘাটে সকল প্রস্তুতি নিয়ে অবস্থান করবেন, তেমন কোনো রাস্তাঘাট যান চলাচলের জন্য বাকি থাকবে না। বিষয়টি বোঝা যাবে সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে যাওয়ার পর। সুতরাং সে পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আগাম কিছু বলা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। তবে এ ধরনের কর্মসূচি ১৮ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ যতোটা শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করছেন, তা শেষ পর্যন্ত কতোটা শান্তিপূর্ণ থাকবে সেই আশঙ্কাই সকল মহল থেকে করা হচ্ছে। গোটা দেশের সড়কপথ এবং শহরগুলোর রাজপথ অবরোধ করে রাখার জন্য নেত্রাকর্মীরা জড়ো হবেন, তারা খুব শান্তশিষ্ট থাকবেন তেমনটি কতোটা আশা করা যায়, ভাবা যায়, বাস্তবে ঘটবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমাদের দেশে ৫০/৬০ জন কোনো দলের কর্মী রাস্তায় যখন একটি মিছিল নিয়ে বের হয় তখন অনেকেই আতঙ্কিত থাকে, কখন কে কোন গাড়ির ওপর চড়াও হয়, ভাংচুর চালায়, আগুন ধরিয়ে দেয়। কর্মীদের রাস্তার ‘রাজা’ বনে যাওয়ার মানসিকতা মোটেও কাল্পনিক কিছু নয়। এটি হলো ঘটনার এক দিক। অন্যদিকে সরকারবিরোধী দলের রাজপথ ও সড়কপথ অবরোধের ব্যাপারে কী করবে সে ধরনের কোনো বক্তব্য স্পষ্ট করে বলেনি। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয়া হয় যে, সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সড়ক ও রাজপথ উন্মুক্ত রাখতে চাইবে। তবে দেশে যতো সংখ্যক সড়কপথ ও রাজপথ রয়েছে আমাদের দেশে ততোজন পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্য রয়েছে কিনা বলা মুশকিল। সংখ্যার দিক থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকের সংখ্যা এর চেয়ে ঢের বেশি রয়েছে। তাছাড়া এ মুহূর্তে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা বেশ সক্রিয়, ১৮ দলের আজকের কর্মসূচিতে তাদের সবাই রাস্তায় বেশ সক্রিয় থাকবে এটি ধরেই নেয়া যায়। এমনিতেই ছাত্রশিবির পুলিশের প্রতি এখন বেশ আক্রমণাত্মক অবস্থানে রয়েছে, যা প্রমাণিত সত্য। যেহেতু ১৮ দলীয় জোটের কর্মসূচি, তাই তাতে তাদের অংশগ্রহণ আরো বেশি সক্রিয় থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সুতরাং সেই পরিস্থিতিতে আজকের রাজপথ-সড়কপথ ১৮ দলের নেতাকর্মীদের দখলে রাখার কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত কতোটা শান্তিপূর্ণ থাকবে তা দেখার জন্য সকল মহল এখন অপেক্ষায় আছে। বস্তুত এই কর্মসূচিতে বিএনপি এবং জামায়াতের অংশগ্রহণই মুখ্য থাকবে। দেশের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে অন্য দু’একটি দলের খুব অল্প সংখ্যক সমর্থক রয়েছে। তারা হয়তো ঐসব এলাকায় মাঠে থাকতে পারে। তবে গোটা দেশব্যাপী রাস্তায় থাকার অবস্থানে আছে বিএনপি এবং জামায়াত-শিবির। আজকের কর্মসূচি সফল করার মূল ভরসা হচ্ছে বিএনপি এবং জামায়াত-শিবিরের কর্মী। যেহেতু বিএনপির গণভিত্তি বেশ বড়, তাই তারা সর্বত্রই কর্মসূচি সফল করতে এগিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে জামায়াত এবং ছাত্রশিবির তাদের রাজনীতির বর্তমান বিশেষ অবস্থায় ১৮ দলীয় জোটের প্ল্যাটফর্মে বিশেষভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের এই সুযোগ হাতছাড়া না করারই সম্ভাবনা বেশি। এর ফলে অবরোধ কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত কোনদিকে মোড় নেয়, সংঘাত-সংঘর্ষের দিকে মোড় নেয় কিনা- তা নিয়ে সকল মহলেই যথেষ্ট উদ্বেগ-আশঙ্কা রয়েছে। রাজপথ-সড়কপথ অবরোধ কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত কতোটা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, কে কোন দিকে এটিকে প্রবাহিত করতে তত্পর হয়ে ওঠে বোঝা ও বলা বেশ মুশকিল। এমনিতে রাস্তার কর্মসূচির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা খুব সহজ কাজ নয়। এটি বিএনপির জন্যও খুব সহজ হবে না। ইলিয়াস আলীর গুম হওয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপির আন্দোলন রাস্তায় গিয়ে শেষ পর্যন্ত গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, ড্রাইভার পুড়িয়ে মারার ঘটনায় যেভাবে জড়িয়ে পড়ে তাতে গোটা আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত জনগণের সমর্থন হারায়। সুতরাং রাস্তায় নেতাকর্মীদের নামিয়ে শেষ পর্যন্ত কমর্সূচির সফল পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে ঘরে আবার ফিরিয়ে আনা বেশ কঠিন কাজ। সেক্ষেত্রে বিরোধী দল যদি মনে করে থাকে যে, পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে গেলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে পারে, সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে এর পর কী হবে? নিশ্চয়ই একটি দেশ অন্ধকারে বেশিদিন ডুবে থাকতে পারবে না। সরকার যদি সেই সময় বড় ধরনের কোনো ভুল না করে, বাড়াবাড়ি না করে তাহলে বিরোধীরা খুব বেশি জনসমর্থন ধরে রাখতে পারবে না, বাংলাদেশে ‘তাহরির স্কয়ার’ সৃষ্টির চেষ্টাও খুব একটা সফল হওয়ার নয়। কেননা, অবরোধের কারণ যদিও তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে হচ্ছে বলে বলা হচ্ছে তাতে ১৮ দলে অন্তর্ভুক্ত সব দলের বিবেচনা কিন্তু এক রকম নয়, অন্তত এই মুহূর্তে জামায়াতের কাছে সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিচারের কাঠগড়া থেকে তাদের দলীয় নেতাদের মুক্তিতে আন্দোলন করা, দেশে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা—যার ফলে বর্তমান সরকারের পক্ষে ক্ষমতায় থাকা, দেশ পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। তাদের এমন অবস্থানের সঙ্গে বিএনপি পুরোপুরি কতোটা একমত আছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তাছাড়া দেশের বেশিরভাগ মানুষই এখন রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। ফলে দেশে তাহরির স্কয়ারের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা আপাতত সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে সংঘাত-সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা গেলেও তা খুব সাময়িক হতে বাধ্য। তাছাড়া বিজয়ের মাসের এই সময় দেশকে সেদিকে ঠেলে দেয়া কতোটা ১৮ দলের পক্ষে সম্ভব হবে তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
তবে বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে সরকারের প্রতি আজকের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে যে, তাদের কর্মসূচিতে বাধা প্রদান করা হলে হরতালের মতো কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা আসতে পারে। বিএনপির পক্ষ থেকে উচ্চারিত এমন বক্তব্য থেকে ধরে নেয়া যায় যে, ১৮ দলের আজকের রাজপথ সড়কপথ অবরোধের কর্মসূচির পর দেশে হরতাল আসতে পারে, তেমন ঘোষণা হয়তো আজই আসতে পারে। সেক্ষেত্রেও ১৬ ডিসেম্বরের আগে দেশে হরতালের ডাক দিয়ে বিএনপি কতোটা লাভবান হবে বলা মুশকিল।
অন্যদিকে আজকের ১৮ দলীয় কর্মসূচিতে সরকার নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকবে, কিছুই করবে না—তা কিন্তু ভাবার কোনো কারণ নেই, কেননা দেশের সড়ক ও রাজপথ একটি দেশে কয়েকটি দলের কর্মী-সমর্থকরা বন্ধ করে দিতে পারলে যে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে যায় তা সরকারের অস্তিত্বের জন্যই প্রশ্ন সৃষ্টি করে। সরকার তাই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে যথাসম্ভব রাস্তায় নামাতে বাধ্য হবে। অন্যদিকে ১৮ দলের নেতাকর্মীরা ঐসব রাজপথ ও সড়কপথ দখল করার চেষ্টা করবে। তা থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ১৮ দলের নেতাকর্মীদের ধাক্কাধাক্কি, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াসহ নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। যেহেতু দেশব্যাপী এই অবরোধ কর্মসূচি, তাই কোথাও না কোথাও কমবেশি সংঘর্ষ হতেই পারে, এটিকে পরিহার করা কতোটা সম্ভব হবে বলা মুশকিল। তেমন কিছু না ঘটলে দেশবাসী খুশি হবে। তবে কেউ নিশ্চিত নয় আজ দেশের কোথায় কী ঘটতে যাচ্ছে, সেসব ঘটনা থেকে আবার কোন ঘটনা জন্ম নিতে যাচ্ছে। আমাদের রাজনীতি তেমন সুবোধ অবস্থানে নেই। আজকের অবরোধ কর্মসূচির গতি-প্রকৃতি ও বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করে যে বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা যায় তা হচ্ছে, দেশে সংঘাত-সংঘর্ষের রাজনীতি ও কমর্সূচি অনেকটাই নিশ্চিত করার চেষ্টা হচ্ছে, নেতাকর্মীরা রাজপথ দখল করার চেষ্টা করবেই, পুলিশও বাধা প্রদান করবেই, তেমন বাধা দেয়া হলে সংঘাত হবে, বাধা না দিয়ে অবরোধ রাজপথে কোন দিকে মোড় নেবে—তাও বলা মুশকিল। ফলে বিষয়টিকে খুব হালকাভাবে নেয়া, দেখা ও বোঝার সুযোগ নেই। তারপরও সকলে আশা করছে ৯ ডিসেম্বর যেন শান্তিপূর্ণ থাকে, সংঘাত-সংঘর্ষের রথে যেন দেশের রাজনীতি গিয়ে না ওঠে। মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাসে শহীদগণ এমন রাজনীতি দেখে আমাদের ভর্ত্সনা করছে কিনা জানি না, তবে আমরা তাদের অভিশাপ পাওয়ার কাজই মনে হয় করছি।
++লেখক :অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক