[ রা জ নী তি ]
সংঘাত নয়, চাই আস্থায় নেয়ার কৌশল
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৪৬
দেশের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে দেশের মানুষ যখন নানা আয়োজনের মধ্যদিয়ে বিজয় উত্সব উদযাপনে তত্পর তখন জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের মনে একদিকে যেমন ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে তেমনি রাজনীতিকেও করে তুলছে সংঘাতময়। ডিসেম্বর মাসে কোনো বিবেচনাতেই হরতাল এবং অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করা সমীচীন হয়েছে বলে মেনে নেয়া যায় না। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তির দাবিতে জামায়াত হরতার আহ্বান করেছিল ৪ ডিসেম্বর। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘাতক-দালালের ভূমিকা পালনের অভিযোগে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতার বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এরমধ্যে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর বিচার কার্য শেষ হয়েছে। যে কোনো দিন রায় ঘোষণা হবে। ডিসেম্বর মাসেই গোলাম আযমসহ আরো দু’-একজনের বিচারের রায় ঘোষণা হতে পারে। এ জন্য দেশের অগণিত মানুষের মধ্যে রয়েছে আগ্রহ, কৌতূহল ও চাঞ্চল্য। এই বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার জন্য, ভণ্ডুল করার জন্য জামায়াত দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ধরনের অপতত্পরতা চালাচ্ছে। বিপুল অংকের টাকা খরচ করে বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ করেছে। দেশের মধ্যেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার জন্য তারা ষড়যন্ত্রমূলক অপকাণ্ড করে চলেছে। গত মাস খানেক ধরে জামায়াত-শিবির কর্মীরা দেশজুড়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে। পুলিশ বাহিনীর ওপর চোরাগুপ্তা আক্রমণ চালিয়ে তারা তাদের শক্তির জানান দিচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায় বিএনপি নেবে না। মির্জা আলমগীরের এই বক্তব্যে রাজনৈতিক মহলে কিছুটা স্বস্তি এসেছিল। কেউ কেউ ভাবছিলেন বিএনপি হয়তো জামায়াতের সঙ্গে মাখামাখির সম্পর্ক আর রাখবে না। কিন্তু গত ৪ ডিসেম্বর জামায়াত আহূত দেশব্যাপী হরতালের প্রতি ‘নৈতিক সমর্থন’ জানিয়ে বিএনপি এটা প্রমাণ করেছে যে বিএনপি এবং জামায়াতের রাজনীতি এক ও অভিন্ন। বিএনপিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় বলে তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। অথচ যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবিতে জামায়াতের ডাকা হরতালে নৈতিক সমর্থন জানিয়ে প্রকারান্তরে বিএনপি কী যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষেই অবস্থান গ্রহণ করেনি? বিএনপিকে এই স্ববিরোধী রাজনীতির খেসারত দিতে হবে। দেশের মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ এবং সোচ্চার। এদের রক্ষার জন্য বিএনপির যে কোনো ভূমিকাই দেশবাসীর কাছে বিএনপিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে, বিএনপির জনবিচ্ছিন্নতা বাড়বে।
একথা ঠিক যে, যারা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সমর্থক, যারা একাত্তরের ঘাতক-দালালদের পক্ষে তাদের সমর্থন বিএনপির দিকেই। কিন্তু এর বাইরেও দেশে এমন অনেকে আছেন, যারা নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বলে দাবি করেন অথচ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন না, তারাও বিএনপির প্রতিই আস্থা স্থাপন করেন। এরা আবার বিএনপির জামায়াত নির্ভরতা পছন্দ করেন না। তারা চান জামায়াতের থাবা থেকে বেরিয়ে এসে বিএনপি তার নিজস্ব ধারায় এগিয়ে চলুক। কিন্তু জামায়াতের চাপে বিএনপি যদি যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে ঐ অংশের সমর্থন বিএনপিকে হারাতে হবে। জামায়াতের ভোট ব্যাংকের প্রতি নজর রেখে বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে গেলে নিজস্ব ভোট ব্যাংকে টান পড়ার আশংকা আছে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গত ৮ ডিসেম্বর এক সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়াকে ‘ভান’ আখ্যায়িত করে বলেছেন, বিরোধীদলীয় নেতা বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে যান। আবার সেই বুদ্ধিজীবীদের যারা হত্যা করেছিল, সেই যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য বিজয়ের মাসে আন্দোলনও করেন। তাহলে কী তিনি স্মৃতিসৌধে গিয়ে ভান করেন? সত্যিই যুদ্ধাপরাধের বিচার চাইলে তিনি ডিসেম্বর মাসে আন্দোলনের কর্মসূচি দিলেন কেন? আন্দোলনের জন্য বিজয়ের মাসকে বেছে নিবেন কেন?
এসব প্রশ্ন কেবল প্রধানমন্ত্রীর নয়। দেশের মানুষও বিরোধীদলীয় নেতার কাছে এসব প্রশ্ন করে জবাব চাইতে পারেন। কিন্তু তিনি তার জবাব দেবেন না। বরং উল্টো এই যুক্তি বিএনপির পক্ষ থেকে হাজির করা হচ্ছে যে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে আওয়ামী লীগও ডিসেম্বর মাসে হরতাল দিয়েছিল। আওয়ামী লীগ যেসব খারাপ বা অন্যায় করেছে সেগুলো নজির হিসেবে নিয়ে অনুসরণ করাই কী বিএনপির কাজ? নিজেদের প্রতি জনসমর্থন বাড়াতে চাইলে বিএনপিকে কুযুক্তির রাজনীতি পরিহার করতে হবে। মানুষ রেষারেষি, জেদাজেদির রাজনীতি পছন্দ করে না। মানুষ সংঘাত, সন্ত্রাস, সংঘর্ষ চায় না। শান্তি চায়, স্বস্তি চায়। আর বিএনপি ও জামায়াতের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি যে শান্তিপূর্ণ হয় না, এটা অনেকদিন থেকেই দেখা যাচ্ছে।
এই লেখাটি লিখতে বসেছি ৯ ডিসেম্বর রোববার, সকাল দশটায়, বিএনপি এবং ১৮ দলীয় জোটের ডাকা দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে। দেশের মানুষের মনে বিরাজ করছে ভীতি-আতংক, উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা। এখন পর্যন্ত যতটুকু খবর পাওয়া গেছে, তা থেকে বলা যায় এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হচ্ছে না। ভোর থেকেই নানাভাবে মানুষকে ভয়ভীতি দেখানো চলছে। গাড়িতে আগুন দিয়ে, টায়ার জ্বালিয়ে লাঠি নিয়ে দৌড়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কয়েকস্থানে গাড়িতে আগুন ধরিয়ে, ভাংচুর করে, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অবরোধ আহ্বানকারীরা জনমনে আতংক সৃষ্টি করেছেন। অবরোধ চলাকালে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অন্তত দু’জনের মৃত্যুর খবর জানতে পেরেছি। কী অমানবিক ও নিষ্ঠুরতায় মানুষ হত্যা করে রাজনৈতিক লক্ষ পূরণ করতে চাচ্ছেন আমাদের বিরোধী দলীয় নেতৃত্ব। দুপুর দুইটা পর্যন্ত অবরোধ চলার পর হয়তো বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হবে যে, দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অবরোধ পালন করে সরকারের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বিরোধী দলের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। বিএনপি এমন দাবি করলেও এটা বলতেই হবে যে, মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অবরোধ পালন করেনি। দেশের মানুষ এ ধরনের সন্ত্রাসী রাজনৈতিক কর্মসূচি মনের টানে পালন করে না। ভয়ভীতি দেখিয়ে, আতংক ছড়িয়ে তাদের এ ধরনের কর্মসূচি পালনে বাধ্য করা হয়। দেশবাসীর একাংশ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবির সমর্থক হলেও তারা হরতাল-অবরোধ করে সেই দাবি আদায়ের পক্ষে—এটা কোনোভাবেই প্রমাণ করা যাবে না। সরকার ও বিরোধী দল আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় উপনীত হবে, সেটা যদি কোনোভাবে না-ও হয়, তাহলে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির আশ্রয় নিতে হবে। পুরনো ধারার হরতাল-অবরোধের রাজনীতি ছেড়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি উদ্ভাবনে নেতৃত্বকে সৃজনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। হরতাল-অবরোধ ডাকা যদি গণতান্ত্রিক অধিকার হয়, তাহলে এগুলো উপেক্ষা করাও নিশ্চয়ই একজনের গণতান্ত্রিক অধিকার। একজনের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে আরেকজনের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা ন্যায়সঙ্গত নয়। কোনোভাবেই জোর করে মানুষের চলাচল বন্ধ করা যাবে না, গাড়ি পুড়িয়ে, ভাংচুর করে সম্পদ বিনষ্ট করা চলবে না। জীবন ও সম্পদ নাশের ধ্বংসাত্মক রাজনীতি অব্যাহত রাখলে বিরোধী দলের প্রতি জনসমর্থন বাড়বে বলে যারা মনে করেন, তারা মানুষের হূদস্পন্দন একেবারেই বুঝতে পারেন না। বিরোধী দলের নেতারা বলেছেন, দাবি আদায়ের জন্য প্রয়োজনে আরো কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে। কঠোর থেকে কঠোরতর কর্মসূচি দেয়ার অধিকার বিএনপির আছে, তবে কর্মসূচির কঠোরতা যে মানুষের মনে বিরূপতা তৈরি করে সেটাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, তারা দেশ শাসনে দক্ষতা-যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারছে না। দুর্নীতি-অনিয়ম বাড়ছে। এর সবই সত্য। কিন্তু বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটানোর নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক উপায় হলো নির্বাচন। তাই বিরোধী দলকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। নির্বাচনেই দেশের মানুষ তাদের মতামত জানাবেন। বিরোধী দল কথিত ‘জনবিচ্ছিন্ন’ সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতর রাজনৈতিক কর্মসূচি দেয়া অব্যাহত থাকলে বিরোধী দলও যে জনবিচ্ছিন্ন হবে— এটা বলার জন্য কোনো জ্যোতিষীর শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার সরকারকেও বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি মোকাবেলায় ধৈর্য সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। বিরোধী দল কর্মসূচি ঘোষণা করলে হম্বিতম্বি বা শব্দ বোমা নিক্ষেপ না করে, গ্রেফতার-নির্যাতনের পথ পরিহার করে তাদের আস্থায় নেয়ার কৌশল আয়ত্ত করতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট