পাকিস্তানি ক্যাম্পে অগ্নিসংযোগ :অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ

তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া রংপুর মহানগরীর রবার্টসনগঞ্জ এলকায় আটকে পড়া পাকিস্তানিদের সঙ্গে এলাকাবাসীর তিন ঘন্টাব্যাপী সংঘর্ষ হয় গত বুধবার রাতে। হামলার সময় পাকিস্তানি ক্যাম্প ও পার্শ্ববর্তী বাঙালি এলাকায় অগ্নিসংযোগ করা হইলে প্রায় তিন শত ঘর-বাড়ি ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ভস্মীভূত হয়। ইহাছাড়া এই ঘটনায় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাসহ কমপক্ষে একশত ব্যক্তি আহত হইয়াছেন। ইহাতে তিন কোটিরও বেশি টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হইয়াছে বলিয়া জানা গিয়াছে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত ঘটনার বিবরণ হইতে জানা যায়, রবার্টসনগঞ্জ এলাকার আটেক পড়া পাকিস্তানিদের ক্যাম্প-৩ সংলগ্ন একটি বাঙালি মালিকানাধীন হোটেলে কাজ করিত ক্যাম্পে বসবাসরত এক ব্যক্তি। আকস্মিকভাবে তাহাকে চাকুরিচ্যুত করা হইলে সে তাহার পাওনা টাকা দাবি করে। কিন্তু টাকা না দিয়া হোটেল মালিক ঐ কর্মচারীকে মারধোর করিলে সংঘাতের সূত্রপাত হয়। এক পর্যায়ে ক্যাম্পের লোকজন ও এলাকাবাসী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র লইয়া একে অপরের প্রতি ঝাঁপাইয়া পড়ে। ঘটনাটি সহজেই মিটমাট করা যাইত। কিন্তু ক্যাম্পবাসী ও এলাকাবাসীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরিয়া বিদ্যমান অবিশ্বাস, অনাস্থা, বঞ্চনা ও ক্ষোভই ঘটনার মোড় পরিবর্তন করিয়া দিয়াছে। তাহাছাড়া সারাদেশে অসহিষ্ণুতা এমন পর্যায়ে পৌঁছাইয়া গিয়াছে যে, সামান্য কারণেও কথা কাটাকাটি হইতে শুরু করিয়া মারপিট, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মামলা-হামলা ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হইয়াছে। ইহা হইতে সংখ্যালঘু-সংখ্যাগরিষ্ঠ, বাঙালি-অবাঙালি আমরা কেহই পরিত্রাণ পাইতেছি না। আটকেপড়া পাকিস্তানিদের ব্যাপারে আমরা দীর্ঘদিন ধরিয়া কোন যুগোপযোগী ও ন্যায়ানুগ সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারিতেছি না ইহা সত্য। কিন্তু তাহার চাইতেও বড় বিষয় হইল, আমাদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা দিন দিন বাড়িতেছে। সাধারণত যখন দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়, সর্বত্র টেনশন ও অস্থিরতা বিরাজ করে, তখন সকলের মধ্যে একপ্রকারের ধৈর্য্যহীনতা পরিলক্ষিত হয়। আবার আর্থ-সমাজিক অবস্থার দুর্দশা ও চরম বঞ্চনায় অনেকের মধ্যে ধৈয্যের বাঁধ বালির বাঁধের ন্যায় ভাঙিয়া যায়। তবে যখন দেশে আইনের শাসন কাজ করে না ঠিকমত, তখন এরকম অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয় সবচাইতে বেশি। ছিনতাইকারী বা ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে মারা যাইতেছে অনেক তাজা প্রাণ। সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীরাও এভাবে মারা যাইতেছে আজকাল। মূলত সবখানে বিচারহীনতা ও প্রতিকার পাইবার বেদনা হইতে মানুষের মাঝে বৃদ্ধি পাইতেছে এই অসিহষ্ণুতা। আলোচ্য ঘটনায় ঐ হোটেল মালিক ভাবিয়াছে তাহার কর্মচারীর বকেয়া প্রদান না করিলে কী হয়? আমরা দেখেতেছি ,বাস্তবে কিছুই হয় না। তাই সে বেপরোয়া মনোভাব দেখাইতে পারিয়াছে সহজেই। যে দেশে শেয়ারবাজার ও সরকারি ব্যাংক হইতে জনগণের কোটি কোটি টাকা মারিয়া দিলেও কোন বিচার বা প্রতিকার হয় না, অফিস-আদালতে ফাইল আটকাইয়া জনগণের নিকট হইতে ঘুষ আদায়ে বাধ্য করিলেও কিছু হয় না, সেখানে পাওনাদারের কয়টা টাকা না দিলেই বা কি হয়-এই ভাবনা তাহাকে যে পাইয়া বসে নাই তাহাই বা কে জানে। সরকার যায় সরকার আসে, কিন্তু যাহারা বলবান, শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান, তাহারা অন্যায় করিলে তাহাদের টিকিটিও ধরা যায় না। অন্যদিকে পাকিস্তানি ক্যাম্পে বসবাসরত লোকদের ন্যায় অনেকের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকিয়া যায়, তখন তাহারা অনেক ক্ষেত্রে আইন হাতে তুলিয়া নিতে বাধ্য হয়। ইহাই হইতেছে আইনকে তাহার স্বাভাবিক গতিতে চলিতে না দেওয়ার নির্মম পরিণাম। যাহারা দেশের শাসনকর্তা, তাহাদের এসব নাগরিক দুর্ভোগ ও বঞ্চনা খুব একটা ভাবায় বলিয়া মনে হয় না। বস্তুত সমাজ ও রাষ্টে ন্যায় বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করিতে না পারিলে অসহিষ্ণু হইয়া উঠার এমন প্রবণতা বন্ধ করা যাইবে না। বলাবাহুল্য, প্রতিকারহীনতাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সকল সম্ভাবনাকে নষ্ট করিয়া দিতেছে। বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করিতেছে।