গণতান্ত্রিক রাজনীতি :ওলটপালট ভাবনা কার
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৪৬
বিশাল এক ওলটপালটের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। সাধারণভাবে যেন আর চলবে না। বিশেষ বিশেষ মহল বিশেষ বিশেষ তরিকায় রাজনীতি করার অভিসন্ধি আঁটছে। যদিও প্রত্যেকেরই উদ্দেশ্য ক্ষমতায় যাওয়া, তবুও এই ক্রান্তিকালে তাদের কর্মকাণ্ড নৈরাজ্য ছাড়া কিছুই দেবে না তাদের। নৈরাজ্যে কি লাভ আছে তাদের? কোন কোন মহল নৈরাজ্যই চায়। একই সাথে চায় ঘোলা জলে মাছ শিকার করতে। হট্টগোল একটা বাধিয়ে দিতে চায়। হট্টগোলের ডামাডোলে রাজনীতিকে কুজ্ঝটিকায় ফেলে ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে হাত মিলিয়ে কিংবা রাতের অন্ধকারে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতায় যেতে চায়। ক্ষমতায় যাওয়াই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা তাদের লক্ষ্য নয়। ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধাই এবং কোন ক্ষেত্রে আত্মরক্ষাই তাদের আশু লক্ষ্য। জামায়াতের যেমন লক্ষ্য প্রাণ বাঁচানো। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। বেশ কয়েকজনের ঝুলে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাজারে কথা উঠেছে, এ বছরের একবারে শেষাশেষি তাদের কয়েকজন ঝুলে যেতে পারে। মরিয়া হয়ে উঠেছে তারা। গলা বাঁচাতে যা করার নয় তাই করছে। রাজনীতির নামে হৈ-হট্টগোল করছে। প্রতিপক্ষকে মারতে না পেড়ে পুলিশকে মারছে। পুলিশকে মেরে যদি নাস্তানাবুদ করে দেয়া যায় তবে হয়ত এক সময় পুলিশের প্রাণ বাঁচাতে রাস্তায় সেনাবাহিনী নামবে। সেনাবাহিনী নামাতে পারলে তারা সরকারকে ব্যর্থ সরকার হিসাবে বদনাম দিতে পারবে। বিদেশিদের কাছেও প্রমাণ করতে পারবে যে, আওয়ামী নেতৃত্বাধীন সরকার পারে না। বিদেশি তথাকথিত কূটনীতিকের নামাবলি গায়ে দেয়া কেউ কেউ তো মুখিয়ে রয়েছে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য। যার প্রাণ যায় সে প্রাণ বাঁচানোর জন্য যা করার নয় তা তো করতেই পারে। কিন্তু যারা অহেতুক তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে তাদের কি হিসাবে মূল্যায়ন করা যায়? নৈরাজ্যই (সীমিত পর্যায়ে হলে) সবকিছু নয়। কিন্তু নৈরাজ্য বড় নাশকতার পথ তৈরি করে দিতে পারে। বড় নাশকতা কেবলমাত্র প্রাণনাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রীয় উপপ্লবের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশের জন্য, জাতির জন্য যা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হবে।
দেশ অনেকখানি এগিয়েছে। অনেক বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে গণতন্ত্র একটুখানি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে। বীজ ভেদি উদ্ভিদের মত একটা কুঁড়ি দুটি পাতা সবে আলোর মুখ দেখছে। এক্ষুণিই যদি উপড়ে ফেলে দেয় দেশবৈরীরা তবে পরিণামে কি হবে? গণতন্ত্রই মরে যেতে পারে। এবারের নির্বাচনের কথাই ধরা যাক। এই প্রথমবারের মত জনগণের রায়ে জনগণের সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ষড়যন্ত্র হয়েছিল অনেক। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। জনগণই শেষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি কায়েমী স্বার্থবাদীদের পছন্দ হচ্ছে না। তারা এযাবত্কাল জনগণকে নিয়ে ইচ্ছামত খেলেছে। তারা গণতন্ত্রের নামে জনগণকে ধোঁকা দিয়েছে। সামরিক বাহিনীকে কিংবা সামরিক বাহিনীর কতিপয়কে রাষ্ট্রক্ষমতার লোভ দেখিয়ে ওলটপালট করেছে। বার বার তাদের হাতে পড়ে গণস্বার্থ বিপন্ন হয়েছে। জনগণ কখনো স্বৈরাচারের হাতে, কখন গণতন্ত্রের নামে অশুভ আঁতাতের হাতে নির্যাতিত হয়েছে। এই অগণতান্ত্রিকতা ও নির্যাতনের হাত থেকে সাধারণ মানুষ মুক্তি পেতে চায়। তারা ভালভাবেই বুঝেছে যে নিরবছিন্ন গণতান্ত্রিক চর্চাই তাদের মুক্তি দিতে পারে। অন্য অসংখ্য বিকল্পকে তারা দেখেছে। কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে তাদের কেউই জনগণের পাশে দাঁড়ায় না। জনগণের সাথে থাকে না। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং বেশকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা সম্যক উপলব্ধি করেছে যে জনগণকেই জনগণের সাথে থাকতে হবে। জনগণকেই গণতন্ত্র নিরবচ্ছিন্ন রাখার সংগ্রাম করতে হবে।
জনগণের এই সাধারণ ইচ্ছা ষড়যন্ত্রকারীরা বুঝে গেছে। তারা সম্ভবত এটাও বুঝে গেছে যে, নির্বাচন করে আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো যাবে না। সামাজিকভাবে যদি ‘বিচ্ছৃংখলা’ সৃষ্টি করা যায় তবে মহাজোটের শরীক দলগুলো হয়ত আওয়ামী লীগকে পরিত্যাগ করতে পারে। আওয়ামী লীগকে একা হলে তাকে জব্দ করা হয়ত সহজ হবে। দেশের আইন-শৃংখলা নষ্ট হয়ে গেলে জনগণের আস্থাও উঠে যাবে। যদি একথা সত্যি হয় যে, আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোটের মূলশক্তি জনসমর্থন তা হলে জনসমর্থনকেই আগে আক্রমণ করতে হবে। এই কৌশলের প্রথম ধাপ আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো। পুলিশকে ইচ্ছামত পেটানোর ফলে পুলিশের মনোবল ভেঙ্গে যেতে পারে; একই সাথে সাধারণ মানুষের মনোবলও ভেঙ্গে যেতে পারে। সাধারণের মনোবল ভেঙ্গে গেলে তারা হালভাঙ্গা নৌকার মতো গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যেতে পারে। এতদিনকার ত্যাগ-তিতিক্ষার অর্জন একেবারেই মিছে হয়ে যাবে।
এখন অতি সামান্য সময় হাতে আছে। নির্বাচন করতেই হবে। যে কোন মূল্যে। নির্বাচনের প্রয়োজনে মহাজোটকে সম্প্রসারণও করতে হবে। অতি ক্ষুদ্রদেরকেও প্রয়োজনে এক পতাকাতলে আনতে হবে। কাউকেই ছোট মনে করার কারণ নেই। কেননা, বাংলাদেশের নির্বাচন পদ্ধতি বৈজ্ঞানিক নয়। যোগ্য ব্যক্তিই নির্বাচিত হবেন, এমন কোন কথা নেই। বর্তমানে মহাজোটের কতিপয় সাংসদ যদি এককভাবে তাদের দলের ব্যানারে নির্বাচন করতেন তবে সংসদে পা রাখতে পারতেন না। যদি যারা নির্বাচিত হওয়ার ক্ষমতা রাখেন না তাদেরকে যথাসম্মানে মহাজোটে স্থান দেয়া হয়, তবে যাদেরকে তাচ্ছিল্য করা হচ্ছে তারা কেন ‘যথাসম্মান’ পাবেন না।
নির্বাচন যদি না করা যায় এখন তবে বিকল্প হিসেবে সংবিধানে সংশোধনী আনা যায়। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ বানিয়ে উচ্চকক্ষের নিয়ন্ত্রণে তত্ত্বাবধায়কের বিকল্প হিসেবে নির্বাচন করানো যায়। থাকবে সকল রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হচ্ছে সকল মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য। বাংলাদেশের গণতন্ত্র যদি অভিনব পথে যাত্রা শুরু করে তবে পরিণামে সুফল ফলতেও পারে। তবে কাজটা খুবই বড় কাজ। এত বড় কাজের কলজেওয়ালা মানুষ মনে হয় বাংলাদেশে নেই। তাই ঝুঁকি না নিয়ে যথাশীঘ্র নির্বাচন করে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
লেখক :জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক