অভিবাসনের মধ্য দিয়ে চর-দারিদ্র্য বদলে ফেলা সম্ভব
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৩৮
বাংলাদেশে যেসব দারিদ্র্য পকেট রয়েছে এর মধ্যে দ্বীপচরাঞ্চল, হাওর, উপকূলীয় অঞ্চল অন্যতম। দেশের দুর্গম দ্বীপচরাঞ্চলগুলোতে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি। খানিকটা বিচ্ছিন্ন জনপদ হওয়ার কারণে এই চরবাসী প্রায় সব ধরনের নাগরিক অধিকার থেকেই বঞ্চিত। আজীবন প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত হওয়ার কারণে দুঃখ-কষ্ট-বঞ্চনার মাত্রাও এখানে সবচেয়ে বেশি। চরবাসীর একটি বড় সমস্যা হলো-কর্মহীনতা বা কাজের সুযোগ কম। চরের বেশিরভাগ মানুষের বছরের একটা লম্বা সময় ধরে কোনো ধরনের কাজ থাকে না। ফলে অর্থনৈতিকভাবে এক বিপদসংকুল সময় তাদের কাটাতে হয়। এক কথায় চরজনগোষ্ঠীর বছর ধরে কাজ করার সুযোগ খুবই কম। মানুষের দৃশ্যমান আয়ের বিকল্প পথও এখানে সীমিত। স্বভাবতই দেশের চর এলাকাতে দারিদ্র্য বিমোচনের হার বরাবরই ধীরগতিসম্পন্ন। বলা প্রয়োজন, চরাঞ্চলের একটা বড় সমস্যা হলো-প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রায় সারাবছর ধরেই এসব এলাকাতে নদীভাঙ্গন, বালুঝড়, বন্যা, খরাসহ কোনো না কোনো ধরনের দুর্যোগ লেগেই থাকে। দুর্যোগকালে তাই মানুষগুলোকে আরো বেশি বিপদের সম্মুখীন হতে হয়।
বিভিন্ন তথ্যসূত্র মতে, চরে বসবাসরত মানুষের সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ। এসব মানুষের মধ্যে ৯৩ ভাগ মানুষ প্রায় ভূমিহীন এবং ৬০ ভাগ মানুষ নিরঙ্কুশ বা সম্পূর্ণ ভূমিহীন, যাদের নিজস্ব মালিকানায় কৃষি জমি বা বসতভিটা কোনটাই নেই। ভৌগোলিক অবস্থান অনুসারে বাংলাদেশের চরগুলো দুই ধরনের—দ্বীপচর এবং মূল ভূমির সাথে সন্নিহিত চর। অন্যদিকে স্থায়িত্ব অনুসারে-স্থায়ী বা পুরোনো চর, অস্থায়ী বা ভাঙনপ্রবণ চর রয়েছে। বাংলাদেশে নদীবক্ষে জেগে ওঠা ছোট-বড় চরের সংখ্যা অগণিত। এর মধ্যে যমুনা ও তিস্তাবক্ষে সবচেয়ে বেশি চর রয়েছে। জেলাওয়ারী বিবেচনা করলে রংপুর, লালমনিরহাট, পাবনা, রাজশাহী কুড়িগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নোয়াখালী, সিরাজগঞ্জ, পটুয়াখালী, ভোলা, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, নীলফামারী, টাঙ্গাইল, বরগুনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ীতে সবচেয়ে বেশি চর। তবে লালমনিরহাট, পাবনা, রাজশাহী, কুড়িগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রভৃতি জেলায় দ্বীপচর সবচেয়ে বেশি। এছাড়াও দেশের অসংখ্য অপ্রধান নদীতে প্রচুর ছোট-বড় চর রয়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনো চরের জমিতে যেমন মানুষের বসতি গড়ে উঠেছে, তেমনি কোনো কোনো চরের উর্বর জমিতে শুধু চাষবাস করে ফসল ফলানো হয়। আবার একেবারেই বসতিবিহীন অসংখ্য দুর্গম চরের অস্তিত্বও রয়েছে, যেখানে কোনো ধরনের বসতিই গড়ে ওঠেনি।
চরের মানুষের বেঁচে থাকা বা বেড়ে ওঠা সবই জমি এবং নদীর ওপর নির্ভরশীল। জীবন বাঁচাতে বা খাদ্যের সংস্থান মেটাতে চরের দরিদ্র মানুষ যেমন কৃষি কাজ করে থাকে, তেমনি বড় একটি অংশ পাশাপাশি মাছ ধরার সাথেও জড়িত। একই সাথে চরবাসীর আয়ের একটি বড় উত্স হলো গবাদিপশু পালন। দুর্গম দ্বীপচরগুলোতে দরিদ্র চরবাসী বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের (নদী ও জীবন, সিএলপি প্রভৃতি) সহায়তায় বর্তমানে গবাদিপশু পালন করে আয়-রোজগারের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে গরু-ছাগল এবং ভেড়া পালন করে চরবাসী অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। বিভিন্ন দুর্গম চরে বর্তমানে ক্ষুদ্র আকারেও ফার্মভিত্তিক হাঁস-মুরগি পালনও শুরু হয়েছে। তবে চরবাসীর আয়ের বড় উত্সই হলো কৃষি কাজ এবং মাছ ধরা। চরের ভূমি কৃষি কাজের জন্য খুবই উপযোগী এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এ কারণেই দেশের প্রায় প্রতিটি চরেই বিপুল পরিমাণ ধান, গম, বাদাম, রবিশস্য এবং সবজিসহ অন্যান্য ফসল উত্পাদিত হয়ে থাকে। কিন্তু চরের প্রান্তিক ভূমিহীন কৃষকেরা উত্পাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য তেমন একটা পান না। পশ্চিম-উত্তরাঞ্চলের অনেক দ্বীপচরে এখন কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের নদী ও জীবন প্রকল্পের আওতায় বাড়ি এবং তার চারপাশে বাণিজ্যিকভিত্তিতে সবজি চাষ হচ্ছে। রংপুর, লালমনিরহাট, নোয়াখালী, ভোলা, গাইবান্ধা, পাবনা এলাকার চরগুলোতে অধিকহারে ধানের ফলন হয়ে থাকে। আবার রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ এলাকার চরগুলোতে প্রচুর পরিমাণ সবজি উত্পন্ন হয়। কিন্তু চরের জমি থেকে উত্পাদিত ফসলের সুফল মোটেও ভোগ করতে পারে না ভূমিহীন চরবাসী। এর প্রধানতম কারণ হলো-চরের জমিতে তাদের আইনগত ভূমিস্বত্ব না থাকা। চরে বসবাসরত বেশিরভাগ মানুষেরই আইনগত ভূমিস্বত্ব বলে কিছু নেই। স্বভাবতই নানাবিধ রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জটিলতার সমীকরণে তাদের শ্রমের বিপরীতে প্রাপ্য আয়ের মধ্যে একটা বড় ধরনের তফাত লক্ষণীয়।
এই মুহূর্তে আমরা দেখছি মালয়েশিয়াতে নতুন করে শ্রমিক নেয়ার ক্ষেত্রে একটি পরিবেশ তৈরি হতে যাচ্ছে। সে দেশে প্রচুর শ্রমিক চাহিদা রয়েছে বলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশারফ হোসেন গত ২ নভেম্বর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণায়ের এক প্রেস ব্রিফিং-এ উল্লেখ করেন। বিশেষ করে কৃষি শ্রমিক, প্লানটেশন, নির্মাণ এবং ম্যানুফ্যাকচারিং মোট পাঁচটি খাতে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক নেয়া হবে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে মালয়েশিয়ার ৩-৫ লক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। জেলা কোটাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় মালয়েশিয়াতে শ্রমিক পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। দুই দেশের মধ্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, বেশ কম খরচে একজন শ্রমিক মালয়েশিয়াতে যেতে পারবে। বাংলাদেশে যেসব স্বল্প আয়ের এবং দরিদ্র পরিবারের তরুণরা রয়েছেন তাদের জন্য এটি এক ধরনের বড় সুযোগ। শুধু মালয়েশিয়া নয়, মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেও প্রচুর দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে।
জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি)-এর লক্ষ্যসমূহের মধ্যে অন্যতম প্রধান হচ্ছে ২০১৫ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা কমিয়ে আনা। কিন্তু আমরা বরাবরই দেখছি দেশের দারিদ্র্য পকেটগুলোতে এক্ষেত্রে খুব একটা উন্নয়ন হচ্ছে না। তুলনামূলক বিশ্লেষণেও আমরা সেটা দেখতে পাচ্ছি এরকম যে, মূল ভূখণ্ডে যেভাবে উন্নয়ন হচ্ছে সেভাবে হচ্ছে না চরাঞ্চলসহ অন্যান্য দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকাতে। আমি মনে করি, দ্বীপচরাঞ্চল থেকে দারিদ্র্য নিরসন করে চরের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করতে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং আয়ের পথ বাতলে দেয়ার বিকল্প নেই। চরদারিদ্র্য কমাতে তাই এই মুহূর্তে সরকারের একটি অন্যতম পদক্ষেপ হতে পারে চরের যুবশক্তিকে অভিবাসী হতে উদ্যোগ গ্রহণ করা। মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চরের শ্রমশক্তিকে প্রেরণে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এজন্য সরকার সুনিদিষ্ট একটি নিয়ম- নীতিমালা করতে পারে। এমনটি করা গেলে চরে বসবাসরত অতিদরিদ্র মানুষের একটা বড় অংশের ভাগ্য দ্রুতই পরবির্তন করা সম্ভব। দুঃখজনক হলেও সত্য, চরাঞ্চলের কর্মক্ষম যুব-তরুণ সমাজ চরম বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার। সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গকে আরো বেশি করে এ বিষয়ে ভাবতে হবে। তা না হলে আজীবন চরের যুব-তরুণ সমাজ দারিদ্র্যের সাথেই বসবাস করবে, এই বৃত্তের বাইরে তারা কোনোমতেই বের হতে পারবে না।
সময় অনেক পেরিয়ে গেলেও চরের শ্রমশক্তিকে নিয়ে আমরা এখনই নতুন করে ভাবতে পারি। আমরাই তাদের জন্য তৈরি করে দিতে পারি নতুন পথের সন্ধান। এমন একটি কর্মপরিকল্পনায় প্রয়োজন নতুন চিন্তা, নতুন উদ্যোগ আর সুন্দর ভাবনার সম্মিলন। বর্তমানে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে মাননীয় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশারফ হোসেন, সচিব ড. জাফর আহমেদ খান, বিএমইটির ডিজি বেগম শামসুন্নাহারসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করবো চর-দারিদ্র্য নিরসনে এমন একটি উদ্যোগকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে। কর্মসংস্থান এবং আয়-রোজগারের অভাবে চরের দরিদ্র অসহায় পরিবারে যে দুঃখ-বঞ্চনা, আহাজারি—সারাজীবন দারিদ্র্যের সাথে তাদের যে বসবাস, আসুন সেই বৃত্ত ভাংতে আমরা নতুন উদ্যোগ, পরিকল্পনা গ্রহণ করি। আসুন শ্রমে-কর্মে-সাফল্যে চরের শ্রমশক্তিকে এগিয়ে নিই। বদলে দিই চরের মানুষের জীবন।
++ লেখক :জনশক্তি রপ্তানি বিশ্লেষক এবং চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি
kirondebate@gmail.com